সাক্ষীর অভাবে বিচার নিষ্পত্তিহীন শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ অনেক আসামির

সাক্ষীর অভাবে বিচার নিষ্পত্তি হচ্ছে না বহু বছর ধরে শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ অনেক আসামির। সরকারের তরফ থেকে এমন অবস্থায় যেসব আসামি পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে আছে, অথচ বিচারকাজ শেষ হচ্ছে না, তাদের বিচার নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী থাকার পরও নিরাপত্তার কারণে আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য দিতে না যাওয়ায় বিচারকাজ শেষ করা যাচ্ছে না।  

১৯৯৯ সালের ১৯ জুন সকালে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালত ভবনের সামনে ব্যবসায়ী আতাউর রহমান আজাদকে গুলি করে হত্যা করে কিলার আব্বাস ও তার গ্রুপের সদস্যরা। একটি মামলায় সাক্ষ্য দিয়ে বাসায় ফিরে যাচ্ছিলেন আতাউর রহমান। হত্যাকাণ্ডটির পর ১৯ বছর পার হলেও এখনো শেষ হয়নি মামলার বিচার। মামলাটি বর্তমানে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন।

সূত্র জানায়, একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী থাকলেও নিরাপত্তার কথা ভেবে কিলার আব্বাসের বিরুদ্ধে কেউ আদালতে সাক্ষ্য দিতে রাজি নন। ফলে শেষ হচ্ছে না বিচারকাজ। শুধু কিলার আব্বাস নয়, এ ধরনের আরো অনেক অপরাধীর বিরুদ্ধে সাক্ষী না পাওয়ায় দীর্ঘ বছর ঝুলে আছে বিচার কার্যক্রম।

এ অবস্থায় পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা আসামিদের বিচার নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। কিলার আব্বাসসহ ৫৪৭ জন আসামির একটি তালিকা কারা অধিদপ্তর থেকে কয়েক দিন আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যারা দীর্ঘদিন কারাবন্দি রয়েছে, বিচার নিষ্পত্তি হচ্ছে না, তাদের বিচার নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব আসামির বিরুদ্ধে ভয়ে সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে আসছেন না, তাঁরা যেন নির্ভয়ে সাক্ষ্য দিতে আসতে পারেন সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে থাকা বন্দিদের বিচার নিষ্পত্তি করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সংশ্লিষ্ট জেলার জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারদের চিঠি পাঠানো হবে। তাঁরা বিচারকাজ দ্রুত শেষ করার ব্যবস্থা করবেন।

কিলার আব্বাসের পাশাপাশি ঢাকা মহানগর পুলিশের খাতায় ভয়ংকর সন্ত্রাসী হিসেবে নাম রয়েছে শেখ আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম, খন্দকার নাঈম আহম্মেদ টিটন, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি  হেলাল, খোরশেদ আলম রাসুসহ বেশ কয়েকজনের। এসব সন্ত্রাসী পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের পর কারাগারে আছে বহু বছর ধরে। খুন, চাঁদাবাজি, মাদক কারবারসহ অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

কারাবন্দি কিলার আব্বাসের বিরুদ্ধে চলছে পাঁচটি মামলার বিচার। এ মামলাগুলোর মধ্যে ব্যবসায়ী আতাউর রহমান হত্যা মামলার বিচার চলছে মহানগর দায়রা জজ আদালতে।

২০০১ সালের ২৮ জানুয়ারি দুপুরে কাফরুলের কচুক্ষেত রজনীগন্ধা সুপারমার্কেট এলাকায় চাল ব্যবসায়ী এছহাক আহম্মেদ দুলালকে গুলি করে হত্যা করা হয়। ওই মামলার প্রধান আসামিও কিলার আব্বাস। বর্তমানে মামলাটির বিচার চলছে যুগ্ম মহানগর দায়রা তৃতীয় আদালতে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ২০০১ সালে কাফরুল থানায় জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী ঘটনার মামলা হয়েছে। সেই মামলাটি বিচারাধীন জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঢাকায়। ক্যান্টনমেন্ট থানায় দায়ের করা আরেকটি মামলার বিচার কার্যক্রম চলছে ঢাকা জজ আদালতে। উত্তরা থানায় ২০০২ সালে দায়ের করা আরেকটি মামলা বিচারাধীন ঢাকার সিএমএম আদালতে।

সূত্র জানায়, ২০০৩ সালের ১৯ জানুয়ারি গ্রেপ্তারের পর আব্বাসকে দেশের বিভিন্ন কারাগারে রাখা হয়। বর্তমানে সে কাশিমপুর কারাগারে রয়েছে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, কারাগারে থাকলেও কিলার আব্বাসের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেমে নেই। তার সহযোগীরা মোবাইল ফোনে রাজধানীতে হত্যা, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। কারাগারের অসাধু কারারক্ষীদের ম্যানেজ করে মোবাইল ফোনে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে আব্বাস। সরকারের পুরস্কার ঘোষিত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম এই কিলার আব্বাস।

কারাগারে বসেই কিলার আব্বাস কাফরুল ও ভাসানটেক এলাকায় তার সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা করছে। ২০১২ সালের ৬ আগস্ট রাজধানীর কাজীপাড়ায় দিনের বেলায় গুলি করে কাফরুলের ঝুট ব্যবসায়ী নূরুল ইসলামকে হত্যা করা হয়। কারাগার থেকে কিলার আব্বাসের নির্দেশে কাফরুল এলাকার সন্ত্রাসী হাতকাটা মাসুদ ওই ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করে বলে র‌্যাব সূত্র জানায়। হত্যার পর কিলার আব্বাসের সঙ্গে হাতকাটা মাসুদের মোবাইল ফোনে কথোপথনের রেকর্ড পেয়ে র‌্যাব বিষয়টি নিশ্চিত হয়।

সুইডেন আসলাম : আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী শেখ মো. আসলাম ওরফে সুইডেন আসলাম। ২০০১ সালে সরকার যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা করে তাদের অন্যতম এই সুইডেন আসলাম। তার নামে ঢাকার বিভিন্ন থানায় হত্যা, চাঁদাবাজি, অবৈধ অস্ত্র বহনের অভিযোগে ১২টি মামলা ছিল। এর মধ্যে ১১টি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি আছে তেজগাঁওয়ের যুবলীগ নেতা গালিবকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলাটি। এ মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। এ মামলায় খালাস পেলে তার কারামুক্ত হতে আর কোনো বাধা থাকবে না।

পুলিশ সূত্র জানায়, ১৯৮৬ সালে ফার্মগেটের পূর্ব রাজাবাজারে একটি স্কুলের সামনে শাকিল নামের এক কিশোরকে গুলি করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। এরপর তার বিরুদ্ধে একের পর এক হত্যার অভিযোগ উঠতে থাকে। ১৯৯৭ সালের ২৩ মার্চ গালিব খুন হন। ওই ঘটনায় আসলামসহ ২০ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ১৯৯৮ সালের ৮ এপ্রিল অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। বর্তমানে দ্বিতীয় বিশেষ দায়রা জজ আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। এ মামলার ২৪ জন সাক্ষীর মধ্যে পুলিশ মাত্র ১৪ জনকে আদালতে হাজির করতে পেরেছে। অন্যদের হাজির করাতে না পারায় মামলাটি নিষ্পত্তি হয়নি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, যেসব আসামি পাঁচ বছরের বেশি সময় কারাগারে রয়েছে তাদের তালিকা চাওয়া হয় কারা কর্তৃপক্ষের কাছে। কারা কর্তৃপক্ষ কিছুদিন আগে তালিকাটি পাঠায়। ওই তালিকায় সর্বাধিক আসামির নাম রয়েছে, যারা বর্তমানে কাশিমপুর কারাগারে বন্দি। জানতে চাইলে গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন উর রশীদ জানান, এখন পর্যন্ত তাঁরা কোনো নির্দেশনা পাননি। নির্দেশনা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বগুড়া কারাগারে বন্দি তালিকায় এমন চারজনের নাম রয়েছে। বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানান, বিচার নিষ্পত্তির জন্য তাঁদের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হলে সেটি তাঁরা করবেন।

পাবনা কারাগারে বন্দি এমন পাঁচ আসামির নাম রয়েছে তালিকায়। জানতে চাইলে পাবনার পুলিশ সুপার জিহাদুল কবীর  জানান, বিচার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করায় পুলিশের ভূমিকা সাক্ষী হাজির করা। তাদের কাছে সহযোগিতা চাওয়া হলে সেটি তারা করবে।