বাংলা বানানে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ, অস্বীকার বাংলা একাডেমির

বাংলা ভাষার বানান পরিবর্তন ও  সংস্কারে বাংলা একাডেমি এক ধরনের স্বেচ্ছাচারিতা করে আসছে বলে অভিযোগ উঠেছে। একাডেমির বিরুদ্ধে অভিযোগ— যোগ্য ভাষাবিদরা বানান পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত নন এবং ভাষার প্রকৃতি-ধর্ম না জেনে আন্দাজে সংস্কারের কাজ করছেন তারা।

তবে একাডেমি বলছে, তারা আমূল কোনও পরিবর্তন আনেনি। বাংলা বানানকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে যতটুকু করা প্রয়োজন,যোগ্য ব্যক্তিদের সম্মতিতে  ততটুকুই করা হচ্ছে। ভাষা নিয়ে কাজ করেন অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘ভাষার সংস্কার সব দেশেই হয়। কী সংস্কার হচ্ছে, কারা করছে, সেটা আলোচ্যসূচি। বানানের সর্বশেষ সংস্কারের নেতা বাংলা একাডেমি, যেখানে যোগ্য লোক নেই। ভাষার প্রকৃতি-ধর্ম না জেনে তারা আন্দাজে সংস্কার করছে,এটা ঠিক নয়।’  নিজে সংস্কারের বিরোধী নন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘প্রমিত বাংলার নিয়ম বলে যা বলা হচ্ছে, সেটা এরশাদের আমলের কর্তৃত্ববাদী সংস্কার ও অগণতান্ত্রিক। একাডেমিতে যে ন্যূনতম গণতন্ত্র লাগে, জনমত, বিশেষজ্ঞদের মত নিতে হয়, সেটা না নিয়ে স্বৈরতান্ত্রিকভাবে করেছে।’ প্রত্যেক ভাষার নিজস্ব বিবর্তন আছে, ইতিহাস আছে। সেটা সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞাত থেকে ভাষা সংস্কারের প্রস্তাব সম্ভব না বলে মত দেন তিনি।

‘কী’ এবং ‘কি’-এর পার্থক্য করার বিষয়ে সলিমুল্লাহ খান বলেন, “আমাদের জাতীয় সংগীত: ‘কী শোভা কী ছায়া গো, কী স্নেহ কী মায়া গো’ লাইনে সব ‘কি’ শব্দকে ‘কী’ করে দেওয়া হলো। এটা প্রথমে দীর্ঘ ঈ-কার ছিল না। ১৯২০ সালের পর রবীন্দ্রনাথ এটি করেছেন। ‘তোমার নাম কী’— এটাকে দীর্ঘ ঈ-কার না দিলে অশুদ্ধ হবে ভাবেন যারা, তাদের ভাষা সম্পর্কে জ্ঞান নেই। এক শব্দের একাধিক অর্থ থাকতে পারে। তুমি কী চাও? ‘চাও’ মানে ‘দেখো’, ‘চাও’ মানে ‘প্রার্থনা করো’। ‘দেখা’ এবং  ‘প্রার্থনা’ একই শব্দ দিয়ে ব্যবহার করি কীভাবে? এটাকে ভাষার রূপকের নিয়ম। ‘কী’ এবং ‘ও’ সবচেয়ে ঘনঘন ব্যবহার হওয়া শব্দ। এসব ক্ষেত্রে বানান বদলালে মাথা খারাপ হবে।”

লেখক তপন বাগচী বলেন, ‘ভাষার নিজস্ব গতি আছে, আইন করে তা থামানো যাবে না। আগে যত ব্যকরণ পড়েছি, সংস্কৃতিটাই বাংলা ভাষায় লেখা। তখন সবচেয়ে প্রভাবশালী সাহিত্যিক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্র। তাদের স্বাক্ষরও নেওয়া হয়েছিল ১৯৩৬ সালের বানানবিধিতে। সেখানে বেশি কঠিন নিয়ম না। বিদেশি শব্দগুলোতে ণত্ববিধান, ষত্ববিধান, হ্রস্ব ই-কার, দীর্ঘ ঈ-কার খাটবে না। জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া সেটা মানলেও চীন দেশের ক্ষেত্রে সেটা মানেনি। তেমনই কিছু ব্যত্যয় রয়েছে গেছে। কখনও কখনও ব্যক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকেও ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে, যা ঠিক নয়।’ তিনি বলেন, ‘সবকিছু সহজ করার চেষ্টা হচ্ছে। আমাদের প্রজন্ম দুইটার মধ্যে পড়ে গেছি। আমরা পুরনো বানান শিখেছি, কিন্তু নিয়মে দেখি ভিন্ন। ফলে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে।’

বাংলা বিবর্তনমূলক অভিধানে কাজ করেছেন মতিন রায়হান। তিনি বলেন, “এক শব্দের একাধিক অর্থ আছে। এর উৎপত্তি, ব্যবহার সবকিছুই অভিধানে উল্লেখ থাকে। ১৫৮০ থেকে ‘অধ্যক্ষ’র ২১টি অর্থ পাওয়া গেছে। ‘নেতৃত্বস্থানীয় তদারককারী’ থেকে শুরু করে ষাটের দশকে এসে ‘বিভাগীয় প্রধান’ পেলাম। এই যে সময়ে সময়ে বদলে যাওয়া, এর সঙ্গে বানানের পরিবর্তনও ঘটে।’
তিনি বলেন, ‘ভাষা চলমান, স্থির নয়। সময়ের সঙ্গে যে ভাষা পাল্টাতে পারবে না, সে ভাষা মরে যাবে। যেমন, সংস্কৃত ভাষা মরে গেছে।’ বানান পরিবর্তন নিয়ে বেশকিছু বিরোধিতা সামনে আসার কথা বলা হলে তিনি বলেন, ‘যে কোনও সময় যে কোনও পরিবর্তন ঘটলে রক্ষণশীলরা কিন্তু বিরোধিতা করেছে। কিন্তু তারা টিকতে পারেনি। সময় তাদের দূরে সরিয়ে দিয়েছে। সময় এমন বিষয়, ওই সময়ের যে চাহিদা তা ধারণ করবেই।’

বাংলা একাডেমির পরিচালক মোবারক হোসেন বলেন, “বাংলা একাডেমি উল্লেখযোগ্য কোনও পরিবর্তন করেনি। আপনি যদি পুরনো অভিধান দেখেন, আপনি ‘বাড়ি’, ‘গাড়ি’, ‘পাখি’ বানানে হ্রস্ব ই-কার ও দীর্ঘ ঈ-কার দুটোই আছে। ওই সময়ে মানুষ দীর্ঘ ঈ-কার বেশি ব্যবহার করতো। বাংলা একাডেমি যেটা করলো, শুদ্ধ যেটি আছে, সেটি প্রথম এন্ট্রি দিলো, সেক্ষেত্রে হ্রস্ব ই-কার দেওয়া হলো। আর দুই হলো, বিদেশি শব্দে হ্রস্ব ই-কার হবে এবং দন্ত্যস ব্যবহৃত হবে। তাহলে একটা শৃঙ্খলার মধ্যে আসে। যারা ভাষা নিয়ে কাজ করেন তাদের অভিযোগ, বাংলা একাডেমি এই পরিবর্তন স্বেচ্ছাচারীভাবে করেছে।’

এ বিষয়ে কিছু বলতে চান কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘প্রমিত বাংলা নিয়ম যেটি বলছি, সেটি ১৯৯৪ সাল থেকে করা হচ্ছে এবং আনিসুজ্জামান স্যারসহ বড় এটি কমিটি কাজগুলো অনুমোদন করেছেন। মতামতের আলোকে পরে আবার রিভাইজড হয়েছে।’
কেউ ‘বাড়ি’ বানান দীর্ঘ ঈ-কার দিয়ে লিখলে ভুল হবে কিনা, প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সেটি ভুল হবে না।’ দুটো থাকলে কনফিউশন তৈরি হয় কিনা, প্রশ্নের উত্তরে মোবারক হোসেন বলেন, ‘সংস্কৃত বা বাংলা যে বানানই হোক যেটা হ্রস্ব ই-কার বা দীর্ঘ ঈ-কার দুটো দিয়েই হয়, সেটা আমরা হ্রস্ব ই-কার করবো। এটা সহজ করা। দুটোই যেহেতু শুদ্ধ, সেক্ষেত্রে অভিধানে প্রথম যে এন্ট্রি থাকবে, সেটিকেই সঠিক বলা হয়েছে বানানকে শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য।’