বিশ্বজুড়ে যত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট লিগ

আইসিসি থেকে শুরু করে বিভিন্ন দেশের ক্রিকেটের কর্তব্যাক্তিরা ভারতের জি-গ্রুপকে ফুলেল সংবর্ধনায় শিক্ত করতে পারে। এতে বরং, তাদের উদারতারই বহিঃপ্রকাশ হতো। কারণ, জি-গ্রুপ যে উপকার করে দিয়েছে ক্রিকেটের তার জন্য আজীবন কৃতজ্ঞ থাকার কথা সবার। নিষিদ্ধ হলেও ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লিগ (আইসিএল) নামে ফ্রাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের তো পথ প্রদর্শক তারাই! ভারতীয় ক্রিকেটের সম্প্রচার স্বত্ত্ব না পেয়ে জি গ্রুপ শুরু করেছিল আইসিএল নাম ২০ ওভারের টি-টোয়েন্টি ফ্রাঞ্চাইজি ক্রিকেট।

তুমুল সম্ভাবনার এই খাত এভাবে নাকের ডগা দিয়ে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে দেখে সঙ্গে সঙ্গে লুফে নিল ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআই। আইসিএলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করলো। আইসিসির ওপর প্রভাব প্রতিষ্ঠা করে আইসিএলকে সারা ক্রিকেট বিশ্বেই নিষিদ্ধ করে দিল। পরিবর্তে ২০০৮ সালে তারা নিজেরা চালু করলো আইপিএল (ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ)। সেই শুরু টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের রমরমা বাণিজ্য। আইপিএলে ক্রিকেট আর বলিউডি গ্ল্যামার মিলে-মিশে হয়ে গেলো একাকার। মাল্টি বিলিয়ন ডলারের আইপিএলে উড়ছে টাকা। ফুলে ফেঁপে আঙ্গুল থেকে কলাগাছ হয়ে উঠলো এখানে খেলা ক্রিকেটার থেকে লগ্নিকারীরা। ক্রিকেট বাণিজ্যের এই রমরমা ঢেউ আছড়ে পড়লো ক্রিকেট খেলুড়ে প্রতিটি দেশে।

কারও নিজস্ব অবকাঠানো সাজানোই ছিল, কেউ সাজিয়ে তুললো। নির্দিষ্ট একটা উইন্ডোও বলতে গেলে খুলে ফেললো প্রতিটি দেশ। আইপিএলের দেখাদেখি বাংলাদেশে ২০১২ সালে শুরু হলো বিপিএল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ শুরু করলো ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (পিসিএল)। একই বছর শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড এসএলপিএল (শ্রীলঙ্কান প্রিমিয়ার লিগ) নামে লিগ শুরু করার পর আর সেটাকে চালিয়ে নিতে পারেনি। ইংল্যান্ডের অবকাঠামো তৈরি করাই ছিল। কাউন্টিতেই তারা শুরু করে দিল টি-টোয়েন্টি ব্ল্যাস্ট। অস্ট্রেলিয়ারও অবকাঠামো বলতে গেলে সাজানো ছিল। ফ্রাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগ শুরু করলো তারা বিগ ব্যাশ নামে। দক্ষিণ আফ্রিকায় রয়েছে র্যাম স্ল্যাম ট্রফি নামে। যদিও তাদের এই টুর্নামেন্টে বিদেশীদের আনাগোনা কম। নিউজিল্যান্ডে চালু হয়েছে সুপার স্ম্যাশ লিগ। পাকিস্তান চালু করেছে পাকিস্তান সুপার লিগ (পিএসএল) নামে টি-টোয়েন্টি ফ্রাঞ্চাইজি টুর্নামেন্ট।

দক্ষিণ আফ্রিকা আরও একটি টি-টোয়েন্টি লিগ চালুর সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে ফেলেছিল। গ্লোবাল টি-টোয়েন্টি লিগ নামে ওই টুর্নামেন্টটি শুরু হওয়ার কথা নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে। তবে, দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটের আভ্যন্তরিন ঝামেলার কারণে, ওই টুর্নামেন্টটি গত বছর আলোর মুখ দেখেনি। এই বছর অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট লিগের এত জনপ্রিয়তা আর রমরমা বাণিজ্য দেখে ক্রিকেট বিশ্বের আনাচে-কানাচে গড়ে উঠছে নামে-বেনামে নানা ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি লিগ। তেমনই একটি লিগ ছিল আজমন অলস্টার ক্রিকেট লিগ। আরব আমিরাতে গড়ে ওঠা এই লিগ অফিসিয়াল কোনো অনুমোদন না পেলেও এখানে প্রকাশ্যে ফিক্সিংয়ের যে ঘটনা ঘটেছে তা নজরে এসেছে পুরো ক্রিকেট বিশ্বের। আইসিসি এই টুর্নামেন্ট পুরোটাই বন্ধ করে দিয়েছে মাঝপথে এবং ফিক্সিংয়ের ঘটনার মূল উৎপাটনে মাঠে নেমে পড়েছে।

২০ ওভারের ফরম্যাটের ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা দেখে ক্রিকেট বিশ্বে নতুন পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে যাওয়া আফগানিস্তানও পরিকল্পনা করছে ফ্রাঞ্চাইজি ভিত্তিক টি-টোয়েন্টি লিগ চালু করার। শুধু পরিকল্পনাই নয়, এই লিগ মাঠে গড়ানোর দিনক্ষণও চূড়ান্ত করে ফেলেছে আফগানরা। চলতি বছরের অক্টোবর-নভেম্বরের দিকেই মাঠে গড়ানোর কথা রয়েছে আফগান ক্রিকেট লিগের (এসিএল)। এরই মধ্যে নতুন খবর, আরব আমিরাত ক্রিকেট বোর্ডও চালু করতে যাচ্ছে আরেকটি ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি লিগের। নিউ এরাবিয়ান ক্রিকেট লিগ নামে এই টুর্নামেন্টটি আয়োজনের সূচি প্রতি বছর জানুয়ারি মাসে। অর্থ্যাৎ আগামী বছর জানুয়ারি থেকে শারজায় মাঠে গড়াবে এরাবিয়ান ক্রিকেট লিগ। এমন তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) একটি অভিযোগ থেকে।

পিসিবি চেয়ারম্যান নাজম শেঠি জানিয়েছেন, আগামী অক্টোবর-নভেম্বরে নিউজিল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে তাদের ক্রিকেট সিরিজ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই হোম ভেন্যু হিসেবে ব্যবহার করতে থাকা আরব আমিরাতই ছিল এই দুটি সিরিজ আয়োজনের নির্ধারিত ভেন্যু। কিন্তু একই সময়ে আফগান ক্রিকেট লিগ আয়োজনের জন্য শারজাহকে বরাদ্ধ দিয়ে দেয়া হয়েছে আফগানিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে। যে কারণে, পাকিস্তানের পক্ষে দুটি আন্তর্জাতিক সিরিজের আয়োজক হতে গেলে ভেন্যুর সংখ্যা নিতান্তই কম হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং, পিসিবি চিন্তা করছে, মালয়েশিয়াকে বিকল্প ভেন্যু বানানো যায় কি না। শুধু তাই নয়, আরব আমিরাত ক্রিকেট বোর্ড পিসিবিকে জানিয়ে দিয়েছে প্রতিবছর জানুয়ারিতে তারা নিউ এরাবিয়ান ক্রিকেট লিগ আয়োজন করবে শারজায়। অথচ, ফেব্রুয়ারি-মার্চেই রয়েছে পাকিস্তানের নির্ধারিত পিএসএলের সূচি। একই দেশ এবং একই ভেন্যুতে পরপর দুটি টি-টোয়েন্টি ফ্রাঞ্চাইজি লিগ আয়োজন করা হলে, সেটার প্রভাব কতটা খারাপ হবে- তা ভেবে এখনই সিউরে উঠছেন পিসিবি কর্মকর্তারা।

এ তো গেলো পিএসএল, এপিএল এবং এরাবিয়ান ক্রিকেট লিগের কথা। নতুন করে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড ঘোষণা করেছে, তারা লঙ্কান প্রিমিয়ার লিগের (এলপিএল) আয়োজন করতে যাচ্ছে। কিন্তু শ্রীলঙ্কান ক্রিকেট বোর্ড এলপিএলের জন্য এমন একটা সময় নির্ধারণ করেছে, যেটার জন্য সূচির সংঘর্ষ হতে পারে ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (সিপিএল) এবং ইংল্যান্ডের টি-টোয়েন্টি ব্ল্যাস্টের সঙ্গে। এলপিএলের সম্ভাব্য সূচি ধরা হয়েছে আগস্টের ১৮ থেকে সেপ্টেম্বরের ১০ তারিখ পর্যন্ত। এলপিএল শুরুর ১০দিন আগে, ৮ আগস্ট থেকে শুরু হবে সিপিএল। শেষ হবে ৬ সেপ্টেম্বর। একই সময়ে ব্যস্ত সূচি থাকবে ইংলিশ ঘরোয়া ক্রিকেটের। সুতরাং, ৬ দল নিয়ে আয়োজন হতে যাওয়া এলপিএল যে বিদেশি ক্রিকেটার খুব একটা পাবে না এখনই ভবিষ্যদ্বাণী করে দেয়া যায়।

বিশ্বের নানা প্রান্তে যেভাবে একের পর এক ফ্রাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি লিগের শুরু হয়েছে, এক সময় দেখা যাবে এসব লিগের আড়ালে হারিয়ে যাবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট। আইসিসি কর্তৃক আয়োজিত একটি-দুটি টুর্নামেন্টছাড়া আর কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটই আয়োজন হবে না। সিরিজগুলো তো দুরে থাক। কারণ, ইতিমধ্যেই ক্রিকেটারদের মধ্যে লঙ্গার ভার্সনের ক্রিকেট ছেড়ে এসব শর্টার ভার্সনের ক্রিকেটের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে। এর একটাই কারণ, অর্থের ঝনঝনানি, কম সময়ে তারকাখ্যাতি পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ এবং অল্প দিনেই ফুলে-ফেঁপে ‘কলা গাছ’ হয়ে যাওয়ার সুযোগ।