অস্বাভাবিক মাত্রায় বাড়ছে রডের দাম

অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে রডের দাম। বাজেটের আগে ভ্যাট-ট্যাক্স এবং পরে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম বৃদ্ধির যুক্তি দেখিয়ে গত ৯ মাসের ব্যবধানে দুই দফা টনপ্রতি রডের দাম ১৫-১৮ হাজার টাকা বাড়ানো হয়েছে।

এর পেছনে শক্তিশালী সিন্ডিকেট কড়া নাড়ছে বলে অভিযোগ নির্মাণখাত সংশ্লিষ্টদের। যদিও তা অস্বীকার করে উৎপাদকরা বলছেন, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতার অভাব, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় বাধ্য হয়েই দাম বাড়াতে হচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্সট্রাকশন ইন্ডাস্ট্রির (বিএসিআই) সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার মুনীর উদ্দিন আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, বড় বড় উৎপাদকরা সিন্ডিকেট করে রডের দাম বাড়াচ্ছে। গত বছরের বাজেটের আগে ভ্যাট-ট্যাক্সের অজুহাতে এক ধাক্কায় রডের দাম টনপ্রতি ৮-১০ হাজার টাকা বাড়ানো হয়। কিন্তু বাজেটে নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন না হলেও পরে আর দাম কমানো হয়নি।

এ নিয়ে অনেক দেন-দরবার করে লাভ হয়নি। এখন আবার আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ ও পরিবহন খরচ বাড়ার যুক্তি দেখিয়ে ওই সিন্ডিকেটই রডের দাম বাড়াচ্ছে। এর পেছনে সূক্ষ্ম কারচুপি আছে। সেটা হচ্ছে পদ্মা সেতুর মতো বড় বড় প্রকল্পে বেশি দামে রড সরবরাহ করা। যদিও এতে স্থানীয় ঠিকাদাররা মারাত্মক সমস্যার মুখে পড়ছেন। ঘন ঘন রডের দাম বাড়ায় বেঁধে দেয়া অর্থের মধ্যে কাজ শেষ করা যাচ্ছে না। তিনি আরও বলেন, বর্ধিত খরচ যোগ করে দেখা গেছে, রডের দাম ৩-৫ শতাংশ বাড়ানো যৌক্তিক। কিন্তু সেখানে ৩০ শতাংশের মতো দাম বাড়ানো হয়েছে। এতে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প ব্যয় বাড়ছে, পাশাপাশি স্থানীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব সরকারকে বিষয়টি খতিয়ে দেখা উচিত, নইলে এ সিন্ডিকেট দাম বাড়াতে থাকবেই।

পুরান ঢাকার রডের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বিএসআরএম ৫০০ডব্লিউ রড প্রতিটন ৫৯ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একেএস ৫০০ডব্লিউ ৬০ হাজার ৫০০ টাকা। বন্দর স্টিলের ৫০০ডব্লিউ বিক্রি হচ্ছে ৫৭-৫৮ হাজার টাকায়। এ ছাড়া এঙ্গেল ও ফ্ল্যাটবারের দাম বেড়েছে। সরকারি সংস্থা টিসিবির ওয়েবসাইটের তথ্য মতে, ৬০ গ্রেডের রডের দাম টনপ্রতি এক বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১৮ শতাংশ। এক বছর আগে যে রড ৫০-৫২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ৫৯-৬০ হাজার টাকায়। আর ৪০ গ্রেডের রডের দাম বেড়েছে ২৪ শতাংশ। ৪০-৪২ হাজার টাকার রড বিক্রি হচ্ছে ৫১-৫২ হাজার টাকায়। যদিও বাজার ঘুরে ৪০ গ্রেডের রডের দেখা মেলেনি। পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার ইংলিশ রোডে স্কাই আয়রন স্টোরের মালিক এম এম সাগীর (রকি) যুগান্তরকে বলেন, হঠাৎ করেই মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে রডের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। সবগুলো কোম্পানির মালিকরা দফায় দফায় একসঙ্গে মিটিং করে রডের দাম ঠিক করে বাজারে ছাড়ে।

এ ছাড়া পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় রডের দাম বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, খুচরা বিক্রেতারা যে দামে রড কিনে আনে তা থেকে সামান্য কিছু লাভ রেখে বিক্রি করেন। রডের দাম বাড়ার পেছনে মিলমালিক ও পাইকারি ব্যবসায়ীরা দায়ী। যদিও ইঞ্জিনিয়ার মুনীর উদ্দিনের সব অভিযোগ অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে রানী রি-রোলিং মিলের চেয়ারম্যান সুমন চৌধুরী বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপের দাম ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। আগে যে স্ক্র্যাপ টনপ্রতি ৩০০ ডলারে বিক্রি হতো, এখন সেটা কিনতে হচ্ছে ৪১০ ডলারে। তার ওপর ডলারের বিপরীতে টাকা দুর্বল হয়ে পড়েছে। আগে ৮০-৮১ টাকায় ডলার পাওয়া গেলেও এখন ৮৪-৮৫ টাকায় কিনতে হচ্ছে।

শুধু এ দুই হিসাব দেখলেই বোঝা যাবে রডের দাম কেন বাড়ছে? এ ছাড়া বন্দরে জটিলতা, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও বিদ্যুৎ বিল বাড়ানো হয়েছে। ব্যাংক ঋণ অনুমোদন দিলেও তারল্য সংকটের কারণে টাকা দিতে পারছে না। আবার ঋণের সুদ হারও বাড়ানো হয়েছে। তিনি দাবি করেন, যেভাবে উৎপাদন খরচ বাড়ছে সেভাবে রডের দাম বাড়ছে না। গত মাসে যুগান্তরকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মনোয়ার হোসেন একই কথা জানান। তিনি বলেন, মূলত ৪ কারণে রডের দাম বাড়ছে। এগুলো হচ্ছে পরিবহন খরচ, চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতার অভাব, গ্যাস-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও কেমিক্যালে অতিরিক্ত শুল্কারোপ।

স্টিল সেক্টরে সবচেয়ে বেশি ট্রাকের ব্যবহার হয়। অথচ এ খাতের ব্যবসায়ীদের কিছু না জানিয়ে সরকার হঠাৎ এক্সেল লোড নীতিমালা সংশোধন করে। এর ফলে আগে যেখানে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকায় ট্রাক ভাড়া ২২ হাজার টাকা ছিল, এখন সেখানে ৫২ হাজার টাকা লাগছে। তারপরও ট্রাক পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু ট্রাক সংকটের কারণে প্রতিটন রডের উৎপাদন ব্যয় ৪ হাজার টাকার মতো বেড়েছে। আর চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতার অভাবে প্রতিটন স্ক্র্যাপের সিএন্ডএফ মূল্য ৩৫-৪০ ডলার বেড়েছে।