রূপা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়, ৪ আসামির ফাঁসির নির্দেশ

টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে রূপা খাতুনকে গণধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৬ জানুয়ারি) টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বে থাকা প্রথম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ আবুল মনসুর মিয়ার আদালতে তিনি সাক্ষ্য দেন।

গেল বছরের ২৫ আগস্ট, টাঙ্গাইলের মধুপুরে চলন্ত বাসে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় কলেজ ছাত্রী রূপাকে। এ ঘটনায়, ওই বছরের ২৮ আগস্ট মধুপুর থানায় ছোঁয়া পরিবহনের চালক ও হেলপারসহ পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন নিহত রূপার ভাই। তদন্ত শেষে, গেল ১৫ অক্টোবর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দেয় পুলিশ।

টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালের তৎকালীণ আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা সাইদুর রহমান আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার সময় বলেন, আঘাতজনিত কারণেই রূপার মৃত্যু হয়েছে এবং মৃত্যুর আগে ধর্ষণের শিকার হওয়ার আলামত পাওয়া গেছে। দুপুর ১২টায় ২০ মিনিটব্যাপী সাক্ষ্য দেন সাইদুর। এরপর আসামি পক্ষের আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন ও শামীম চৌধুরী তাকে ঘণ্টাব্যাপী জেরা করেন।

চিকিৎসক সাইদুর ছাড়াও রূপার ভ্যানেটি ব্যাগ জব্দ করার সাক্ষী পুলিশ কনস্টেবল আব্দুল হান্নান এবং মরদেহের সুরতহাল করার সাক্ষী মধুপুরের জলছত্র এলাকার আব্দুল মান্নান ও শিশির মোহন সাক্ষ্য দেন। এ নিয়ে চাঞ্চল্যকর এ মামলার ১৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হলো।

সোমবার বেলা সোয়া ১১টায় এ রায় ঘোষণা করা হয়। এ সময় আদালতে মামলার আসামিরা উপস্থিত ছিলেন। গত ৫ ফেব্রুয়ারি আদালতে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণার এ দিন ধার্য করেন টাঙ্গাইল নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের ভারপ্রাপ্ত বিচারক এবং অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক আবুল মনসুর মিয়া।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করছেন- বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট নাছিমুল আক্তার নাসিম। তার সহায়তায় রয়েছেন মানবাধিকার কমিশনের আইনজীবী এস আকবর খান, মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট এমএ করিম মিয়া ও মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার টাঙ্গাইল জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান আজাদ।

এদিকে আসামিপক্ষে মামলা পরিচালনা করছেন অ্যাডভোকেট শামীম চৌধুরী দয়াল ও ঢাকা থেকে আসেন অ্যাডভোকেট দেলোয়ার হোসেন। টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিশেষ পিপি একেএম নাছিমুল আখতার নাসিম জানান, ঘটনার ১৭৩ দিন আর মামলার ১৭১ দিনের মাথায় আলোচিত এ মামলার রায় হতে যাচ্ছে।

তিনি আরও জানান, আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং সাক্ষীদের সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সকল অভিযোগ রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। আমরা আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির প্রত্যাশা করছি। নিহত রূপার পরিবারের চাওয়া আসামিদের চূড়ান্ত শাস্তি। যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর এ ধরনের জঘন্য কাজ করার সাহস না পায়।

উল্লেখ্য, গত ২৫ আগস্ট বগুড়া থেকে ময়মনসিংহ যাওয়ার পথে রূপাকে চলন্ত বাসে ধর্ষণ করে পরিবহন শ্রমিকরা। বাসেই তাকে হত্যার পর মধুপুর উপজেলায় পঁচিশ মাইল এলাকায় বনের মধ্যে রূপার মরদেহ ফেলে রেখে যায়।

এলাকাবাসীর কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ওই রাতেই অজ্ঞাত নারী হিসেবে তার মরদেহ উদ্ধার করে। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে রূপার মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে টাঙ্গাইল কেন্দ্রীয় গোরস্থানে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে মধুপুর থানায় হত্যা মামলা করে। পত্রিকায় প্রকাশিত ছবি দেখে রূপার ভাই হাফিজুর রহমান মধুপুর থানায় গিয়ে ছবির ভিত্তিতে তাকে শনাক্ত করেন।

গত ২৮ আগস্ট এ ঘটনায় জড়িত অভিযোগে ময়মনসিংহ-বগুড়া সড়কের ছোঁয়া পরিবহনের হেলপার শামীম (২৬), আকরাম (৩৫) ও জাহাঙ্গীর (১৯) এবং চালক হাবিবুর (৪৫) ও সুপারভাইজার সফর আলীকে (৫৫) গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদেরকে আদালতে হাজির করা হলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এ মামলায় বাদীসহ ২৭ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য-প্রমাণে মামলা প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে রাষ্ট্রপক্ষ।