‘জেলে যেতেই হবে জেনেই নেতৃত্ব ঠিক করে গেছেন’

জেলে যেতেই হবে জেনে রাজনৈতিক নেতৃত্বে উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠায় বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব ঠিক করে গেছেন এমন মন্তব্য করেছেন নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে নাগরিক ছাত্র ঐক্য আয়োজিত ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস, শিক্ষা ও শিক্ষাঙ্গন’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এমন মন্তব্য করেন।

উত্তরাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ডাকসুর নির্বাচন দেয়নি এমন অভিযোগ করে মান্না বলেন, ‘আমাকে অনেকেই বলে এরশাদ তার সময়ে দুইবার ডাকসুর নির্বাচন দিতে পারলো। অথচ আওয়ামী লীগ, বিএনপি এতোবার ক্ষমতায় থেকেও কেন নির্বাচন দিতে পারলো না।’

‘তারা নির্বচন দেয়নি অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য। অধিকার প্রতিষ্ঠা মানে বংশ পরম্পরাই তারা দেশ চালাবে। বেগম জিয়ার প্রতি আমার যথেষ্ট সম্মান আছে। উনি এতো বড় নেত্রী, তিনতিনবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দুই নেত্রীর সন্তান ছোট ছিল। এরা বড় হয়ে নেতৃত্বে আসবে, তারা নতুন যুবনেতা কেন হবে। দেখেন এতো বড় ঘটনা জেলেই তো যেতে হলো, তারপরও দলের নেতৃত্ব ঠিক করে গেছেন। সেই নেতৃত্ব হচ্ছে উত্তরাধিকার’ -বলেন ডাকসুর সাবেক এই ভিপি।

তিনি বলেন, দেখেন আড়াই কোটি টাকার দুর্নীতি কী হুলস্থুল ঘটিয়ে দিলো। অথচ লাখ কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে চলে গেল। কী হয়েছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের যিনি গভর্নর তিনি দেশের বাইরে থেকে ফিরে এসে পদত্যাগ করলেন। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে বলা হলো উনি (গভর্নর) একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। উনি এটা ঠেকাতে পারেননি, তাই পদত্যাগ করেছেন।

‘একটা মামলা নিয়ে এমন ঘটনা আমার জীবনেও দেখিনি। আমার জীবন একেবারে ছোট নয়। অনেক বড়বড় মামলার ঘটনাও দেখেছি। রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার কাগজপত্র ছাত্ররা ছিনতাই করে নিয়ে গিয়ে পুড়িয়ে ফেলেছিল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা আপনারা জানেন। কিন্তু গতকাল (বৃহস্পতিবার) অবিস্মরণীয় একটি ঘটনা ঘটলো ঢাকায়, একটি অঘোষিত সেমি কারফিউ টাইপের। এমনিতেই কয়েকদিন ধরে সরকারি দলের বিভিন্ন কথা-বার্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কথা-বার্তা মানুষের মধ্যে শঙ্কা সৃষ্টি করেছিল। আমাকে কেউ কেউ বলেছেন পাকিস্তান আমলে ঢাকা যেমন ছিল, গতকাল ঢাকা তেমন ছিল’ -বলেন আওয়ামী লীগের সাবেক এই সাংগঠনিক সম্পাদক।

নিম্ন আদালতের ওপর আস্থা রাখা যায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিম্ন আদালতের বিষয়ে কথা-বার্তা বলেছিলেন সিনহা, তাকে চলে যেতে হয়েছে। তারপর একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি থাকতে পারলেন, কিন্তু পূর্ণাঙ্গ হতে পারলেন না কেন? সিনিয়রিটি ভাঙা হলো। এখন বিচারপতি আছে চারজন। যেরকমভাবে আপনারা বিচারপতি নিয়োগ করেন, সেভাবে যদি বাকি সাতজনও নিয়োগ করেন তাহলে কার ঘাড়ে কয়টা মাথা আছে, প্রধান বিচারপতি কানতে কানতে দেশ ছেড়ে চলে যাবেন।

সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন করার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনের দাবি যেন মানা হয়। এই দাবির পথে ধীরে ধীরে দেয়াল উঠে যাচ্ছে, দেয়ালটা যেন সরে না যায়। নতুন করে কোনো দেয়াল যেন না তোলা হয়। যদি এই দেশে আবারো ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচনের চেষ্টা করেন তাহলে বোঝা যাবে বাংলাদেশের গ্রগতির পথে যে কাঁটা ছিল, সেই কাঁটা আরো গভীরভাবে পুতে দেয়া হলো। যদি পরিস্থিতি সেই দিকেই যায় তার জন্য সরকার দায়ী থাকবে।

তিনি বলেন, বন, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আপনি চাঁদ পর্যন্ত গেছেন, এটাই শিক্ষা। মানুষ বন্যপ্রাণী থেকে আলাদা হয়েছে তার মস্তিক ও বিবেক আছে এই কারণে। এখন বিবেক বক্সের মধ্যে রাখো। বিবেক, টিবেক দিয়ে কিছু হয় না। বিবেকের কথা তুললে আর রাজনীতি করা যাবে না। আর শিক্ষা ওটা সবাই নিজেরা দখল করে ফেলো। সার্টিফিকেট বিক্রি হয়। সার্টিফিকেট বাণিজ্য চলে রীতিমতো। আর ওই কারণে দেখা যায়, ডিগ্রিপ্রাপ্ত লোকজন টেলিভিশনের সামনে কথা বলতে পারেন না। ইন্টারভিউতে যখন আসেন তখন উত্তর দিতে পারেন না।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলো তালুকের মতো হয়ে গেছে, যে যখন ক্ষমতায় থাকে তখন সে দখলে নেই উল্লেখ করে মান্না বলেন, ‘এরশাদ সামরিক শাসন জারি করে ফর্মান জারি করেছিলেন কোথাও প্রকাশ্যে, গোপনে, ইশারাই, ইঙ্গিতে সামরিক শাসনেরবিরোধীতা করা যাবে না। আট বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হবে। সেদিন সরাদেশ এরকম আটকা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল একটা দ্বীপের মতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ঢুকতে চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু ঢুকতে পারেননি। সামরিক শাসকের প্রতাপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চলেনি।’

মৎস্যকন্যার মতো একটা বিরোধী দল সংসদে আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে বিরোধীদল তার অর্ধেক সরকারের মধ্যে আছে। মৎস্যকন্যার অর্ধেক মাছের মতো, অর্ধেক মানুষের মতো। এই রকম একটা বিরোধী দল। তারও এক নেতা শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। আমি শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদকে ভালো করে চিনি। তিনি এখনো একজন ভালো মানুষ। এখনো পর্যন্ত তার নামে বড় কোনো ঘুষ, দুর্নীতির কথা আমি শুনিনি।

প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে কারা জড়িত সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলে মান্না বলেন, দুর্নীতিবাজদের যখন শেয়ার কেলেঙ্কারি হয়েছিল, তখন অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন আমাদের হাত অতো শক্তিশালী নয়, ওদের ধরতে পারবো। অর্থমন্ত্রীর হাতের পরেও যদি শক্তিশালী থাকেন তারা কারা। ওরাই কি প্রশ্নপত্র ফাঁসের মধ্যেও আছে। ব্যাংক সেক্টর শেষ হয়ে গেছে। অথচ দেশে উন্নয়নের বন্য বয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, সেদিন যখন ভিসি ঘেরাও হয়ে গেলেন, পেছনের দরজা দিয়ে না কি পালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন ছাত্ররা গিয়ে ওনাকে ধরেছেন স্যার কথা শুনে যেতে হবে। উনি তখন ফোন করেছেন ছাত্রলীগকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি যখন গুন্ডামি করার জন্য ছাত্রলীগকে ফোন করে, তখন বাকি ছাত্রদের কি শিক্ষা দেবেন।