চার বছর পর টেস্টে প্রত্যাবর্তনটা স্মরণীয় করলেন রাজ্জাক!

চার বছর পর টেস্টে প্রত্যাবর্তনটা স্মরণীয় করে রাখলেন আব্দুর রাজ্জাক। ১৬ ওভারে মাত্র ৬৩ রান খরচায় তুলে নিয়েছেন শ্রীলঙ্কার ৪ উইকেট। রাজ্জাক আর তাইজুল মিলে শ্রীলঙ্কাকে ২২২ রানে আটকে রেখে যে সম্ভাবনাটা তৈরি করেছিলেন, সেটা দ্রুতই মিলিয়ে গেছে বাংলাদেশের টপ অর্ডারের ব্যর্থতায়। জীবন পেয়েও লাকমলের বল ছেড়ে দিয়ে বোল্ড হয়েছেন মুশফিক, পিতৃত্বের স্বাদ পাওয়ার পর প্রথম ইনিংসটাই তাঁর শেষ হয়েছে হতাশায়। 

পরের জন্য পাতা ফাঁদই এখন উল্টো নিজেদের গলার ফাঁস হওয়ার পথে। টেস্টের প্রথম দিনের শেষে তাই মিরপুরের স্পিন রাজ্যেও স্বস্তিতে থাকার উপায় নেই স্বাগতিকদের।

অস্বস্তিতে পড়ার সম্ভাবনা অবশ্য আগে থেকেই ছিল। কারণ প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড কিংবা অস্ট্রেলিয়া নয় যে প্রথম দিনেই টার্ন নিতে শুরু করা উইকেটে তাদের ব্যাটসম্যানরাই শুধু নাকাল হয়ে যেতে থাকবেন। এবার সামনে শ্রীলঙ্কা। স্পিন সাম্রাজ্যের দখল নেওয়ার মতো ভেলকি দেখাতে জানেন তাদের স্পিনাররাও। জানেন বলেই লঙ্কানদের ২২২ রানের প্রথম ইনিংস পেরিয়ে যাওয়াকেও আপাতত বাংলাদেশের জন্য মনে হচ্ছে অনেক দূরের পথ।

প্রথম দিনের শেষ দেড় ঘণ্টায় স্বাগতিকদের টপ অর্ডার এমন লণ্ডভণ্ড যে আজ দ্বিতীয় দিনের সকালটিও তাদের জন্য শুরু হতে চলেছে লঙ্কান স্পিনারদের পাল্টা চোখ রাঙানিতেই। লঙ্কান ব্যাটসম্যানরাও যা দেখেছেন এই টেস্টের শুরু থেকেই। সেই সূত্রে চার বছর পর নিজের টেস্ট প্রত্যাবর্তন রাঙিয়েছেন রাজ ডাকনামের আব্দুর রাজ্জাক। আরেক বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল ইসলামও কম যাননি। তবে দিনের শেষে এই ঘোষণাও থাকল যে রাজাধিরাজ শুধু তাঁরাই নন। রঙ্গনা হেরাথ ও দিলরুয়ান পেরেরাও আছেন।

এই উইকেটে দারুণ বোলিং করে নিজের ছাপ রাখতে পেরেছেন বাংলাদেশ একাদশের একমাত্র পেসার মুস্তাফিজুর রহমানও (২/১৭)। স্পিন সহায়ক উইকেটে বাড়তি পেসার নেওয়ার ঝুঁকিতে যায়নি শ্রীলঙ্কাও। যাঁকে নিয়েছে, সেই সুরঙ্গা লাকমলই বাংলাদেশের ইনিংসে হেনেছেন প্রথম আঘাত। তাঁকে বাউন্ডারি মারার পরের বলেই আবার চালাতে গিয়ে রিটার্ন ক্যাচ দিয়ে এসেছেন তামিম ইকবাল (৪)। যেটি লাকমলের শততম টেস্ট উইকেটও।

এমন অর্জনের দিনে বিভ্রান্ত মুশফিকুর রহিমের উইকেটও দারুণ চাতুরীতে তুলে নিয়েছেন এ লঙ্কান পেসার। চট্টগ্রাম টেস্টের প্রথম ইনিংসেও তাঁর বল ছেড়ে দিতে গিয়েই বোল্ড হয়েছিলেন লিটন কুমার দাশ। তবে সেটি ছিল তাঁর ম্যাচে মুখোমুখি হওয়া প্রথম বল। মুশফিকের ক্ষেত্রে ব্যাপারটি তা নয়। একই ওভারে দুইবার মুশফিককে ব্যাট উঁচিয়ে বল ছেড়ে দিতে দেখেই নিশ্চিতভাবে তাঁকে আবার সেভাবে খেলাতে চেয়েছিলেন লাকমল।

বাংলাদেশের সদ্য সাবেক টেস্ট অধিনায়ক সেভাবে খেললেনও। লাকমলের ইনসুইঙ্গারও ঢুকল আরেকটু ভেতরে। ব্যস, মুশফিক দেখলেন বল আঘাত হেনেছে অফস্টাম্পে। সুবাদে শেষ তাঁর ২২ বলে ১ রানের সংগ্রাম, বাংলাদেশও ১২ রানে ৩ উইকেট হারানো দল। তামিম ও মুশফিকের মাঝখানে যাওয়া মমিনুল হকের উইকেটে কৃতিত্ব কারো নয়, দায় শুধুই ব্যাটসম্যানের। দিলরুয়ান পেরেরার বলে ইমরুল কায়েস মিড অফে বল ঠেলে রানের জন্য ছোটেন। নন স্ট্রাইকার মমিনুলের দৌড়ানোর ধীরগতিতে উত্সাহিত ধনাঞ্জয়া ডি সিলভার ত্বরিত থ্রো ধরে উইকেট ভেঙে দেন উইকেটরক্ষক নিরোশান ডিকেলা।

চট্টগ্রাম টেস্টের দুই ইনিংসেই সেঞ্চুরি করা মমিনুলের ব্যাট তখন ভেতরে থাকলেও মাটি ছোঁয়াননি। রানের খাতা খোলার আগেই তাই দৃষ্টিকটুভাবে শেষ হয় তাঁর ইনিংস। রানের খাতা খোলার আগে আউট হতে পারতেন মুশফিকও। দিলরুয়ানের ভেতরে ঢোকা বল তাঁর গ্লাভস ও প্যাড ছুঁয়ে উঁচুতে উঠে গেলেও সেটি নিজের গ্লাভসে জমাতে পারেননি ডিকেলা। ৭ রানে থাকা লিটনের রিটার্ন ক্যাচও হাতে রাখতে না পারায় আরেকবার উইকেটবঞ্চনায় পুড়েছেন দিলরুয়ান। অবশ্য প্রথম দিনের খেলা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ইমরুল কায়েসকে এলবিডাব্লিউর (১৯) ফাঁদে ফেলেছেন এই অফস্পিনারই।

এর আগে তিনি আর হেরাথ মিলে স্বাগতিক দলের ব্যাটসম্যানদের অস্বস্তিও কম প্রকাশ্য করে দেননি। তাই দিনের শেষে ২৪ রানে অপরাজিত লিটন আর নাইটওয়াচম্যান মেহেদী হাসান মিরাজদের (৫*) জন্য আজকের সকালটিও সহজসাধ্য হওয়ার কথা নয়। যেমন শ্রীলঙ্কান ব্যাটসম্যানদের জন্যও প্রথম দিনের সকালটি ছিল দুর্বোধ্য। মিরাজ আর রাজ্জাক মিলে বোলিং শুরু করলেন। নিজের তৃতীয় ওভারেই রাজ্জাক নিজের প্রত্যাবর্তনকে রাঙাতেও শুরু করলেন।

উইকেট ছেড়ে বেরিয়ে এসে মারতে চাওয়া দিমুথ করুণারত্নের (৩) দুই পায়ের ফাঁক গলে বল যায় পেছনে এবং লিটনের বিশ্বস্ত গ্লাভসও সেরে নেয় স্টাম্পিংয়ের কাজ। ৫ ওভারের প্রথম স্পেলে ওই একটিই শিকার রাজ্জাকের। আবার যখন ফেরেন, ততক্ষণে শুরুর জড়তা অনেকটাই সামলে ওঠার পথে সফরকারীরা। রাজ্জাক ফিরেই বাদ সাধেন তাতে। দ্বিতীয় স্পেলের প্রথম দুই ডেলিভারিতেই তুলে নেন দানুস্কা গুণাতিলকে (১৩) ও লঙ্কান অধিনায়ক দীনেশ চান্ডিমালকে (০)। প্রথমে মিড অফে গুণাতিলকেকে ক্যাচ বানান মুশফিকের, এরপর মুখোমুখি হওয়া প্রথম বলেই বিদায় চান্ডিমালেরও। মিডল স্টাম্পে পড়ে টার্ন করে বেরিয়ে যেতে থাকা বল ছুঁয়ে যায় তাঁর অফস্টাম্পও।

মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতির পর দ্বিতীয় বলে রাজ্জাকের একই রকম ডেলিভারিতে একইভাবে বোল্ড চট্টগ্রামে ১৯৬ রানের ইনিংস খেলা কুশল মেন্ডিসও। ততক্ষণে ৬৮ রান করে ফেলা এ ওপেনার স্বাগতিকদের জন্য বড় এক বাধাই হয়ে উঠতে চলেছিলেন। যা প্রত্যাবর্তনে রাজ্জাককে এনে দেয় ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ের আনন্দও। আগের সেরা (৩/৯৩) ছাড়িয়ে এবার ৬৩ রানে নিয়েছেন ৪ উইকেট। শুরুতে একটু খরুচে হলেও ৮৩ রানে সমানসংখ্যক শিকার করে তাইজুলও আরেকবার দিয়েছেন তাঁর কার্যকারিতার প্রমাণ। সপ্তম উইকেটে দিলরুয়ানকে (৩১) নিয়ে চট্টগ্রাম টেস্টের সেঞ্চুরিয়ান রোশন সিলভার পার্টনারশিপও ভেঙেছেন। আবার ফিফটি করে দলকে দুই শ পার করে নেওয়া রোশনকে (৫৬) ফিরিয়ে লঙ্কান ইনিংসের ইতিও টেনেছেন এই বাঁহাতি স্পিনারই।

কিন্তু স্পিন সাম্রাজ্য দখলে তাঁরাই শুধু থাকলেন না, দিনের শেষে নেমে পড়লেন লঙ্কান স্পিনাররাও। যে কারণে পরের জন্য পাতা ফাঁদ এখন উল্টো নিজেদের গলার ফাঁসও হওয়ার পথে। দ্বিতীয় দিন সেটি এড়ানোর লড়াইয়েই নামিয়ে দিচ্ছে স্বাগতিকদের।