পরীক্ষার পূর্বেই হুবহু প্রশ্নপত্র, পরীক্ষা শেষে বাহিষ্কার ও গ্রেপ্তার দুই!

পরীক্ষার আধঘণ্টা আগেই পরীক্ষার্থীদের সাথে পরীক্ষাকেন্দ্রে আসা অবিভাবকদের মোবাইল ও ট্যাবে মিলল এসএসসির বাংলা দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষার নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নপত্র।

শনিবার বাংলা দ্বিতীয় পত্রের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শুরু হয় সকাল ১০টায় বাংলা। শেষ হয় দুপুর ১টায়।

তবে বিষয়টি অনেকেই গোপন রাখলেও এসএসসি পরীক্ষার্থী শহীদ শেখ (১৭) ও তাঁর বড় ভাই আল-আমীন শেখের (২২) ট্যাবে প্রশ্নপত্র আছে বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। পরীক্ষার প্রশ্নের সঙ্গে তার হুবহু মিল পাওয়ায় ওই পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়। একই সঙ্গে দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে মামলাও দিয়ে তাদের গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

এভাবে প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় শিক্ষার্থী, অভিভাকরা ক্ষুদ্ধ, বিরক্ত এবং শঙ্কিত। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবার পরীক্ষার শুরুতে প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতে বহু তর্জন-গর্জন করলেও আদতে কিছুই করতে পারেনি। প্রশ্নপত্র ফাঁস ঠেকাতেই পারছে না তারা।

এদিন পরীক্ষা শুরুর পৌণে ১ ঘণ্টা আগে প্রশ্ন ফাঁস হয়ে তা ফেসবুকে চলে আসে। প্রশ্নপত্রটি একটি গ্রুপে আপলোড হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য অনেক গ্রুপ ও পেজে মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বরাবরের মতো এবারও প্রশ্ন ফাঁসের সব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছে শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ।

প্রশ্নফাঁস ঠেকাতে এবার সব শিক্ষার্থীকে সাড়ে ৯টার মধ্যে কেন্দ্রে প্রবেশের নিয়ম বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধির সামনে প্রশ্নপত্রের সিলমোহর যুক্ত খাম খোলার নিয়মও করা হয়েছে। এতো কিছুর পরও কোনোভাবেই যেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না এই প্রশ্নফাঁসের মতো ঘৃণিত অপরাধ। সিলমোহর যুক্ত করার আগেই হয়তো ওইসব প্রশ্নপত্র চলে গেছে অপরাধীদের হাতে এবং সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তা প্রকাশ্যে বিতরণও হয়েছে।

এসএসসির প্রথম দিন গত বৃহস্পতিবার বাংলা প্রথম পত্রের এমসিকিউ অংশের প্রশ্নপত্রও পরীক্ষার আগমুহূর্তে ফেসবুকে ছড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। সেদিন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ফেসবুকে ছড়ানো প্রশ্নপত্রের সঙ্গে মূল প্রশ্নের মিল নেই।

গত কয়েক বছর ধরেই এসএসসিসহ বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষা শুরু আগ থেকে প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ উঠে আসছে। সরকার নানা চেষ্টা করেও এটি বন্ধ করতে পারছে না। নানামুখি ব্যবস্থা নেয়ার পরও চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় বাংলা প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের প্রশ্ন পরীক্ষার আগে আগে এসেছে ফেসবুকে।

যারা প্রশ্ন ফাঁস করছে তারা এর বিনিময়ে কোনো টাকা চাইছে না। শিক্ষামন্ত্রী বলছেন, এখানে সরকারকে বিব্রত করাই তাদের মূখ্য উদ্দেশ্য।

এর আগে বাংলা দ্বিতীয় পত্রের প্রশ্ন ও উত্তর পাওয়া যাবে তা বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজে বিজ্ঞাপন আকারে দেয়া হয়েছিল। কোথাও কোথাও বলা হয়েছে প্রশ্ন পেতে হলে এই গ্রুপটিকে লাইক দিন।

এভাবে প্রতিটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হওয়ায় হতাশ শিক্ষার্থী, এতো কঠোরতা এতো নিয়ম নীতির পরও প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় ক্ষুব্ধ অভিভাবক। শিক্ষার্থীরা বলেন, ‘পরীক্ষা দেয়ার তো কোন মানে হয় না। কোন মান আর থাকলো না। যারা লেখাপড়া করে না তারা প্রশ্ন পেয়ে আমাদের থেকে ভালো করবে। যারা অসাধু তারা ১০ শতাংশ শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন দিচ্ছে। আর বাকি যারা আছে তাদের জন্যে শিক্ষামন্ত্রী কি করবে।’

এদিকে প্রশ্ন ফাঁসের কোনো খবর তাদের কাছে নেই বলে মন্তব্য করেছেন সব শিক্ষা বোর্ডের সমন্বয়ে গঠিত ‘আন্তঃশিক্ষা বোর্ড’ ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের খবর তিনি বিভিন্ন অনলাইন মিডিয়ায় শুনেছেন। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার কোনো প্রামাণ্য খবর তার কাছে নেই। তার পরও বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন। তবে পরীক্ষা বাতিলের কোনো কারণ তিনি দেখছেন না।

ফাঁস হওয়া সেই প্রশ্ন মিলে যাওয়ার পর কর্মকর্তারা বরাবরের মতোই বললেন, বিষয়টি তারা দেখবেন। গত বৃহস্পতিবার বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকেই ১০০ ভাগ মেলার নিশ্চয়তা দিয়ে দ্বিতীয়পত্রের প্রশ্ন ফাঁস করার বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছিল ফেসবুকের বিভিন্ন গ্রুপে।

সকাল ১০টা থেকে বাংলা দ্বিতীয়পত্রের পরীক্ষা শুরুর আগেই সকাল সোয়া ৯টার মধ্যেই উত্তরসহ ‘খ’ সেট বহুনির্বাচনী প্রশ্ন এসব গ্রুপে ফাঁস করা হলে তা ভাইরাল হয়ে যায়।

এ ছাড়া ফেসবুক মেসেঞ্জারে সকাল ৯টা ১৬ মিনিটে ‘হিমুর ছায়া’ নামের একটি আইডি থেকেও উত্তরসহ ‘খ’ সেটের প্রশ্ন ইমেজ আকারে পাঠানো হয়। পরীক্ষা শেষে দেখা যায়, বহুনির্বাচনী প্রশ্নের সঙ্গে ফাঁস হওয়া প্রশ্ন হুবহু মিলে গেছে।

এদিকে একের পর প্রশ্ন ফাঁসের কবলে পড়ে রীতিমতো অসহায় বোধ করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, তারা টানা দুই মাস প্রশ্নের নিরাপত্তা দিতে পেরেছেন। পরীক্ষার দিন সকালে তা ফাঁস হচ্ছে। সবাই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমালোচনা করছেন। তবে এটা ঠেকাতে বিটিআরসি ও পুলিশের দায় নিয়ে কিছুই কেউ বলছেন না।

শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এখন আর বোর্ড বা বিজি প্রেস থেকে প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে না। সকাল ৯টার পর প্রশ্ন ফাঁস হওয়ার মানে হলো পরীক্ষার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা প্রশ্ন ফাঁসের সঙ্গে যুক্ত। সেটি ফেসবুকে ভাইরাল করে দেওয়ার ঘটনায় কর্মকর্তারাও আতঙ্কে। তারা বলছেন, এটি বোর্ডের পক্ষে রোধ করা সম্ভব নয়। এজন্য বিটিআরসি ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর স্বতঃস্ম্ফূর্ততা দরকার।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সোহরাব হোসাইন বলেন, আসলে কী হচ্ছে, ফাঁস হয়ে থাকলে পরীক্ষা বাতিল করা হবে কি না, বাতিল করলে এর প্রভাব কী হবে—সব বিষয় বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ করে দেখতে উচ্চপর্যায়ের একটি কমিটি করার চিন্তাভাবনা চলছে। এ ছাড়া প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের ধরিয়ে দিতে পারলে ৫ লাখ টাকা পুরস্কার দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকার লেনদেন হচ্ছে কি না, সেটাও নিবিড়ভাবে দেখা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রশ্নপত্র ফাঁস বন্ধে আমাদের ক্ষমতা অনুযায়ী যেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব, তার সবকিছুই করেছি। আমরা এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’

তবে এখন পর্যন্ত নেয়া দুটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলেও একটিও বাতিলের বিষয়ে কোনো ঘোষণা আসেনি।