ফরিদপুরে ভূমি অফিস, যা হতে পারে সারাদেশের কাছে অনুকরণীয়

পুরনো উইয়ের ঢিপি হাতের ডানে ফেলে অসহায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা ফিকে একতলা বিল্ডিং। উঠান, বারান্দায় এমনকি অফিসের ভেতরে টেবিল চেয়ারে বসা বিভিন্ন বয়সী ভিড়। কে দালাল আর কে এ অফিসের চাকুরে বোঝা ছিল বেশ দায়। অফিস কর্তার ভাড়ি পর্দা ওয়ালা দরজায় মোটাতাজা এ্টেন্ড্যান্ট, যাকে দেখেই সাধারণ মানুষের পিলে চমকানোর দসা। কে যায় ভেতরে ভূমি কর্তার কাছে? পাছে ঘুরে ঘুরে দালালকে মোটা টাকা দিয়ে জমির নামজারি বা বন্দবস্তের কাজ সারত সাধারণ মানুষ। খুবজড় মাসেরপর মাস ঘুরে কর্কশ কলিং বেলের আওয়াজ শুনে এক আধবার দেখা পাওয়া যেত কর্তার।তাতে কোন লাভ হতনা বললেই চলে।

এটাই ছিল একসময় দেশের সকল ভূমি অফিসের চিত্র। জনসাধারণের একটি নেতিবাচক ধারনা ছিল এ অফিসটি নিয়ে। বর্তমান সরকারে সময়ে এর চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। সারাদেশের ন্যায় জনবান্ধব ও সেবামূখি ভূমি অফিস গড়ার লক্ষে জেলা প্রশাসন ফরিদপুর সদর উপজেলা ভূমি অফিসটিকে জেলার মধ্যে ডিজিটাল, আধুনিক মডেল হিসেবে গড়ে তুলেছেন। যা হতে পারে সারাদেশের কাছে অনুকরণীয়।

হটাৎ সেদিন ভূমি অফিসে ঢুকতেই বেশ একটা ধাক্কা খেলাম। সুন্দর বাউন্ডারি আধুনিক গেট পরিপাটি করে সাজানো ভূমি কার্যালয়। ভবনের বাইরে টবে নানা প্রজাতির ফুল ও সৌন্দর্যবর্ধক গাছ। কার্যালয়ের মুখেই বোর্ডে নাগরিক সনদ টাঙানো। তাতে জমির নামজারি করতে কত টাকা লাগে, খতিয়ান তুলতে কত, খাসজমি বন্দোবস্ত নিতে করণীয়, কোন বিষয়ে কার সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করতে হবে এসব তথ্য লেখা। অফিসে ঢোকার বামে একটি সহায়ক ডেস্ক। সেখানে একজন কর্মচারী সেবাপ্রার্থীদের তথ্য সহায়তা দেন। তাঁর পাশের বাক্সে থরে থরে সাজানো নানা আবেদন ফরম। সেখান থেকে সেবাপ্রার্থীরা বিনা খরচে ফরম নিতে পারেন। কর্মচারীদের গলায় ঝুঁলছে পরিচয়পত্র। প্রতিটি কক্ষে ছোট সাদা বোর্ডে তাঁদের প্রতিদিনের কাজ লেখা। দিন শেষে এসি (ল্যান্ড) সেগুলো ধরে মূল্যায়ন করেন। কার্যালয়ে ঢুকতে সেই উইয়ের ঢিপির আর নেই, সেখানে রয়েছে সেবাপ্রার্থীদের বিশ্রামের জায়গা। দূরদূরান্ত থেকে আসা লোকজন সেখানে বিশ্রাম নেন। একটু ভেতরের দিকে ঢুকতেই ছোট একটি লাইন।

সেবাপ্রার্থীরা অনলাইনে আবেদন করছেন। অবাক হলাম।জানার চেষ্টা করলাম, সার্বিক ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল সেবা প্রদান কার্যক্রম চালু হয়েছে এ ভূমি অফিসে । একটি এপ্লিকেশন বেইজড ওয়েবসাইট ও অনলাইন মেসেজিং কার্যক্রম চালুর মাধ্যমে উপজেলা ভূমি অফিস তার ডিজিটাল পথ চলা ইতিমধ্যেই শুরু করেছে এবং উদ্যোগটি সকল মহলের নিকট প্রশংসনীয় হয়েছে । ই-নামজারি কাজ চলছে। এখন বিশ্বের যেকোন স্থানে বসে অনলাইনে মিউটেশনের জন্য আবেদন করতে পারবে সেবাপ্রার্থি এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে মোবাইলে ফিরতি ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে তাকে নিশ্চিত করা হচ্ছে। কথা হলো নজরুল ইসলাম নামে এক সেবা প্রার্থীর সাথে। সে জানায়, আগে দালালের জন্য এ অফিসে ঢোকাই যেত না।আর এখন অফিসে কোন দালাল নেই আমরা সরাসরি এসে সরকারি ফি জমা দিয়ে অনলাইনে আবেদন করে সঠিক সময় সেবা পাচ্ছি।

কার্যালয়ে আসা অন্য এক সেবাপ্রার্থী শেখ হামিদ বললেন, ভূমি কার্যালয়ে কাজ মানেই দালালের দৌরাত্ম্য। দিনের পর দিন হয়রানি। কর্মচারীদের অবজ্ঞার পাশাপাশি বাড়তি খরচ। ফরিদপুর সদর উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের চিত্রও একসময় তা-ই ছিল। কিন্তু এখন বদলে গেছে। বদলের পেছনের মানুষটি হলেন এসি ল্যান্ড পারভেজ মল্লিক। সেবামূখী জনবান্ধব ভূমি অফিস বিনির্মানের প্রত্যয়ে ৩৩তম বিসিএস প্রশাসনের এই চৌকস কর্মকর্তা পারভেজ মল্লিক গত ৬ নভেম্বর এই কার্যালয়ে যোগ দেয়ার পরে নানামুখী উদ্দ্যোগ গ্রহণ করে। শুরুতেই পুরো অফিস অঙ্গন সিসি টিভি ক্যামেরার আওতায় এনে কঠোর মনিটরিং এর মাধ্যমে দালাল মুক্ত করেছে। ই-হাজিরা স্থাপনের মাধ্যমে সকল কর্মকর্তা ও কর্মচারির অফিস হাজিরা নিশ্চিত করেছে। শতভাগ ই-নামজারি চালু করে সফলভাবে তা পরিচালিত করছেন।

ভূমি অফিসের জরার্জীণ দেয়ালগুলোও রাঙ্গানো হয়েছে নতুন রংয়ে। এসিল্যান্ডের অফিসকক্ষ ও অন্যান্য কর্মকর্তা/কর্মচারীদের কক্ষ বিন্যাসেও লেগেছে আধুনিকতার ছোঁয়া। অফিস কক্ষের বারান্ধায় স্থাপিত হয়েছে সেবাবাক্স, এখান থেকে সেবাপ্রার্থীরা বিনামূল্যে প্রয়োজনীয় ফরম পাচ্ছেন। অফিসের সম্মুখে স্থাপিত হয়েছে একটি হেল্পডেস্ক, যেখান থেকে সেবাপ্রার্থীরা জানতে পারছেন কোন সেবার জন্য কোথায় যাবেন।

প্রতি বুধবার গোলঘরে গনশুনানির মাধ্যমে জনগণের নানাধরনের সমস্যার কথাশুনে তাঁর সমাধানের ব্যবস্থা করছে। তাঁর কক্ষের দরজায় কোন পরদা নেই। নেই কোন এটেনডেন্ট । কোন সেবাপ্রার্থীর তাঁর কাছে যেতে লাগে না কোন অনুমতি।এমনকি সিসি ক্যামেরা মাধ্যমে বিভ্রান্ত অপেক্ষমাণ কাউকে দেখলে সাথে সাথে নিজ কক্ষ থেকে বাইরে এসে তাঁর সমস্যার কথা শুনে তাঁর সেবা নিশ্চিত করছেন।

পারভেজ মল্লিক বলেন, একটা সময় ছিল, কর্মকর্তারা কক্ষে বসে বেল চাপতেন। বাইরে অপেক্ষমাণ সেবাপ্রার্থীরা ভারি পর্দা সরিয়ে এক এক করে কক্ষে ঢুকতেন। তাঁর আগে অফিস সহায়কের কাছে অনুমতি নিতে হতো। আমি প্রথমে এসেই পর্দা সরিয়েছি। সেবাপ্রার্থী ও সেবাদানকারীর মধ্যে ফারাক সৃষ্টির কোন সুযোগ রাখিনি। ফরিদপুরের জেলা প্রশাসকের নির্দেশে আধুনিক ও সেবামূখি ভূমি অফিস বিনির্মাণের প্রত্যয়ে নিরলস কাজ করে যাচ্ছি। সততা ও স্বচ্ছতার সাথে দ্রুত সময়ে সেবা প্রদানই আমার লক্ষ্য। জেলা প্রশাসক উম্মে সালমা তানজিয়া বলেন, ভূমি অফিস ডিজিটালাইজেসণ ডিজিটাল বাংলাদেশের আর একটি সফল উদ্দ্যোগ। তিনি সব উপজেলায় এ মডেল চালুর উদ্যোগ নেবেন বলে সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন।

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি