‘নিরাপত্তাব্যবস্থা অপর্যাপ্ত ছিল বলেই রিজার্ভ চুরি’

বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের সুরক্ষায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার করা হলেও ‘ফায়ারওয়াল’ বা নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যাপ্ত ছিল না বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকারি দপ্তরগুলোকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থার তাগিদ দিয়েছেন তিনি। বুধবার রাজধানীতে মহাহিসাব নিরীক্ষা কার্যালয়ের সুপ্রিম অডিট ইনস্টিটিউটের নতুন ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন।

শেখ হাসিনা বলেন, সাইবার ক্রাইম একটা ক্রাইম যেটা অনেক সময় আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে। সেখান থেকেও কীভাবে নিরাপত্তাটা দিতে হবে সে বিষয়ে সচেতন থাকতে হবে। সেটা যদি না করি তাহলে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।’ নিরীক্ষা কর্মকর্তাদের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সব ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আপনাদের দায়িত্ব কিন্তু অনেক বেশি।’

এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে আমাদের অর্থ পাচার হয়ে গেল। আমরা ডিজিটাল পদ্ধতি সেখানে গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু যেভাবে যে পদ্ধতিতে ফায়ারওয়ালটা করা উচিত ছিল সেটা কিন্তু তখনও করা হয়নি। যার জন্য এটা করতে পেরেছিল। কাজেই এ ব্যাপারে ভালোভাবে লক্ষ্য রাখা দরকার।

২০১৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক থেকে সুইফট কোডের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রায় ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করে নেয় হ্যাকাররা। এর মধ্যে দুই কোটি ডলার চলে যায় শ্রীলঙ্কা ও আট কোটি ১০ লাখ ডলার চলে যায় ফিলিপাইনের জুয়ার আসরে। ঘটনার একমাস পর বিষয়টি বাংলাদেশ জানতে পারে ফিলিপাইনের একটি পত্রিকার খবরের মাধ্যমে।

আট কোটি ১০ লাখ মিলিয়ন ইউএস ডলারের মধ্যে ৪৬ লাখ তিন হাজার মার্কিন ডলার এবং ৪৮ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার ফিলিপিনো পেসো (মোট এক কোটি ৪৫ লাখ ৪০ হাজার ডলার) ফিলিপাইন আদালতের আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংককে ২০১৬ সালের ১০ নভেম্বর ফেরত দিয়েছে। এর আগে, ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই আরসিবিসি বাংলাদেশ ব্যাংককে ৭০ হাজার মার্কিন ডলার ফেরত দেয়। এছাড়া দুই কোটি ৯০ লাখ ডলারের সন্ধান পাওয়া গেছে। সন্ধান পাওয়া বাকি অর্থ ফেরতের বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন। তবে অবশিষ্ট তিন কোটি ৭০ লাখ ডলারের কোনও হদিস নেই।

এই ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ফরাসউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন একাধিক তারিখ দিয়েও প্রকাশ করেননি অর্থমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডিজিটাল পদ্ধতি যখনই আমরা গ্রহণ করব, তার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তার দিকটি লক্ষ্য রাখতে হবে। ফিয়ারওয়াল থাকতে হবে, নিরাপত্তা থাকতে হবে।’

সরকারি অন্যান্য কাজের পাশাপাশি নিরীক্ষা কাজেও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ানোর তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, অডিটকে আরও দক্ষ করা, মানসম্পন্ন করার, জানান শিগগির আইটি অডিট কার্যক্রম শুরু হচ্ছে বলেও। অডিট বিভাগের পরামর্শ ও সুপারিশ এসডিজি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে বলেও প্রধানমন্ত্রী বিশ্বাস করেন। দুর্নীতি হ্রাসের লক্ষ্যে আধুনিক অডিট ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে বলেও মনে করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রকল্পগুলো যেন সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন হয়। অপচয় যেন না হয়, সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে।’ আর এই উদ্যেগে নিরীক্ষার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি। গতানুগতিক নিরীক্ষার বদলে এই কার্যক্রমেও নতুন চিন্তার বিকাশ চান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘উন্নয়নের ধারাকে অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে সরকারের ব্যয় সম্পাদনের পর অডিট কার্যক্রমের পাশাপাশি ব্যয় হওয়ার আগে এমনকি ব্যয় চলাকালে অডিট কার্যক্রম জোরদার করা হলে আর্থিক অপচয় ও অনিয়ম বহুলাংশে হ্রাস পাবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।’

‘এই অর্থ জনগণের অর্থ, জনগণের অর্থ সাশ্রয় এবং দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অডিট ও অ্যাকাউন্ট ডিপার্টমেন্টকে আরও দক্ষতা এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজ করার জন্য আমি আহ্বান করছি। লোকবলের যে সমস্যা আছে, আমি সেটার সমাধান করে দেব।’

সেই সঙ্গে নিরীক্ষা কার্যক্রমকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ারও তাগাদা দেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘আমাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম তৃণমূল পর্যন্ত চলে গেছে। কাজেই আমাদের অডিট কার্যক্রমও সেখানে যেতে হবে। আমরা এখন ‍উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আছি। ধীরে ধীরে আমাদের ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত খোঁজখবর রাখতে হবে।’ দুর্নীতি বা টাকা পয়সা নিয়ে অনিয়ম কখনও বরদাশত করা হবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এ বিষয়ে আপনারা আরও নজরদারি করবেন, সেটাই আমি চাচ্ছি।’

‘দুর্নীতি অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে’ দাবি করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশন এখন অনেক স্বাধীনভাবে কাজ করছে। সরকারি এমপি মন্ত্রীদেরও দুর্নীতি দমন কমিশন যদি মনে করে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, আমরা কিন্তু বাধা নেই না। আবার মন্ত্রীরাও পিছপা থাকে না। তারা সঙ্গে সঙ্গে সেখানে যায়, তারা কিন্তু জবাবদিহি করে।’

‘পদ্মা সেতু নিয়ে আমাদেরকে দুর্নাম দিতে চেয়েছিল। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক আমাদের ওপর অভিযোগটা এনেছিল, আমরা সেটাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করি। এবং আজকে এটা প্রমাণিত। কানাডার ফেডারেল কোর্ডে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক কিন্তু কোনো তথ্য দিতে পারেনি, প্রমাণ দিতে পারেনি এখানে দুর্নীতি হয়েছে।’

ই গভর্নেন্সের ক্ষেত্রে গত এক বছরে ২৪ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন বিশ্বে ১২৪ বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বলেন, ‘টেন্ডারের বাক্স এখন আর ছিনতাই হচ্ছে না।’ কোনো কোনো মন্ত্রণালয় এখনো পিছিয়ে আছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা নির্দেশ দিয়েছি সবগুলো মন্ত্রণালয় যেন ই টেন্ডারে চলে যায়। ই পারচেজে যেতে পারে।’ অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, মহা হিসাব নিরীক্ষক মাসুদ আহমেদ, অর্থসচিব মুসলিম চৌধুরী প্রমুখ এ সময় বক্তব্য দেন।

এ সময় মাসুদ আহমেদ নিরীক্ষা বিভাগের গুরুত্ব তুলে ধরে তার বিভাগে আরও কর্মী নিয়োগ দেয়ার সুপারিশ করেন। আর বিশ্বব্যায়ক পদ্মা সেতুতে দুর্নীতি চেষ্টার অভিযোগ তোলার পর সচিব মোশাররফ হোসেনের পাশে দাঁড়ানোয় প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেন। মাসুদ আহমেদ বলেন, ‘আমরা সরকারি কর্মকর্তারা রাজনীতি করি না। এ বিষয়ে কোনো বক্তব্যও দেই না। তবে আমাদের ব্যাচম্যাট মোশাররফ হোসেনকে আপনি (প্রধানমন্ত্রী) যেভাবে রক্ষা করেছেন, তাতে আপনার প্রশংসা না করে পারি না।’

প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য রাখার আগে মহা হিসাব নিরীক্ষক তার হাতে ক্রেস্ট তুলে দেন। আর প্রধানমন্ত্রীও তাকে একটি ক্রেস্ট দেন।