‘নাম বদল হয়েছে, স্বাধীন মত প্রকাশের দ্বার খোলেনি’

তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা সরিয়ে নতুন যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সরকার করতে যাচ্ছে, তাতেও স্বাধীন মত প্রকাশের দ্বার খোলেনি বলে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আগের বিতর্কিত আইনটিতে কারাগার ঘুরে আসা সাংবাদিক প্রবীর সিকদার।

সোমবার মন্ত্রিসভায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খসড়া অনুমোদনের প্রতিক্রিয়ায় প্রবীর সিকদার তার ফেইসবুকে লিখেছেন, “৫৭ ধারার নাম বদল হয়েছে, কমেছে শাস্তি। তার অর্থ এই নয় যে মত প্রকাশের স্বাধীনতা অবারিত করা হয়েছে।”

মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সাংবাদিকদের বলেন, নতুন আইন পাস হলে তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৪, ৫৫, ৫৬, ৫৭ ও ৬৬ ধারা বিলুপ্ত হবে। তার বদলে এসব ধারার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করে অপরাধের প্রকৃতি অনুযায়ী শাস্তির বিধান রাখা হচ্ছে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে। তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছিল সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টসহ অনেকে।

অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “এটা স্বাধীন গণমাধ্যমের গলা টিপে ধরার একটা ব্যবস্থা।

“সরকারি-আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অন্যায় করবে- কেউ এ তথ্য নিতে পারবে না- এমন ব্যবস্থা গণমাধ্যমের মুখ বন্ধ করে দেওয়ার চেষ্টার শামিল। এর মাধ্যমে দুর্নীতিকে ইনডেমনিটি দেওয়া হল।”

একই প্রসঙ্গ তুলে সমকালের সাংবাদিক রাশেদ মেহেদী ফেইসবুকে লিখেছেন, “অনুসন্ধানী সাংবাদিকতাবিরোধী ভয়ংকর কালো আইন ৩২ ধারা।

“সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কেউ যদি বেআইনিভাবে প্রবেশ করে কোনো ধরনের তথ্য উপাত্ত, যে কোনো ধরনের ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে গোপনে রেকর্ড করে, তাহলে সেটা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ হবে এবং এ অপরাধে ১৪ বছর কারাদণ্ড ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডর বিধান রাখা হয়েছে।”

এই আইনের ফলে প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হবে বলে রাশেদ মেহেদীর দাবি।এই ধারার ব্যাখ্যায় তথ্য প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক একটি টেলিভিশনকে বলেন, “ডিজিটাল স্টোরেজে সঞ্চিত থাকা তথ্য চুরি কিংবা ক্ষতি সাধনের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে এই ধারায়।”

তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারা বিলোপ এবং শাস্তি কমানোকে ‘জনতার প্রতীকী বিজয়’ অভিহিত করেছেন প্রবীর সিকদার।প্রতিমন্ত্রী পলক ৫৭ ধারার বিষয়ে বলেন, প্রস্তাবিত আইনে অপরাধগুলোকে ভেঙে পাঁচটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

“৫৭ ধারায় সকল অপরাধকে এক করে ফেলা হয়েছিল। নতুন আইনে সেটা ভেঙে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি, তথ্য অবকাঠামোতে আঘাত করার জন্য এক ধরনের সাজা এবং সাধারণ মানহানির জন্য অন্য ধরনের সাজার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অভিযোগ যত গুরুতর, সাজা তত বেশি।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জনের ভাষ্য, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আগেকার বিভ্রান্তিগুলো দূর হলে, সেটা ভালো উদ্যোগ হবে। তবে আইনের অপব্যবহার যেন না ঘটে।

তিনি বলেন, “এধরনের একটি আইন প্রয়োজন ছিল। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে, অপরাধের ধরন দেখে শাস্তির মাত্রা ঠিক করা উচিত। কোনো অবস্থাতেই যেন আইনের অপব্যহারের সুযোগ সৃষ্টি না হয়।”

তিনি বলেন, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সামষ্টিক অধিকারের সুরক্ষা দিতে গিয়ে ব্যক্তির অধিকার অনেক সময় তখন রক্ষা নাও হতে পারে।

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৪ ধারায় কম্পিউটার, কম্পিউটার সিস্টেমের ক্ষতির জন্য সাত থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ দশ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান ছিল এতদিন। আর ৫৬ ধারায় হ্যাকিং সংক্রান্ত অপরাধের জন্য সাত থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান ছিল।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অপরাধের ধরন আরও সুনির্দিষ্ট করে আলাদা সাজা ঠিক করা হয়েছে। তবে সর্বোচ্চ সাজা সেই ১৪ বছর কারাদণ্ড ও কোটি টাকা জরিমানাই রাখা হয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৫ ধারায় কম্পিউটার সোর্স কোড পরিবর্তনের জন্য তিন বছরের জেল বা তিন লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা ছিল। নতুন আইনেও তা একইভাবে থাকছে।তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় ইলেক্ট্রনিক ফরমে মিথ্যা, অশ্লীল অথবা মানহানিকর তথ্য প্রকাশের শাস্তি ছিল সাত থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের ক্ষেত্রে ১০ বছরের জেল ও ২০ লাখ টাকা জরিমানা; মানহানিকর অপরাধে তিন বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড; ঘৃণা বা বিদ্বেষ ছড়ানো, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির ক্ষেত্রে সাত বছর জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করার কথা বলা হয়েছ খসড়ায়।

ফৌজদারি দণ্ডবিধির ২৯৮ ধারায় ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দিয়ে শব্দ ব্যবহারের শাস্তি হিসেবে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ডে সঙ্গে অর্থদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। আর কোনো ধর্মীয় শ্রেণির প্রতি অবমাননার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃত কাজের জন্য দুই বছরের জেল ও অর্থদণ্ডের কথা বলা হয়েছে। আর মানহানির ক্ষেত্রে ফৌজদারি দণ্ডবিধির ৪৯৯, ৫০০, ৫০১ ও ৫০২ ধারায় সর্বোচ্চ দুই বছর কারাদণ্ডের কথা বলা হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৬ ধারায় কম্পিউটার ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটনে সহায়তার জন্য মূল অপরাধের সমান অর্থাৎ সাত থেকে ১৪ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা ছিল। প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে নেটওয়ার্ক বা কম্পিউটারে অবৈধ অনুপ্রবেশে সহায়তার শাস্তি ঠিক করা হয়েছে তিন বছরের কারদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা। তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬০ ধারায় কম্পিউটার রিসোর্সের মাধ্যমে তথ্য সম্প্রচারে বাধা সৃষ্টির জন্য পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে, যা আইন সংস্কারেও বহাল থাকছে।

আবার প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন করা বা জনগণের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট নেটওয়ার্কে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি বা সহযোগিতার শাস্তি ঠিক করা হয়েছে ১৪ বছরের কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড।

নতুন আইনের খসড়ায় ডিজিটাল মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বা জাতির পিতার বিরুদ্ধে অপপ্রচার বা তাতে মদদের শাস্তি ঠিক করা হয়েছে ১৪ বছরের কারাদণ্ড, এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। ডিজিটাল মাধ্যমের ক্ষেত্রে এ অপরাধের বিষয়ে আগের কোনো আইনে বলা ছিল না। এছাড়া সরকারি গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ডিজিটাল উপায়ে ধারণ, স্থানান্তর বা সংরক্ষণ করা এবং তাতে সহয়তাকে গুপ্তচারবৃত্তির অপরাধ হিসেবে গণ্য করে ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ লাখ টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে।