চির বিদায়ের পথ পাড়ি দিলেন কথাসাহিত্যিক শওকত আলী

একুশে পদকপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক শওকত আলী আর নেই (ইন্নালিল্লাহি…রাজিউন)। তার বয়স হয়েছিল ৮১ বছর।হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার (২৫ জানুয়ারি) সকাল সোয়া ৮টার দিকে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ, পিজি হাসপাতাল) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

তার বড় ছেলে চিকিৎসক আরিফ শওকত পল্লব জানান, বৃহস্পতিবার সকাল সোয়া ৮টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের চিকিৎসকরা তার বাবাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ব্রি. জে. হারুন বলেন, শওকত আলী আমাদের হাসপাতালের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ছিলেন। বেশ ক’দিন আগে ধানমন্ডির ল্যাবএইড হাসপাতাল থেকে এখানে আসেন তিনি। রক্তে সংক্রমণসহ বিভিন্ন অসুস্থতায় গত ৪ জানুয়ারি ল্যাবএইড হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয় শওকত আলীকে। সেখানে অবস্থার অবনতি হলে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। এরপর তাকে পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। এ বিষয়ে ল্যাবএইডের কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম লেনিন জানান, বেশ কিছু দিন আগে ল্যাবএইডে চিকিৎসা হয় শওকত আলীর। পরে তাকে পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।

১৯৩৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর দিনাজপুর জেলার থানা শহর রায়গঞ্জে জন্ম নেন শওকত আলী। প্রথম জীবনে চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন বুনেছিলেন তিনি। কিন্তু কলেজে বিজ্ঞান বিভাগ না থাকায় পরে তিনি মানবিক বিভাগ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন। কলেজের ছাত্র জীবনেই তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন।  এর কিছুদিন পরেই তিনি জড়িয়ে পড়েন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাকে বন্দি করে জেলে পাঠায় পাকিস্তানের সামরিক জান্তা। পরে সাংবাদিক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করলেও কিছুদিন পরে শিক্ষকতায় যোগ দেন তিনি। বামপন্থিদের ‘নতুন সাহিত্য’ পত্রিকায় লেখালেখি করেন শওকত আলী। এছাড়া দৈনিক মিল্লাত, মাসিক সমকাল, ইত্তেফাকে তার অনেক গল্প, কবিতা ও শিশুতোষ লেখা প্রকাশিত হয়।

শওকত আলী ‘ওয়ারিশ’ উপন্যাসে ব্রিটিশ শাসনামল, দেশভাগ আর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার মর্মন্তুদ ছবি তিনি এঁকেছেন। বিখ্যাত ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ উপন্যাসে তিনি নিম্নবর্গের মানুষের বঞ্চনার কথা বলেছেন, পাশাপাশি তিনি শোষকের করাল গ্রাসের বিপরীতে অচ্ছুৎ সম্প্রদায়ের বিপ্লব-বিদ্রোহের চিত্রটিও ফুটিয়ে তুলেছেন এখানে।

তার অন্যান্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে, ‘পিঙ্গল আকাশ’, ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’, ‘অপেক্ষা’, ‘গন্তব্যে অতঃপর’, ‘উত্তরের খেপ’, ‘অবশেষে প্রপাত’, ‘জননী ও জাতিকা’, ‘জোড় বিজোড়’।

‘উন্মুল বাসনা’, ‘লেলিহান সাধ’, ‘শুন হে লখিন্দর’, ‘বাবা আপনে যান’সহ বেশ কয়েকটি গল্পগ্রন্থ সম্পাদনা করেছেন তিনি।

‘দক্ষিণায়নের দিন’, ‘কুলায় কালস্রোত’ এবং ‘পূর্বরাত্রি পূর্বদিন’ উপন্যাসত্রয়ীর জন্য তিনি ‘ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার’ পান।

কথাসাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৯০ সালে একুশে পদক পান শওকত আলী। পরে বাংলা একাডেমি পুরস্কার, হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার, অজিত গুহ স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার পান।