এখনো নিয়ন্ত্রণহীন জারের পানির ব্যবসা

রাজধানী ঢাকার প্রায় সব এলাকাতেই রয়েছে অনেক অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠান, যারা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে জারে পানি ভরছে, পানি ভরার আগে জারগুলো ঠিকভাবে জীবানুমুক্তও করছে না। জারের পানিতে মানুষ ও প্রাণীর মলের জীবাণু পাওয়ার ভীতিকর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পর সরকারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসটিআই অভিযানে নামলেও এখনো নিয়ন্ত্রণহীন এই ব্যবসা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুমোদনহীন এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারি দায়সারা। অন্যদিকে বিএসটিআই ও ঢাকা ওয়াসা বলছে, তারা বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালালেও এসব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় ঢাকার ৯৭ ভাগ জারের পানিতে ক্ষতিকর মাত্রায় মানুষ ও প্রাণীর মলের জীবাণু ‘কলিফর্ম’ পাওয়ার তথ্য আসে।

এরপর গত ২২ জানুয়ারি পল্টন ও মতিঝিলে অভিযান চালিয়ে অনুমোদনহীন ১২টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় চার হাজার জার ধ্বংস করে বিএসটিআই। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের পুষ্টি বিভাগের পরিচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, “পানি ভরার আগে জার জীবাণুমক্ত করা জরুরি। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই তা করা হয় না। প্রথমত তারা যে ওয়াসার পানি জারে ভরে, সেটা আগে থেকেই দূষিত। তারওপর যেসব জারে পানি ভরা হয় সেগুলোর বেশিরভাগ পরিশোধন করা হয় না।

“যেসব ওয়ার্কাররা এসব জারে পানি ভরা বা পরিবহনের কাজ করে, তারাও তরা স্বাস্থ্যসম্মতভাবে করে না। যেসব জায়গায় কাজটি করা হয় সেই পরিবেশ ভালো না। এ কারণে জীবাণু ছড়িয়ে যায়।”

সম্প্রতি কারওয়ান বাজারের কলাপট্টি এলাকায় অন্তর পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার কারখানার ভেতরে নোংরা পরিবেশে দুইজন শ্রমিককে ডিটারজেন্ট দিয়ে জার পরিষ্কার করতে দেখা যায়। সাগর নামের এক কর্মী জানান, তাদের কারখানায় ‘আলট্রা ভায়োলেট-রে’ দিয়ে শোধন করা প্রতি জারের পানি বিক্রি হয় ২৫ টাকায়। আর ‘রিভার্স অসমোসিস’ পদ্ধতিতে শোধন করা প্রতি জার পানির দাম ৭০ টাকা।

“২৫ টাকার পানি যায় হোটেলে, চায়ের দোকানে। ৭০ টাকা দামের পানি যায় বিভিন্ন অফিসে,” বলেন তিনি। বিএসটিআই অনুমোদিত ওই প্রতিষ্ঠানের ২৫ টাকার জারে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদ, মূল্য লেখা নেই। আর ৭০ টাকার জারে লেবেল থাকলেও তাতে কিছু লেখা নেই। প্রতিষ্ঠানটির মালিক নূর মোহাম্মদ দাবি করেন, নিয়ম মেনেই জার পরিষ্কার করা হয়।

“জারের বাইরের ময়লা ডিটারজেন্ট ছাড়া পরিষ্কার হয় না। এ কারণে বাইরের অংশটা ডিটারজেন্ট দিয়ে ধুই আর ভেতরের অংশ হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দিয়ে পরিষ্কার করি।”

তেজগাঁও রেলওয়ে মার্কেটের তিনটি দোকানে জারে পানি ভরা হয়। সেখান থেকে পানিভর্তি জার নিয়ে কিছুক্ষণ পরপর বেরিয়ে যায় রিকশা-ভ্যান। এসব কারখানায় ওয়াসার লাইন থেকে মোটরে পানি টেনে বড় ট্যাংকে নেওয়া হয়, তারপর সেখান থেকে ভরা হয় জারে। এখানেও নোংরা পরিবেশে ডিটারজেন্ট দিয়ে ধোয়া হয় জার। কারখানাগুলোর ভেতর-বাইরের পরিবেশও নোংরা। রাকিবুল নামের এক শ্রমিক জানান, ভ্যানচালকরা এখান থেকে পানি নিয়ে যায়। পানির টাকা বিকাশ করে মালিকদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

‘জোয়ারসাহারা ওয়াটার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানেও দেখা গেছে একই ধরনের চিত্র। এ প্রতিষ্ঠানের মালিক মাসুদ রানা জানালেন বিস্ময়কর তথ্য। সব ধরনের যন্ত্রপাতি থাকলেও খরচ বেশি পড়বে বলে তিনি সেসব ব্যবহার করেন না।

“হাইড্রোজেন পার অক্সাইড দিয়ে প্রতিটি জার শোধন করতে প্রায় দুই টাকা খরচ হয়। কিন্তু আমরা ভালো রেট পাই না। এজন্য সাধারণ সাবান দিয়ে জারগুলো ধুয়ে দেই। বেশি রেটে যেখানে পানি দেই সেখানে জারগুলো ভালোভাবেই পরিষ্কার করা হয়।”

মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের বি ব্লকের একটি বাড়িতে ক্রিস্টাল ড্রিংকিং ওয়াটারের গুদামে দেখা গেল পানির জার রাখা হয়েছে নোংরা ও স্যাঁতস্যাঁতে ঘরে। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি। প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডে থাকা মোবাইল নম্বরে কল করা হলেও কেউ ধরেননি। পুষ্টিবিদ মনিরুল ইসলাম মনে করেন, জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি এসব জারের পানি বিক্রি বন্ধে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

“নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মনিটরিং দায়সারা। একটা নির্দিষ্ট সময় পরপর মনিটর করতে হবে। র‌্যানডমলি স্যাম্পল নিয়ে সেগুলোর কোয়ালিটি ঠিক আছে কি না নিশ্চিত করতে হবে। অনুমোদিত যেসব প্রতিষ্ঠানের পানির মান খারাপ সেগুলোকে একেবারে বন্ধ করে দিতে হবে।”

রাজধানীতে ১২০টি প্রতিষ্ঠান অনুমতি নিলেও অবৈধ অনেক প্রতিষ্ঠান যে পানির ব্যবসা করছে সেটা স্বীকার করেছেন ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান।

তিনি বলেন, “এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায়ই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রতি সপ্তাহেই আমাদের ম্যাজিস্ট্রেটকে দিয়ে অভিযান করাচ্ছি। অনেক কারখানা ভেঙে দিয়েছি। ইনফরমেশন পেলেই আমরা ব্যবস্থা নিই। কিন্তু এরা আবার ব্যবসা শুরু করে।”

তবে এ পর্যন্ত কতগুলো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তার কোনো তথ্য জানাতে পারেননি তিনি।

নানা ‘প্রতিবন্ধকতায়’ অবৈধ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না বলে জানান বিএসটিআইর পরিচালক (সিএম) মো. ইসহাক আলী।

“এ ধরনের অপরাধ বন্ধে আমরা ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করি। সম্প্রতি মোবাইল কোর্ট জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা করবেন নাকি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা করবেন এ নিয়ে জটিলতার কারণেও নিয়মিত অভিযান চালানো যাচ্ছে না। এখন আমরা যে অভিযান চালাচ্ছি সেখানে অনেক অনুরোধ করার পর ম্যাজিস্ট্রেট মহোদয়রা আসছেন। অনেকে আসতে চান না।”

তিনি বলেন, “অনেক অবৈধ প্রতিষ্ঠান রাত ৯টা-১০টা থেকে কারখানায় কাজ শুরু করে। ভোররাত পর্যন্ত জারে পানি ভরে, সকালের আগেই কারখানা বন্ধ করে চলে যায়। কিন্তু আমার আইনে রাতে কোথাও রেইড দেওয়ার ক্ষমতা নাই বলে তাদের বিরুদ্ধে কিছু করতে পারি না।”

সম্প্রতি ৫০টি জার কিনে পানি পরীক্ষা করা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, পরীক্ষার পর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ১৮টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মামলা করার কথাও জানান ইসহাক আলী। সারা দেশ বিএসটিআইর লাইসেন্সধারী পানি উৎপাদন ও বাজারজাতকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৩১৯টি। তবে বর্তমানে ১৯৯টি প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। ঢাকায় ৮৩টি প্রতিষ্ঠান বিএসটিআইর লাইসেন্স নিয়ে পানি উৎপাদন ও বিপণন করে। এর মধ্যে ১০টি প্রতিষ্ঠান বোতলজাত আর বাকিগুলো জারের পানি বিক্রি করে। তবে বাস্তবে প্রায় আটশর মতো প্রতিষ্ঠান ঢাকায় জারে পানি ভরছে বলে পিওর ড্রিংকিং ওয়াটার ম্যানুফেকচারিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য।

সংগঠনের সভাপতি আওলাদ হোসেন রাজিব দাবি করেন, তাদের সমিতির সদস্য দেড়শ প্রতিষ্ঠানের পানির মান ভালো। কিছু অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের কারণে সবার সুনাম নষ্ট হচ্ছে।

“ওই রিপোর্টের (গবেষণার) প্রভাব আমাদের ওপর এসে পড়েছে। তারা যেসব পানি নিয়েছেন সেগুলো কোনো ভালো কোম্পানির পানি না। সেগুলো কোনো ব্র্যান্ডের পানি না।

“আমরাও চাই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। এদের কারণে এখন জারের পানির প্রতি মানুষের বিরূপ ধারণা তৈরি হয়েছে। নিয়মিত কাস্টমার যারা আমাদের কাছ থেকে পানি নেন তারাও চিন্তিত। আমরা ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।”