সংসারের নামে টানা দুই বছর মেয়েটিকে শারীরিক-মানসিক নির্যাতন করে জুয়েল

পরিচিত এক নাম ‘পরিচালক’ ইয়াসির আরাফাত জুয়েল। ‘মুখোশ মানুষ-দ্যা ফেক’ সিনেমার নির্মাতা। ‘মুখোশ মানুষ-দ্যা ফেক’ সিনেমাটির জন্য বিতর্কে জড়িয়েছিলেন তিনি। দর্শকদের অভিযোগ, সিনেমাটিতে নগ্নতার ছড়াছড়ি। নগ্নতার এই ছড়াছড়ি তাকে এনে দেয় বিতর্কের মুখে। সাইবার ক্রাইমের বিরুদ্ধে সমাজকে সচেতন করার কথা বলা হলেও পরোক্ষভাবে সিনেমাটি ধর্ষণকেই উৎসাহিত করেছে।

তবে এবার সিনেমা নয়, ব্যক্তিগত কারণে বিতর্কে জড়িয়েছেন এই পরিচালক। বিয়ের কথা বলে তুলে নিয়ে যান একটি মেয়েকে। মেয়েটি রাজি না থাকলেও ভয় দেখিয়ে টানা প্রায় দুই বছর ধরে মেয়েটিকে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন করেছেন তিনি। এ অভিযোগে সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের মামলা করেছেন নির্যাতিত নারী।

গত ১লা জুন ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ এ মামলাটি করেন ঐ নির্যাতিত নারী। আদালত মামলাটি কলাবাগান থানায় হস্তান্তর করলে থানার কর্তব্যরত এসআই মো. এনামুল হক মামলাটির তদন্ত করেন। মামলার তদন্ত শেষে গত ১৫ই জুন আদালতে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন তিনি। মামলার তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে বলে জানান এসআই মো. এনামুল হক।

এসআই এনামুল জানান, তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা পেয়েছেন তিনি। বিভিন্নভাবে দুই বছর ধরে মেয়েটিকে নির্যাতন করে জুয়েল। প্রমাণ অনুযায়ী আদালতে প্রতিবেদনও দাখিল করেন তিনি। তিনি বলেন, নির্যাতনের সত্যতা ও প্রমাণ আমি আদালতের কাছে হস্তান্তর করেছি এখন আদালত এর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে। পরবর্তীতে আদালতের নির্দেশে জুয়েলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এর প্রেক্ষিতে গত ১১ই জানুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার করে রমনা থানা পুলিশ।

সূত্রানুসারে জানা যায়, মিডিয়া অঙ্গনে কাজ করতেন জুয়েল। এরই সুবাদে জুয়েলের সঙ্গে পরিচয় হয় ভিন্ন ধর্মাবলম্বী এক গুণী নারী সাংস্কৃতিক কর্মীর। পরিচয়ের কিছুদিনের মধ্যেই ঐ নারী সাংস্কৃতিক কর্মীকে প্রেমের প্রস্তাব দেন জুয়েল। মেয়েটির দাবি, এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। তবে হাল ছাড়েননি জুয়েল। প্রস্তাবে না করায় ক্ষিপ্ত হয় জুয়েল।

মেয়েটির সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় জুয়েল তাকে নানাভাবে বোঝাতে থাকেন। এক পর্যায়ে জুয়েলের হুমকির মুখে পড়তে হয় মেয়েটিকে। হুমকিতেও কাজ না হওয়ায় এক পর্যায়ে ২০১৩ সালের ১২ই মার্চ ৮ থেকে ৯ জন সহযোগী সহ জুয়েল নিজে মেয়েটিকে তুলে নিয়ে যায়। তারা তাকে সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবীর চেম্বারে নিয়ে যায়। তখন মেয়েটি আইনজীবীর পরিচয় জানতে চাইলে ঐ আইনজীবী তাকে বলেন তিনি জুয়েলের ফুফাতো ভাই। পরে জুয়েল এবং ফুফাতো ভাই পরিচয় দেয়া আইনজীবী সহ মেয়েটিকে বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে থাকে।  কিন্তু তিনি জুয়েলকে বিয়ে করতে অস্বীকৃতি জানান। পরবর্তীতে মেয়েটিকে অনেক প্রকারের হুমকিও দেওয়া হয় বলে জানান ঐ নারী।

মেয়েটি বলেন, হুমকির মুখে পড়েও মেয়েটি তাদের নানাভাবে বুঝানোর চেষ্টা করেন তবে এতে কোন কাজ হয়নি। ভিন্ন ধর্মের কারণে উভয়ের পরিবার এ বিয়ে মেনে নেবে না বলে তাদের কাছে অনূরোধ করে মেয়েটি। তবে তার এসব কথায় ওই সময় কেউই কর্ণপাত করেননি। একপর্যায়ে ওই আইনজীবীর কাছেও কান্নাকাটি করেন মেয়েটি। তিনিও সায় দেননি তাতে বরং তাকে আইনি হুমকি দেন ঐ আইনজীবী।

মেয়েটি জানান, তাদের কারো সহযোগিতা না পেয়ে একপর্যায়ে ভয় পেয়ে যাই। তাদের কথাবার্তায় ধর্ষণের শিকার ও হত্যা হওয়ার আশঙ্কাও করি। পরে ওইদিনই তাকে জোরপূর্বক নিয়ে যাওয়া হয় কাজীপাড়ার একটি বাসায়। সেখানে একটি কক্ষে আটকে রাখা হয় তাকে। কক্ষের আশেপাশে অনেকেই তখন অবস্থান করছিলেন।ওই রাতে ভয়ে এক মুহূর্তের জন্যও ঘুমাতে পারেননি তিনি। এই রাতেও মেয়েটিকে নানারকমের হুমকি দেয় জুয়েল। ভয়াবহ এই রাত শেষ হলে পরদিন ১৩ই মার্চ (২০১৩ সাল) জুয়েল ও ওই আইনজীবী তাকে কোর্টে নিয়ে যান। সেখানে একটি কাগজে স্বাক্ষর করতে বলেন। একপর্যায়ে জীবন ও ধর্ষণের ভয়ে তাতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য হন। উপস্থিত মাসুদ নামে একজন তার ভাই হিসেবে স্বাক্ষর করেন। জুয়েল ও তার বিয়ে হয়েছে বলে তারা জানিয়ে দেয়।

নির্যাতিত ঐ মেয়ে বলেন, তিনি অন্য ধর্মাবলম্বী হওয়ায়, মুসলিম নিয়ম-কানুন জানতেন না। তাদের কথায় বিশ্বাস করতে হয়য় তাকে। ভবিষ্যতে জুয়েল কোনো সমস্যা করলে বিষয়টা দেখবেন বলেও আশ্বস্ত করে সেখানে উপস্থিত জুয়েলের সহযোগীরা। তারা তাকে একটি এফিডেভিটের কাগজ ধরিয়ে দেয় এবং বলে এটাই বিয়ের কাগজপত্র।

এক মুহূর্তে ঐ আইনজীবী বলেন, আরো ১৫ হাজার টাকা লাগবে ওয়ারিশের জন্য পেপার করতে। কিন্তু ওই মুহূর্তে টাকা নেই বলে জুয়েল তা পরে করে দেয়ার কথা বলেন। এরপর থেকে তারা একসঙ্গে থাকতে শুরু করেন। একপর্যায়ে জুয়েলের মা ও বোনও তাদের সঙ্গে থাকতে শুরু করেন।

প্রাচ্যনাটের এই কর্মী জানান, বিয়ের পরপরই ইয়াসির আরাফাত জুয়েলের আসল চরিত্র উন্মোচন হতে থাকে। তিনি বলেন, জুয়েল ইয়াবা আসক্ত। তাকে নানাভাবে যৌন নির্যাতন করতে থাকে। শুধু যৌন নির্যাতন নয় নেশাগ্রস্ত হয়ে মারধরও করেন। জুয়েলের এই যৌন নির্যাতনে দু’বার সন্তান সম্ভবা হই। সন্তান নষ্ট করতে রাজি না হলে জোর করে ওষুধ খাওয়ায়। এমনকি সন্তান নষ্ট করার জন্য মেয়েটির তলপেটে লাথি মারে বলে জানান মেয়েটি।

দীর্ঘদিন এভাবে চলার পর ২০১৪ সালের ৪ঠা নভেম্বর ওই বাসা থেকে মা ও বোনকে নিয়ে বের হয়ে যায় জুয়েল। এরপর সে বিভিন্নভাবে আমার(মেয়েটির) নামে কুৎসা রটাতে থাকে। একপর্যায়ে বিয়ের বিষয়টিও অস্বীকার করে ইয়াসির আরাফাত জুয়েল। পরে গত বছরের ১লা জুন তিনি আদালতে নারী ও শিশু দমন আইনে একটি ধর্ষণের মামলা করেন। মামলায় জুয়েল ছাড়াও সহযোগী হিসেবে সুপ্রিম কোর্টের এক আইনজীবীকে আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০১৩ সালের ১৩ই মার্চ ওই আইনজীবীর সহযোগিতায় ২০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ের হলফনামা করা হয়। এরপর থেকে তারা একসঙ্গে সংসার করে আসছিলেন।বিয়ের হলফনামাটি যে বিয়ের কাবিননামা নয়, বাদী তা বুঝতে পারেননি। বিয়ের পর বাদীর উপার্জনের সব অর্থ জুয়েল ছিনিয়ে নিতো এবং সেই অর্থ দিয়ে ইয়াবা সেবন সহ নানারকমের অবৈধ কাজকর্ম করতো। প্রায়ই গভীর রাতে মাতাল হয়ে বাসায় ফিরে মারধর করতো। এরই একপর্যায়ে জুয়েল ও তার বোন-মা তাকে ফেলে চলে যায়। এরপরও মেয়েটি আশায় ছিলেন যে, সে ফিরে আসবে।

গত ২৯শে মে দুপুর ২টায় বাদী (নির্যাতিত নারী) ফোন করে জুয়েলকে অনুরোধ করেন, বিয়ে রেজিস্ট্রি করে শান্তিপূর্ণভাবে ঘর-সংসার করার। এদিকে আদালতে মামলাটি হওয়ার পর তদন্ত করেন কলাবাগান থানার এসআই মো. এনামুল হক।তিনি গত ১৫ই জুন আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। তাতে তিনি উল্লেখ করেন, মামলার প্রধান আসামি জুয়েল ও ওই আইনজীবী একে অপরের দীর্ঘদিনের পরিচিত। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, আইনজীবীর সহযোগিতায় বাদী এবং জুয়েল একটি এফিডেভিট করেন। কিন্তু বাদী বা বিবাদী ইয়াসির আরাফাত জুয়েল কেউ কোনো প্রকার কাবিন বা কোনো ধর্মীয় রীতিনীতি অনুসরণ করেনি। ইয়াসির আরাফাত জুয়েল প্রায় দুই বছর ধরে বাদীর সঙ্গে বসবাস করে আসছিলেন বলেও তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন এসআই এনামুল হক। প্রাথমিক তদন্তে বাদীর অভিযোগ সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছে বলেও মন্তব্য করা হয়।

এসআই এনামুল বলেন, জুয়েল মেয়েটির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। বিয়ে হয়েছে বলে তার সঙ্গে সংসার করেছে। বিভিন্ন সময় নির্যাতনও করেছে। তদন্তে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। মামলার বাদী নির্যাতিত মেয়েটি বলেন- আমার ধর্ম ভিন্ন। তাই আমি তার প্রেমের প্রস্তাবে রাজি ছিলাম না। বিয়েও করতে চাইনি। কিন্তু তারা আমাকে জিম্মি করে জোরপূর্বক বিয়ে করেছে। এ ঘটনার পর আমার আর নিজ পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার কোনো পথ ছিল না। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। তাই মন থেকে জুয়েলকে স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছিলাম। কিন্তু সে আমাকে নির্যাতন করে। নেশা করে যৌন নির্যাতন চালায়। এখন সে বিয়ের কথা অস্বীকার করছে। সে বিভিন্ন জায়গায় বলে বেড়িয়েছে, আমার সঙ্গে এতদিন লিভ টুগেদার করেছে।তিনি তার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সকল ঘটনার সুষ্ঠু বিচারও দাবি করেন।

এদিকে গত ১১ই জানুয়ারি গ্রেপ্তারের পর অভিযুক্ত ইয়াসির আরাফাত জুয়েলকে আদালতে হাজির করা হয়। ওইদিন আদালত তাকে জেল হাজতে প্রেরণের নির্দেশ দেন। গত ১৬ই জানুয়ারি এ বিষয়ে আদালতে শুনানি হয়। তার আইনজীবী জামিন আবেদন করলে বিচারক তা নামঞ্জুর করেন। অন্যদিকে মেয়েটির সঙ্গে বিয়ে হয়েছে এমন দাবি করলে এ ব্যাপারে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেনি আসামিপক্ষ। আগামী ২২শে জানুয়ারি শুনানির পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

আজ ২২শে জানুয়ারি শুনানি করা হলে কোন প্রকার প্রমাণ দিতে পারেনি আসামিপক্ষ। কোন প্রমাণ না থাকায় ফের আসামি পক্ষের জামিন নামঞ্জুর করে আদালত।