বন্যার ৪ মাসেও সংস্কার হয়নি বাঁধ, আতঙ্কে নদীপাড়ের মানুষ

কুড়িগ্রামে চলতি বছরের ভয়াবহ বন্যায় ভেঙে পড়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের কয়েকটি ভাঙা অংশ পুনর্নির্মাণ বা সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি এখনো। শুকনো মৌসুমে বাঁধগুলো সংস্কার করা না হলে আগামী বর্ষা মৌসুমে আবারো লোকালয়ে ঢুকে পড়বে বন্যার পানি। এতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন নদীপাড়ের বাসিন্দাসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামের মানুষজন।

১৬টি নদ-নদীবেষ্টিত কুড়িগ্রাম জেলার মানুষ বর্ষা মৌসুম শুরু হলেই বন্যার আতঙ্কে থাকেন। এ এলাকার বাড়িঘর, ফসলি জমি ও রাস্তাঘাট সুরক্ষিত রাখতে ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তাপাড়ে ১৯২ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ সালে নির্মাণ করা হয়। নির্মাণের পর আজ অবধি একবারো সংস্কার করা হয়নি এসব বাঁধ। সেই সঙ্গে গোড়ার মাটি কেটে বাড়িঘর নির্মাণ, ইঁদুরের গর্তসহ নানা কারণে বাঁধগুলো দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় গত বর্ষায় ভয়াবহ বন্যায় ধরলা নদীর পানি বিপদসীমার ১০০ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হলে রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ও সদর উপজেলার কাঁঠালবাড়ী ইউনিয়নে ৮০০ মিটার বাঁধ ভেঙে যায়। আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাড়ে ছয় কিলোমিটার বাঁধ। প্লাবিত হয় দুুই ইউনিয়নসহ পার্শ্ববর্তী ৩০টি গ্রাম। ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক ও রেলপথ। কিন্তু দুর্যোগের পর চার মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও বাঁধগুলো মেরামত না হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বাঁধসংলগ্ন এলাকার মানুষগুলো।

প্রায় ৪০ বছর আগে নির্মাণের পর একবারো সংস্কার না হওয়ায় লোকজন একটু বেশিই আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতিসহ প্রাণহানি ঘটলেও কর্তৃপক্ষের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ চোখে না পড়ায় ক্ষুব্ধও হয়েছেন তারা।

রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের কালুয়া গ্রামের ওসমান আলী জানান, দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়াতেই বাঁধটি অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়ে। এতে করে বন্যার সময় মধ্যরাতে হু হু করে পানি সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত সে বাঁধে কোনো কাজ করা হয়নি। আমরা চাই, আগামী বর্ষার আগেই যেন বাঁধটি ঠিক করা হয়। তা না হলে আমরা বন্যা এলে বাড়িতে থাকতে পারব না। একই গ্রামের আরেক বাসিন্দা আব্দুল হক জানান, নদীর তীর রক্ষা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বাঁধগুলো চলাচলের জন্য ব্যবহার করা হয়। ভেঙে যাওয়ায় আমরা দুর্ভোগে পড়েছি। প্রায় ১০টি গ্রামের মানুষ খুবই কষ্টে হাটবাজারে যাওয়া-আসা করছে।

রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান হক বুলু বলেন, গত আগস্টের বন্যায় বাঁধ ভেঙে ছিনাই ইউনিয়নের প্রায় ১০০ কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই আমার ইউনিয়নের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের দেখতে এসেছেন এবং রিলিফ দিয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ, ব্রিজ-কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনর্নির্মাণ ও সংস্কারের আশ্বাস দিয়েছিলেন। আমি ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ, রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেই চলেছি। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের আওতায় কিছু কাজ শুরুও হয়েছে। আর বাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তিনি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন চলতি শুকনো মৌসুমের মধ্যেই বাঁধ নির্মাণ করে দেবেন তারা।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, আগামী বর্ষা মৌসুমের আগেই ভেঙে যাওয়া বাঁধগুলো পুনর্নির্মাণ কাজ শেষ করা হবে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তগুলোও মেরামতের ব্যবস্থা নেয়া হবে। আশা করি বর্ষা মৌসুমে লোকজন আর ভোগান্তির স্বীকার হবেন না।

মোঃ মনিরুজ্জামান, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি