রংপুর সিটি নির্বাচনে মহিলা প্রার্থী ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ নাদিরা খানম

রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদে ‘তৃতীয় লিঙ্গের’ প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন নাদিরা খানম। মোবাইল ফোন প্রতীক নিয়ে ১৮, ২০ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন নাদিরা খানম নামের এই প্রার্থী। তার প্রতিদ্বন্দ্বী রয়েছেন আরও সাতজন। আগামী ২১ ডিসেম্বর রংপুর সিটি করপোরেশ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হবে।

দিনাজপুরে বাড়ি হলেও এখন থাকেন রংপুর নগরীর ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বালাপাড়া এলাকায়। রংপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জি এম সাহাতাব উদ্দিন বলেন, “নাদিরা তৃতীয় লিঙ্গের হলেও নারী হিসেবে ভোটার হয়েছেন।”

২০০৭ সাল থেকে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়ন শুরু পর ভোটারের লিঙ্গ পরিচয় ছিল নারী কিংবা পুরুষ। ২০১৩ সালের নভেম্বরে হিজড়াদের লিঙ্গ পরিচয়কে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর ২০১৪ সালের জুলাইয়ে ভোটার নিবন্ধন বিধিমালায় সংশোধন আনে নির্বাচন কমিশন। সেই থেকে নিবন্ধন ফরমে নারী, পুরুষ ও হিজড়া-তিন লিঙ্গ পরিচয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বৃহস্পতিবার দুপুরে তাকে পাওয়া গেল নগরীর বাবুখাঁ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। গণসংযোগ করছিলেন। এ সময় নাদিরা বলেন, ভোটাররা আমাকে যেভাবে গ্রহণ করার কথা ছিল তার চেয়ে বেশি গ্রহণ করেছে। বিভিন্নভাবে সহায়তা করছে। ভালো সাড়া পাচ্ছি। অনেক নারী পুরুষ আমার পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। মাঠের অবস্থাও ভালো।

নাদিরা খানম আরও বলেন, সমাজের অবহেলিত, সুবিধাবঞ্চিত ও নির্যাতিতদের সহায়ক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি আমার মতো যারা তৃতীয় লিঙ্গ ওরাও কিছু কাজ করতে পারে এবং সমাজে তাদেরও কিছু কন্ট্রিবিউশন আছে, এই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা। নির্বাচিত হলে এসব মানুষের সমস্যা সমাধানে নিজেকে উৎসর্গ করবো। আমার কমিউনিটির মৌলিক চাহিদা পূরণে সচেষ্ট থাকবো। নগরীর ২২ ওয়ার্ডের বালাপাড়ায় বসবাস করেন নাদিরা। ওই এলাকার বাসিন্দা পান দোকানি আকবর হোসেন বলেন, মেয়েটা খুব ভালো। অনেক লেখাপড়া করেছে। এম এ পাশ। অনেক দিন থাকি আমার বাড়ির পাশে থাকে। একদিন কইলো, মামা নির্বাচন করব্যার চাই। আমরা সাহস দিলাম, ব্যস নির্বাচনে নামি গ্যালো। এখন আমরা এলাকার মুরুব্বীরা তার পক্ষে কাজ করছি।

আদমজী জুট মিলসের প্রোডাকশন ম্যানেজার সিরাজুল ইসলামের চার সন্তানের মধ্যে নাদিরা ‍দ্বিতীয়। তারা থাকতেন দিনাজপুরের নিউ টাউনের নিজ বাড়িতে। নাদিরা বলেন, বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ১৯৯১ সালে এসএসসি পাস করেছি। ছোট বোনের বিয়ের কথা পাকাপাকি। হঠাৎ বরপক্ষ থেকে কথা উঠল-মেয়ের বড় বোন তো ‘হিজড়া’। তার ছোট বোন বিয়ে করায় যদি উত্তরসূরিও তাই হয়! বিয়েটা তাই ভেঙ্গেই গেল। বাবা আমার মাকে চাপ দিতে থাকলেন। এই সন্তানের জন্য কি আরেক সন্তানের জীবন নষ্ট হবে? একে বাড়ি থেকে বের করে দাও। মায়ের কষ্ট দেখে আমি নিজেই বাড়ি ছেড়ে চলে যাই দিনাজুরের পার্বতীপুর মামার বাড়িতে।

মামার এক বন্ধু ছিলেন নিঃসন্তান। তিনিই আমাকে সন্তান হিসেবে লালন-পালনের দায়িত্ব নিলেন। দিনাজপুর আদর্শ ডিগ্রি কলেজ থেকেই বিএ পাস করার পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে এমএম পূর্বভাগে ভর্তি হই। রাজশাহীতে নাদিরা ‘পালক বাবার’ সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে ভাড়া বাসায় থেকে পড়াশুনা শেষ করি ১৯৯৯ সালে। এরপর ফুলবাড়ীয়া চলে এসে ছোটখাট ব্যবসা শুরু করি। ২০০৬-০৭ সালের দিকে পরিচয় হয় রংপুরের তৃতীয় লিঙ্গের নূরজাহানের সঙ্গে। তার পরামর্শেই রংপুর চলে আসি। তৃতীয় লিঙ্গের উন্নয়নে প্রতিষ্ঠা করি ‘ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থা’। বর্তমানে এই সংগঠনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।

নাদিরা আরও বলেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তিদের কাছ থেকে অনুদান নিয়ে বর্তমানে ৩৭০ জন তৃতীয় লিঙ্গের উন্নয়নে কাজ করছি। তাদের নিয়ে কাজ করতে করতেই সমাজের মূল ধারায় কাজ করার তাগিদ অনুভব করি। সেই থেকেই চিন্তা হলো জনপ্রতিনিধি হওয়ার। আর এ চিন্তা থেকেই সংরক্ষিত আসনের  প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করছি। রংপুর জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা জি এম সাহাতাব উদ্দিন বলেন, নাদিরা তৃতীয় লিঙ্গের হলেও নারী হিসেবে ভোটার হয়েছেন। তিনিসহ আরও ভোটার রয়েছেন ছয়জন। দেশের সিটি নির্বাচনে তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে নাদিরাই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর আগে যশোরের বাঘারপাড়া পৌরসভা এবং সাতক্ষীরার কলারোয়া পৌরসভাতেও সংরক্ষিত নারী আসনে তৃতীয় লিঙ্গের দুইজন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন বলে জানান নাদিরা খানম।