কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে খেজুর গাছ ও রস

কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের গ্রামবাংলার ঐতিহ্য হরেক রকমের শীতকালীন বাহারি পিঠা। আমন ধান ঘরে তোলার সাথে সাথে নবান্নের উৎসবে মেতে উঠে বাংলার মানুষ। আর তখনি শুরু হয় পিঠা খাওয়ার ধুম। পাড়ায়-মহল্লায় ছোট-বড় সকলেই পিঠা খাওয়ার আনন্দে মেতে ওঠে। কিন্তু এখন তা আর চোখে পড়ে না। কর্মচাঞ্চল্য ব্যস্তময় জীবনের গর্বে তা এখন বিলুপ্ত প্রায়। শীত যতই বাড়ে, ততই যেন মানুষের পিঠা বানানোর ব্যস্ততা বাড়ে।

শীত মৌসুমে প্রতি বছরের ন্যায় এবারো কুড়িগ্রামের বিভিন্ন গ্রামের গাছিরা খেজুর গাছ থেকে রস সংগ্রহ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। যদিও আগের মত সে রকম খেজুর গাছ আর নেই। গত কয়েক দশক ধরে ইটভাটায় জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় খেজুর গাছ ফুরিয়ে যেতে শুরু করেছে।

শীত আসলেই গ্রাম-গঞ্জ, শহরের ফুটপাত হতে শুরু করে প্রতিটি স্থানে পিঠা বানানোর ব্যস্ততা বেড়ে যেত। বাহারি রকমের পিঠা তৈরির উৎসবে আত্মহারা হত সর্বস্তরের মানুষ। শীতের আগমনি বার্তায় হত দরিদ্র মানুষের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম পন্থা হয়ে উঠত পিঠা তৈরির। এ পিঠা বিক্রির অর্জিত অর্থের মাধ্যমে চলতো তাদের সংসার। তীব্র কনকনে শীতকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন উপজেলার গ্রাম এলাকায় সড়কের পাশে, হাটে-বাজারে, পাড়া-মহল্লার মোড়ে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত পিঠা বিক্রির উৎসব চলত। বিভিন্ন শ্রেণির, পেশার মানুষ এসব পিঠা খাওয়ার জন্য ভিড় করতে দেখা যেত। এসব পিঠা বিক্রির কাজে পুরুষের পাশাপাশি মহিলারাও যুক্ত হত। এখন সে দৃশ্য চোখে পড়ে না।

কুড়িগ্রামের বিভিন্ন গ্রামে ঘরে ঘরে চিতল, দুধ চিতল, পুলি, নকশী, পাটিশাট্টা, ভাপা, চুষি, শিম, পাখন, তেলে, গোটাপিঠা হরেক রকমের পিঠা তৈরিতে গৃহিনীরা ব্যস্ত সময় কাটাত। কিন্তু কালের বিবর্তনে কর্মচাঞ্চল্যের কারণে মানুষ এখন বাড়িতে পিঠা তৈরির উৎসব-আমেজ হারিয়েছে। এতে শীতের বাহারি নকশী করা পিঠা খাওয়ার স্বাদ ও আমেজ হারাচ্ছে এ প্রজন্ম। ভবিষ্যত প্রজন্ম হারাচ্ছে পিঠা তৈরির কৌশল। সে পিঠা বানানোর আমেজ হারিয়ে গেছে অনেক আগে। এখন সবাই পিঠা বাজার থেকে কিনে এনে খায়। এতে কোন আনন্দ-উৎসাহ থাকে না। গ্রামে-গঞ্জের গৃহিণীদের মধ্যেও আগেকার মত পিঠা বানানোর উৎসব নেই। তাই পিঠা বানানোটা এখন স্মৃতি হয়ে গেছে। এতে করে হরেক রকমের পিঠা আমাদের নতুন প্রজন্ম থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। যুগ যুগ ধরে ঐতিহ্য বহন করা বিভিন্ন বাহারি পিঠা তৈরি করে বিক্রির বিষয়টি কর্ম সন্ধানে দরিদ্রদের আলোকবর্তিকা হিসেবে জীবিকা নির্বাহের সহায়ক হবে বলে বিজ্ঞজনেরা অভিমত ব্যক্ত করেছেন। আজকের জনপদে ঐতিহ্যের সে বাঙালির বাহারি পিঠা আস্তে আস্তে কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে।

জেলার নাগেশ্বরী উপজেলাধীন নোওয়াখালীপাড়া এলাকায় একসময়ে যে খেজুর গাছ ছিল সরেজমিনে গিয়ে আর চোখে পড়ল না সেই সারি সারি খেজুর গাছ। এখানখার সারি সারি গাছ থেকে একসময় আশেপাশের কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষের রস ও গুড়ের চাহিদা মিটিয়ে নিত। এছাড়া নেওয়াশী এবং আনন্দবাজারসহ প্রতিটি গ্রামের চিত্র একই। সম্পূর্ণরুপে বিলুপ্ত হয়েছে এই খেজুর গাছগুলি।

কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলাধীন সীমান্তঘেষা কাশিপুর, অনন্তপুর এবং ঘুঘুরহাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, যে এলাকায় একসময় ব্যস্ত সময় কাটাতো গাছিরা সেই এলাকাতেও নেই কোন খেজুর গাছ। স্থানীয়রা হাতের আংগুল উচিয়ে দেখায় দিয়ে বলেন, একসময় এইসব এলাকায় সারি সারি খেজুর গাছ ছিল; এক দুইটা করে কাটতে কাটতে এখন আর রস দেওয়ার মত কোন গাছ নেই। ঘুঘুরহাট এলাকার আজিমুদ্দিন নামের একজন দিনমুজুর বলেন, একসময় শীতকালে যখন গাছিরা রস নামাতো ছোট ছোট বাচ্চারা যেমন রস খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতো তেমনি বিভিন্ন পাখির কিচির মিচির শব্দে মুখরিত হতো পুরো এলাকা। এখন আর সেরকম পরিবেশ খুজে পাওয়া যায় না।

মোঃ মনিরুজ্জামান, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

SHARE

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here