দোষারোপ আর নিষেধাজ্ঞার খেলা মধ্যপ্রাচ্যে

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমেই আরও জটিল রূপ নিচ্ছে। আস্থিতিশীলতার জলঘোলা হয়েছে আরও। ইরান আর সৌদি আরবের আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ক্রমেই আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিচ্ছে নতুন নতুন দেশকে।

চলতি বছরেই ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের সহায়তা দেওয়ার অভিযোগ এনে কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ করে সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মিশর আর জিসিসি জোট। সেই অবরোধ কে কেন্দ্র করে সংকট এখনো চলেছে।

চলমান সব সংকটের মধ্যেই গত দুই দিনের ব্যাবধানে ঘটে যাওয়া ঘটনা পুরো মধ্য প্রাচ্যকে নাড়িয়ে দিয়েছে। আর সবগুলো ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ।

নাটকীয় ঘটনা প্রবাহের সূত্রপাত হয় শনিবার। রিয়াদ সফররত লেবাননের প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরি পদত্যাগ করেন আকস্মিকভাবেই। অভিযোগ করেন, তাঁকে হত্যার হুমকি দেয়া হচ্ছিল, হিজবুল্লাহ আর ইরানের দিকে আঙ্গুল তোলেন অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপের। সমালোচকরা পাল্টা বলছেন সৌদি আরব তাঁকে গৃহবন্দী করেছে আর তাঁকে চাপ দিয়ে পদত্যাগে বাধ্য করেছে।

এই ঘটনার পরের ঘটনা রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা। সৌদি আরব এই হামলা রুখে দিলেও, ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে সহায়তা করার জন্য দায়ী করেছে ইরানকে। আরও অভিযোগ করে ইরান এর মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। ইয়েমেনের সাথে সব ধরণের সীমান্ত সম্পূর্ন বন্ধ করে দেয় তারা। অবরুদ্ধ ইয়েমেন মানবিক পরিস্থিতি তাতে আরও করুণ হয়ে উঠেছে।

আর সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও আরও জটিল হয়ে উঠে গত দুই দিন। দুর্নীতি আর অনিয়মের অভিযোগে একের পর এক যুবরাজ, মন্ত্রী বরখাস্ত আর আটকের ঘটনায় দেশটির রাজনীতি ঘোলাটে হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে একজন যুবরাজ ইরানে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে। ফলে ইরান সৌদি সম্পর্ক তেঁতে উঠবে আরও।

সৌদি আরবের  অভিযোগের তীর লেবাননের দিকেও। সেখানে শিয়া রাজনৈতিক শক্তি হিজবুল্লাহর উত্থান আর ক্ষমতার প্রতিষ্ঠায় লেবাননের ওপর সৌদি নিয়ন্ত্রণ টুটে গেছে। লেবাননের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগ তুলেছে সৌদি রাজতন্ত্র।

মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষমতা আর রাজনীতির সমীকরণ এমনিতেই বেশ জটিল। বিভিন্ন পক্ষ তাদের নিজ নিজ স্বার্থ আর ক্ষমতার সমীকরণে একেক পক্ষের সাথে সম্পর্কিত। সৌদি আরব বা তার ঘনিষ্ঠ মিত্র মিশর, আরব আমিরাত সবাই নিজেদের স্বার্থে কাজ করে। ফলে ক্ষমতার সমীকরণের হিসাবে অভিন্ন স্বার্থে তারা নিজেরা যেমন অন্যদের বিরুদ্ধে কাজ করছে, একই সাথে স্বার্থের ব্যাবধানের জায়গাগুলোতে নিজ নিজ মিত্রদের বিরুদ্ধেও কাজ করছে।

সৌদি আরবের এই সাম্প্রতিক ঘটনা প্রবাহ সৌদি ক্ষমতায় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কর্তৃত্ব আরও সুদৃঢ় করার ইঙ্গিত হিসেবেই মনে হচ্ছে।কিন্তু তার এই কর্মকান্ড জিসিসি এবং আন্তঃসম্পর্ক অচল করে দিয়েছে। রাষ্ট্র হিসেবে ইয়েমেন এখন সম্পূর্ন ব্যর্থ। মিশর পরিস্থিতি হয়ে আছে টাইম বোমার মত। আর এখন লেবানন হয়তো অস্থির হয়ে উঠতে পারে। কাজেই  মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে চিন্তিত হওয়ার যথেষ্ট উপকরণ রয়েছে এখন।

মধ্যপ্রাচ্যের এই ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, অভিযোগ,অবরোধ আর নিষেধাজ্ঞার খেলা কোথায় গিয়ে শেষ হবে তার পূর্ভাবাস দেওয়া প্রায় অসম্ভব। ঘটনার প্রবাহের অনির্ধারিত গতিপথেই নির্ধারণ হবে এর খেলোয়াড়দের পরিণাম।