মরুর বুকে ফুটবল জোয়ার

এ দেশের সব মানুষ দলে দলে কোথায় যাচ্ছে? বিদেশি পর্যটক গত শনিবার হিশরে এসে দাঁড়ালে নিশ্চিত এ প্রশ্নই করতেন। হিশর সেন্ট্রাল স্টেডিয়ামের রাস্তায় মানুষের ওই ঢল দেখলে মনে হবে, এই জনসমুদ্রের সামনেই বোধ হয় হ্যামিলিনের সেই বাঁশিওয়ালা!

কিন্তু এখানকার সেই ‘বাঁশিওয়ালা’ না হ্যামিলিনের, না তিনি কোনো অস্থিচর্মের মানুষ। সেটা আসলে দুশানবের একটি ক্লাব—ইসতিকলল এএফসি। দলটি এএফসি কাপের ফাইনালে নাম লেখানোর পর পুরো দেশ জেগে উঠেছিল ইসতিকললের জন্য। কিন্তু ফাইনালে ইরাকি এয়ার ফোর্সের কাছে ১-০ গোলে হারে তাদের হৃদয় ভেঙেছে। ভগ্নহৃদয়ের সেই ফুটবলপ্রেমীদের দেখে মনে হয়েছে, সামান্য ফুটবল ম্যাচ কীভাবে একটি দেশকে জাগিয়ে তুলতে পারে—দুশানবেতে পা না রাখলে তা বোঝার উপায় ছিল না।

তাজিকিস্তানের রাজধানী দুশানবের অনেক বাইরে হিশরের অবস্থান। প্রায় জনশূন্য ও প্রকৃতিগত কারণে অঞ্চলটিকে মনে হয় মরুভূমি অঞ্চল। তার মাঝে সগৌরবে দাঁড়িয়ে সেন্ট্রাল স্টেডিয়াম। তার গ্যালারিতে এখনো নতুন রঙের গন্ধ, বিদ্যুৎ–সংযোগ কিংবা ওয়াই–ফাই সুবিধার সঙ্গেও ধাতস্থ হয়ে ওঠেনি পুরোপুরি। এমন একটি জায়গায় যদি দেখতে পান জনসমুদ্র, আর সেই কলতানমুখর সমুদ্র থেকে যদি ভেসে আসে গর্জন ‘লেটস গো ইসতিকলল’, তাহলে শিহরিত না হয়ে উপায় আছে!

দুশানবে বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে প্রতিটি মোড়ে জায়ান্ট স্ক্রিনে সপ্তাহজুড়ে চোখে পড়েছে ইসতিকললের খেলার চুম্বক অংশ। স্থানীয় মানুষ মন ভরে দেখেছে তাদের প্রিয় ক্লাবের গৌরবময় মুহূর্তগুলো। তাজিকদের কাছে এ দল যেন জাতীয় দলের চেয়েও প্রিয়! হোটেল লবি-শপিং মল, কোথায় না ছিল ম্যাচের ছোঁয়া!
গ্যালারির ‘ইসতিকলল’ গর্জনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে খেলেছেন নুরিদ্দনরা। শেষ পর্যন্ত ইরাকি ফুটবলারদের বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাঁরা পেরে ওঠেনি। প্রথমার্ধ গোলশূন্য ড্র। দ্বিতীয়ার্ধের ৫৩ মিনিটে বিতর্কিত পেনাল্টি পায় ইরাকি ক্লাবটি। তখন গ্যালারিতে স্বাগতিক দর্শকদের প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়েছে, তাদের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়েছে!

তাঁদের কাছে হেরে ইসতিকলল শিরোপার দেখা পায়নি ঠিকই, কিন্তু দেশের মানুষের মনে তাঁদের ভিতটা আরও শক্ত হয়েছে। তাজিকিস্তানে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৯ বাছাইপর্ব কাভার করতে এসে তাই একটা কথা মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, আচ্ছা, ফুটবলের প্রভাব কি শুধুই মাঠ থেকে গ্যালারি পর্যন্ত? নাকি আয়তাকার সবুজ গালিচা ছাপিয়ে তা আনন্দ-বেদনার ঢেউ তোলে মানুষের হৃদয়ে? তাজিকিস্তানে এসে অদৃশ্যমান সেই ঢেউ বুকে মেখে ভাবছি নিজ দেশের কথা। আহা! কোথায় হারিয়ে গেল সেই ঢেউ, সেই দিন!

ইসতিকলল গোলরক্ষক নিকোলা সেই পেনাল্টি যখন ‘সেভ’ করলেন, ঠিক তখনই গ্যালারিতে ফিরেছে স্বাধীনতা ফিরে পাওয়ার হাসি। কিন্তু ম্যাচের শেষে থাকেনি সেই হাসি। দুর্দান্ত সাইড ভলিতে পুরো তাজিকিস্তানকে কাঁদিয়েছেন ইরাকি স্ট্রাইকার ইমাদ মহসিন। তাঁর সেই গোলেই টানা দ্বিতীয় এএফসি কাপের শিরোপা নিশ্চিত করেছে এয়ারফোর্স। গত বছরের ফাইনালে তাদের কাছে হেরেছিল ভারতীয় ক্লাব বেঙ্গালুরু এএফসি।
বাবুর্চি থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত সহকারীসহ পুরো ৫০ জনের বহর। নানা পদের সুগন্ধিতে গমগম করত হোটেল লবি। কিন্তু রুমের সুযোগ-সুবিধা অপ্রতুল মনে হওয়ায় সন্ধ্যা নামার আগেই তাঁরা উধাও! যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশেরও খেলোয়াড়দের জীবনযাত্রার মান কতটা উঁচু হতে পারে, তার প্রমাণ ইরাকের এই ফুটবলাররা। মাঠের খেলাতেও তাঁরা বুঝিয়েছেন জীবনযাত্রার মান উঁচুতে রাখার যৌক্তিকতা।