ব্যাংকঋণ অপরিশোধিত রেখে বিদেশে ঋণখেলাপিরা

বড় অংকের ব্যাংকঋণ অপরিশোধিত রেখে বিদেশে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, শুধু চট্টগ্রামেরই ডজনখানেক ব্যবসায়ী ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ না করে বিদেশে অবস্থান করছেন। কেউ কেউ আবার সেখানে ব্যবসাও করছেন। এতে ব্যাংকের বিপদ বাড়লেও পালিয়ে যাওয়া ঋণখেলাপিরা আছেন স্বাচ্ছন্দ্যে। এদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে একাধিক ব্যাংকের মামলা রয়েছে। অনেক মামলায় গ্রেফতারি পরোয়ানাও আছে এসব খেলাপির বিরুদ্ধে।

ভোগ্যপণ্য ছেড়ে ২০০৭ সালে শিপ ব্রেকিং ব্যবসা শুরু করেন ম্যাক ইন্টারন্যাশনালের স্বত্বাধিকারী তিন ভাই জয়নাল আবেদিন, জামিল আবেদিন ও মোহাম্মদ আলাউদ্দিন। বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা নিয়ে এ ব্যবসা করেন তারা। এরপর ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করেই বিদেশে পাড়ি জমান জয়নাল আবেদিন ও জামিল আবেদিন। ম্যাক ইন্টারন্যাশনালের কাছে ১২টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পাওনা দাঁড়িয়েছে বর্তমানে ৮০০ কোটি টাকার বেশি।

পাওনাদার ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, নির্দিষ্ট মেয়াদে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ম্যাকের স্বত্বাধিকারীদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। কয়েকটি মামলায় উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ রয়েছে। বাকি মামলাগুলোর শুনানিতে আসামিদের আদালতে হাজিরা বাধ্যতামূলক হলেও দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অবস্থান করছেন প্রতিষ্ঠানের কর্ণধাররা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১২ সালে ম্যাক ইন্টারন্যাশনালের শিপ ব্রেকিং ব্যবসা বন্ধ হয়ে গেলে একের পর এক মামলা হতে থাকে। ওই সময়ই সপরিবারে কানাডা পাড়ি জমান জয়নাল আবেদিন। আর জামিল আবেদিন পাড়ি দেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায়।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তথ্যমতে, ম্যাক ইন্টারন্যাশনালের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে অগ্রণী ব্যাংক লালদীঘি শাখার পাওনা রয়েছে ১৯২ কোটি টাকা, জনতা ব্যাংক লালদীঘি শাখার ১৬৩ কোটি, পূবালী ব্যাংকের দুই শাখার ৮৫ কোটি, এবি ব্যাংক ইপিজেড শাখার ৮৪ কোটি, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের সিডিএ শাখার ৬৫ কোটি, প্রাইম ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৫৮ কোটি ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৩৩ কোটি টাকা। সবমিলে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাংকগুলোর পাওনা প্রায় ৮০০ কোটি টাকা।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহম্মদ শামস্-উল ইসলাম বলেন, অনেক গ্রাহক আছেন, যারা ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন না। তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের যত রকম উপায় আছে, ব্যাংকের তরফ থেকে তার সবই করা হচ্ছে। তবে কোনো গ্রাহকের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার তথ্য ব্যাংকের কাছে নেই।

ভোগ্যপণ্য আমদানিতে দ্রুত প্রসার ঘটে খাতুনগঞ্জের ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান মেসার্স ইয়াছির এন্টারপ্রাইজের। ২০০৯ সালের দিকে প্রতিষ্ঠানটি বড় পরিসরে ভোগ্যপণ্য আমদানি শুরু করে। ২০১২-১৩ সালে ভোগ্যপণ্য আমদানি করে বড় ধরনের লোকসানে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি। পরবর্তীতে ব্যাংকের দায় না মিটিয়েই ২০১৪ সালের শুরুর দিকে সপরিবারে কানাডা পাড়ি দেন প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ মোজাহের হোসেন। ইয়াছির গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইয়াছির এন্টারপ্রাইজ ও শাপলা ফ্লাওয়ার মিলসে বিভিন্ন ব্যাংকের প্রায় হাজার কোটি টাকা বকেয়া রেখেই বিদেশ পাড়ি দেন এ ব্যবসায়ী।

ব্যাংকগুলোর তথ্যমতে, ইয়াছির গ্রুপের কাছে এবি ব্যাংকের দুই শাখার পাওনা ১৩২ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ১২৮ কোটি, সিটি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ১০৩ কোটি, প্রাইম ব্যাংকের জুবলী শাখার ৯২ কোটি, ব্যাংক এশিয়া শেখ মুজিব রোড শাখার ৬৪ কোটি ও মার্কেন্টাইল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৩৬ কোটি টাকা। এছাড়া গ্রুপটির কাছে আইডিএলসির পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩১ কোটি ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের ২৯ কোটি টাকা। পাশাপাশি যমুনা, ন্যাশনাল ও রূপালী ব্যাংকেরও পাওনা রয়েছে ইয়াছির গ্রুপের কাছে।

২০০৯-১০ সালের দিকে ইস্পাত, শিপ ব্রেকিং ও আবাসন ব্যবসার নামে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন মিশম্যাক গ্রুপের কর্ণধার তিন ভাই হুমায়ুন কবির, মিজানুর রহমান শাহীন ও মুজিবুর রহমান মিলন। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেন।

ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ২০১২ সালের পর প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের শুরু করে ব্যাংকগুলো। ঠিক ওই সময় সপরিবারে বিদেশ চলে যান তিন ভাই। এদের মধ্যে মিজানুর রহমান শাহীন ও হুমায়ুন কবির বর্তমানে সপরিবারে কানাডায় অবস্থান করছেন। মুজিবুর রহমান মিলন থাকেন সিঙ্গাপুরে।

সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, ঋণের টাকা পাচার করে বিদেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন মিশম্যাক গ্রুপের কর্ণধাররা। নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়ে তারা দীর্ঘদিন ধরে উধাও। ব্যাংকও তাদের খুঁজে পাচ্ছে না।

জানা গেছে, আটটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠানসহ মিশম্যাক গ্রুপের নামে মার্কেন্টাইল ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ঋণ রয়েছে ৩০০ কোটি টাকা, অগ্রণী ব্যাংক লালদীঘি শাখার ২২৩ কোটি, সাউথইস্ট ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ১১৮ কোটি, ঢাকা ব্যাংকের দুই শাখার ১৩১ কোটি, ব্যাংক এশিয়া সিডিএ শাখার ১৫১ কোটি, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক লিমিটেডের ৮৫ কোটি, প্রিমিয়ার ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৫০ কোটি, ইস্টার্ন ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৪৮ কোটি ও এনসিসি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ২১ কোটি টাকা।

চার ব্যাংকের প্রায় ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ না করেই অস্ট্রেলিয়া পাড়ি জমিয়েছেন চট্টগ্রামের আরেক ব্যবসায়ী মাকসুদুল আলম। জানা গেছে, ম্যাফ ইন্টারন্যাশনালের এ স্বত্বাধিকারী ২০০৮-০৯ সালের দিকে ফল, বিটুমিন, কেমিক্যালসহ ভোগ্যপণ্য আমদানির ব্যবসা শুরু করেন। কয়েক বছর ব্যবসা করে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ নেন। কিন্তু ব্যাংকের পাওনা পরিশোধ না করেই ২০১৩ সালে গা ঢাকা দেন মাকসুদুল আলম। পরের বছর ২০১৪ সালে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় চলে যান। অস্ট্রেলিয়ায় এখন পেট্রল পাম্পের ব্যবসা করছেন বলে জানিয়েছে মাকসুদুল আলমের পারিবারিক ও ব্যাংক সূত্র।

জানতে চাইলে মাকসুদুল আলমের বাবা আব্দুস শুক্কুর বলেন, পাঁচ-ছয় বছর আগে আমাদের থেকে আলাদা হয়ে খুলশীতে নিজস্ব ফ্ল্যাটে ওঠে মাকসুদ। এরপর অস্ট্রেলিয়ায় চলে যায়। শুনেছি এখন অস্ট্রেলিয়ায় ব্যবসা করছে। স্ত্রী-সন্তানসহ অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর পর খুলশীর ৩ নম্বর রোডের এবিসি টাওয়ারের সি/৫ ফ্ল্যাটটিও বন্ধ রয়েছে।

ব্যাংক সূত্রগুলো বলছে, ম্যাফ ইন্টারন্যাশনালের কাছে এবি ব্যাংক খুলশী শাখার পাওনা রয়েছে ৮১ কোটি টাকা। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির কাছে পূবালী ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখার ঋণের পরিমাণ ৪৩ কোটি, সিটি ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ২২ কোটি, ব্র্যাক ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখার ১২ কোটি ও ইস্টার্ন ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ৭ কোটি টাকা।

সংসদে প্রকাশ করা শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকায় রয়েছে চট্টগ্রামের জাহিদ হোসেন মিয়ার প্রতিষ্ঠান জাহিদ এন্টারপ্রাইজ। প্রতিষ্ঠানটির কাছে বিভিন্ন ব্যাংকের বর্তমান পাওনা প্রায় ১৮৬ কোটি টাকা। বিভিন্ন ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী জাহিদ হোসেন গা ঢাকা দিয়েছেন। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও জাহিদের স্ত্রী মাহবুবা আক্তার জাহিদ এরই মধ্যে কানাডা চলে গেছেন বলে নিশ্চিত করেছে পাওনাদার ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

একাধিক ব্যাংকের ২০ কোটি টাকা পরিশোধ না করেই লন্ডনে পাড়ি দিয়েছেন এসএল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী লেয়াকত আলী চৌধুরী। অবশ্য প্রতিষ্ঠানটির অন্য স্বত্বাধিকারী সরওয়ার উদ্দিন চৌধুরী দেশে অবস্থান করছেন।

বিভিন্ন ব্যাংকের পক্ষে অর্থঋণ আদালতে মামলা পরিচালনা করছেন আইনজীবী আবুল হাসান শাহাবউদ্দিন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হলে তাকে বিদেশ যেতে আদালতের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু বেশির ভাগ ঋণখেলাপিই পালিয়ে দেশত্যাগ করে বিদেশে শান্তিতে বসবাস করছেন। বিদেশে অবস্থান করেই কোনো কোনো খেলাপি গ্রাহক ঋণ পুনঃতফসিল করে নিচ্ছেন।

ব্যবসায়ীদের ঋণ প্রদানে ব্যাংকগুলোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা খেলাপি হওয়ার অন্যতম কারণ বলে মন্তব্য করেন পূবালী ব্যাংক চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক (উত্তর) মঞ্জুরুল ইসলাম মজুমদার। তিনি বলেন, তবে কিছু ব্যবসায়ী সচেতনভাবেই ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করে ব্যাংকগুলোকে বিপদে ফেলেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এসব খেলাপির বিরুদ্ধে মামলা করছে। কিন্তু বিদেশে পালিয়ে যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ কঠিন হয়ে পড়ছে।