অবহেলিত সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা

১৪৭ বছর আগের কথা। আজকের আধুনিক নীলফামারীর সৈয়দপুর শহরের শুরুটা ছিল আসাম-বেঙ্গল রেলওয়েকে ঘিরে। সৈয়দপুর ছিল সাধারণ একটি গ্রাম। পলাশীর যুদ্ধে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হওয়ার পর ব্রিটিশরা এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সম্পদ আহরণের জন্য নির্মাণ করতে থাকে রেলপথ। আর সেই রেলপথগুলো পুরো ভারত উপমহাদেশকে একসঙ্গে বেঁধেছিল।

সেই সময়ে ইংরেজ বেনিয়ারা সৈয়দপুরে প্রতিষ্ঠা করে বিশাল রেলওয়ে কারখানা, যা আজো বাংলাদেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা হিসেবে পরিচিত। এই রেল কারখানাকে কেন্দ্র করেই আজকের আধুনিক শহর হিসেবে পরিচিতি লাভ করে সৈয়দপুর। শুধু তাই নয়, দেশের অষ্টম ব্যবসাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আর এজন্যই সৈয়দপুর শুধু বাণিজ্যিক শহরই নয়, রেলওয়ে শহর হিসেবেও খ্যাত।

১৮৭০ সালে আসাম-বেঙ্গল রেলপথকে ঘিরে তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার ১১০ একর জায়গার ওপর সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠা করে। এরপর ১৯০৩ সালে কারখানাটি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ও মালবাহী গাড়ি এবং স্টিম লোকোমোটিভ মেরামত কারখানায় রূপান্তরিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৫৩ সালের দিকে কারখানায় বিভিন্ন মেশিন শপ স্থাপন করে ব্রডগেজ ও মিটারগেজ যাত্রীবাহী গাড়ি মেরামত ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রাংশ উৎপাদনের সুবিধাসহ পূর্ণাঙ্গ কারখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সৈয়দপুর কারখানায় আছে ২১টি শপ (উপকারখানা)। কারখানাটি পশ্চিম রেলের ব্রডগেজ ও মিটারগেজ রেলপথের যাত্রীবাহী বগি (ক্যারেজ), মালবাহী বগি (ওয়াগন) এবং পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের স্টিম রিলিফ ক্রেনের সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ এবং আয়ুষ্কাল ঠিক রাখার পাশাপাশি কোচের গতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

রেলওয়েকে আলাদা মন্ত্রণালয় ঘোষণা করে বাংলাদেশ রেলওয়ে যখন ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়েতে সম্পৃক্ত হয়ে একটি যথার্থ পরিবহন মাধ্যম হিসেবে দেশ-বিদেশে সম্প্রসারিত হচ্ছে, সে সময় আমরা রেলওয়ের প্রাণ কারখানাগুলোকে আধুনিকায়ন না করে পশ্চাত্পদ করে রেখেছি।  ব্রডগেজ ও মিটারগেজ উভয় ধরনের কোচ ও ওয়াগন মেরামতে রেলের প্রধান ভরসা সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা। কারখানাটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও আধুনিকায়নের ফলপ্রসূ কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। বর্তমানে নানা সমস্যায় জর্জরিত হয়ে কারখানাটির কার্যক্ষমতা ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এর মধ্যে জনবল সংকট, পুরনো যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেলেও নতুন মেশিনপত্র কেনার উদ্যোগ গ্রহণ না করা, খুচরা যন্ত্রাংশের অভাব এবং সর্বোপরি অপর্যাপ্ত বাজেট উল্লেখযোগ্য।

লোকবল সংকট : 

১৯৯১ সালে রেলওয়ে রিকভারি প্রোগ্রামের আওতায় রেলওয়ের লোকবল ৫৮ হাজার থেকে ৩৫ হাজারে নামিয়ে আনা হয়েছে। এর ফলে কারখানার লোকবলের হিসাবও রাতারাতি বদলে যায়। বর্তমানে সৈয়দপুর রেল কারখানায় শ্রমিক সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। কারখানায় মঞ্জুরীকৃত ৫৬% শূন্যপদ থাকা সত্ত্বেও নতুন লোকবল নিয়োগের কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে না। ৩৭০ জন মঞ্জুরীকৃত খালাসি পদে বর্তমানে কর্মরত আছেন ৯৮ জন। শ্রমিকের অভাবে কাজের পরিধি কমে যাওয়ায় যে অল্পসংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী রয়েছে, তারাও অলস সময় পার করছে। ফলশ্রুতিতে রেল কারখানায় যেখানে প্রায় ১৪ লক্ষ টাকায় একটি বগি মেরামত করা যায়, তা বাইরের ঠিকাদার কোম্পানির কাছ থেকে প্রায় ২৯ লাখ টাকায় মেরামত করানো হচ্ছে। লোকবলের অভাবে কারখানার বার্ষিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হওয়াসহ যাত্রী ও মালামাল পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক যাত্রীবাহী কোচ ও ওয়াগন মেরামত করে সময়মতো সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।

অধিকাংশ কর্মকর্তাকর্মচারীর চাকরির বয়স শেষ পর্যায়ে

কারখানায় নিয়োজিত অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বয়স ৫০-এর উপরে চলে গেছে। এর মধ্যে কর্মকর্তাদের শতকরা ৭০ ভাগ, আর কর্মচারীদের প্রায় শতকরা ৮০ ভাগের বয়স ৫০-এর উপরে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে ১০০, ২০১৯ সালে ১৩০ এবং ২০২১ সালে ১৫০ জন অবসরে যাবে। এতে করে কারখানায় বিদ্যমান জনবল সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করবে। উল্লেখ্য, কারখানায় একজন দক্ষ কর্মী তৈরি হতে প্রায় ১০ বছর সময় লেগে যায়। সে হিসাবে দক্ষ কর্মীদের অবসরে যাওয়ার হিসাব করে পূর্বেই নতুন লোকবল নিয়োগ ও পুরনোদের তত্ত্বাবধানে কর্মদক্ষ করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে রেলওয়ের কার্যকারিতা বজায় রাখার জন্য অতিসত্বর লোকবল নিয়োগ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

আধুনিক যন্ত্রপাতির স্বল্পতা : 

যে কোনো কারখানার উৎপাদনশীলতা কর্মী ও মেশিনের ওপর নির্ভরশীল। মেশিন ঠিকমতো কাজ না করলে উৎপাদনশীলতায় গতি আনয়ন করা সম্ভব হয় না। ফলে কারখানা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়। সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় রয়েছে ৭৮৭টি বিভিন্ন ধরনের মেশিন। আর এসব মেশিনপত্রের বয়স ৫০ বছরের উপরে। ১৪০ বছরের পুরনো ক্যারেজ শপ, কালার শপ ও ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন মেশিন শপে এসব কোচ মেরামতের কাজ করা হচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক মেশিন নষ্ট হয়ে পড়ে রয়েছে। আধুনিক মেশিনপত্র না থাকায় শ্রমিকদের প্রতিমুহূর্তেই ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে।

অপর্যাপ্ত বাজেট : 

যেসব প্রতিবন্ধকতার কারণে কারখানার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয় না, তার মধ্যে বাজেট ঘাটতি অন্যতম। সৈয়দপুর রেল কারখানায় যাত্রীবাহী গাড়ি মেরামত কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনের অনুযায়ী বাজেট না পাওয়ায় মেরামত কার্যক্রমের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হচ্ছে না। এছাড়া বাজেটের স্বল্পতার কারণে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল তৈরি ও আমদানির কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন, মেরামত এবং সর্বোপরি রক্ষণাবেক্ষণের কাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

কারখানার মেশিনারিজ রক্ষণাবেক্ষণ সমস্যা:  

কারখানার প্রতিটি মেশিন ক্যারেজ ও ওয়াগনগুলোকে এলই, জিওএইচ এবং পিওএইচ করার কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ব্যবহূত হয়। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে এই মেশিনগুলো ব্যবহার করা হলেও প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে মেশিনগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। মেশিনগুলোর জন্য টুলস ও স্পেয়ার পার্টস কেনা সম্ভব হচ্ছে না। সঠিক সময়ে রক্ষণাবেক্ষণ না করার ফলে মেশিনগুলো কিছুদিন পর পর বিকল হয়ে পড়ে। এতে করে কারখানার কার্যক্রমের গতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

উৎপাদনশীলতায় কর্মীদের আর্থসামাজিক অবস্থার প্রভাব

কর্মীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সঙ্গে উৎপাদনশীলতার এক নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। কর্মীদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নতি হলে উৎপাদন বাড়ে। কর্মীদের কোয়ার্টারগুলো ব্রিটিশ আমলের। ফলে কোয়ার্টারগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির পানিতে ড্রেনের ময়লা মিলিত হয়ে পুরো কলোনি দূষিত করে তোলে। কর্মীদের কোয়ার্টারগুলো নির্দিষ্ট সময়ে মেরামত করা হয় না। এছাড়া কারখানায় কর্মরত কর্মীরা দীর্ঘদিন তাদের পদবির নাম পরিবর্তন করার কথা বললেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তা কর্ণপাত করছেন না। যেমন, খালাসির পরিবর্তে হেলপার, মিস্ত্রির পরিবর্তে টেকনিক্যাল সুপারভাইজার, এসএমের পরিবর্তে এসএম টেকনিক্যাল। এতে করে কর্মীদের কাজের গতিশীলতাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

পরিকল্পিত আধুনিকায়নের অভাব

সৈয়দপুর রেল কারখানা প্রতিষ্ঠার পর ১৪৬ বছর অতিবাহিত হলেও পরিকল্পিত উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। গত বছর ১৫৬ কোটি টাকায় ২৮টি শপের আধুনিকায়ন কাজ করা হয়। তিন মাস না যেতেই রেলওয়ের সর্ববৃহৎ সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা এখন আসমানি কবিতার রূপক দরিদ্র আসমানির আবাসস্থলে রূপ নিয়েছে। কারখানার অভ্যন্তরের শপগুলোর টিনের ছাদ ফুটো হয়ে পানি পড়ে। পানি পড়ে হাজার কোটি টাকার মেশিনপত্র নষ্ট ও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাণহানির হুমকিতে থেকে কাজ করতে হচ্ছে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় কারখানায় প্রায় ৪৫টির মতো নতুন মেশিন স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু লোকবল সংকটের কারণে মেশিনগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। যে মেশিন প্রতিদিন ব্যবহার করার কথা সেটি সপ্তাহে বা মাসে ব্যবহার করতে হচ্ছে। এছাড়া সৈয়দপুরের কারখানার পাশে পতিত জমিতে কোচ ও ওয়াগন তৈরির জন্য নতুন কারখানা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৯৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা। নতুন কারখানা হলে বছরে ৬০টি কোচ তৈরি করা যাবে। বছরে ৬০টি কোচ তৈরি করে রেলওয়ে কতটা লাভবান হতে পারবে এ নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ বছরে এত অল্পসংখ্যক কোচ তৈরি করা হলে উৎপাদন ব্যয় আমদানি ব্যয়ের চেয়ে বেশি হতে পারে।

আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কারখানাটি উন্নত করার উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে যাত্রীবাহী কোচ তৈরি করা কোনো ব্যাপারই ছিল না। যার প্রমাণ কারখানার শ্রমিকগণ দিয়েছেন। রেলওয়ের ২১১৬ নম্বর রেল কোচটি পুরোপুরি অকেজো হয়ে পড়ে। সে কারণে এটিকে ইয়ার্ডে ফেলে রাখা হয়। তবে কোচটির অনেক সরঞ্জাম ভালো দেখতে পেয়ে সচল করার কাজ শুরু করেন কারখানার শ্রমিকরা। মাত্র ৫০ কার্যদিবসে শ্রমিকরা কোচটিকে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক রেল কোচে রূপ দেয়। শুধু তাই নয়, পূর্বে কোচটিতে আসনবিন্যাসে সমস্যা থাকায় রেলপথে ভারসাম্যহীনভাবে চলাচল করেছে। এক অংশে চাপ (লোড) বেশি পড়ায় দ্রুত এর স্প্রিং বিকল হয়ে যেত। নতুন করে নির্মাণের সময় কোচটিতে এ সমস্যাগুলো সমাধান করা হয় এবং প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্য চারটি বিশেষ আসনের ব্যবস্থাসহ টয়লেট স্থাপন করা হয়।