আলোচনার জোয়ারে ভাসছে ডুবের জাহাজ 

২৭ অক্টোবর মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ রিলিজ পাবে- এ খবর চাউর ছিল। প্রথম শো’টাই দেখবো বলে ঠিক করে রেখেছিলাম। কারণ বাজারে আসার আগেই দেশ-বিদেশে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা তৈরি করে যে সিনেমা- সেটি আর যাই হোক পরিচিতদের আগে দেখতে না পারলে অন্যের মতামত মাথায় চাপ ফেলবে। যেমন ভাবনা তেমন কাজ- প্রথম শো’তেই হাজির হলাম।

চিত্রনাট্য নিয়ে আগাম ধারণা ছিল, পাত্র-পাত্রী কারা কোন ভূমিকায় থাকবেন সেটাও প্রায় মুখস্থ। কোন গল্প বলা হবে সেটাও জেনেছি প্রায়। এখন ক্যামেরার ফ্রেমে-সংলাপে সেটার বুননটা হলো কিভাবে, ঠাকুমা তার ঝুলি খুলবেন আমি আমার ‘কোয়ালিটি টাইম’-এ সেই গল্পটা শুনব ও দেখব কেবল।

তার আগে পরিচিত হই ‘ডুব’-এর সঙ্গে…
পরিচালক: মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
নাম ভূমিকায়: ইরফান খান (ভারত), রোকেয়া প্রাচী, নূসরাত ইমরোজ তিশা ও পার্ণো মিত্র (ভারত) প্রমুখ
রিলিজ তারিখ: ২৭ অক্টোবর, শুক্রবার

রেটিং: আলাপ শেষেডুব’কে ঘিরে গত এক বছর যে হইচইয়ের মধ্যে রেখেছিলেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, সেদিন (২৭ অক্টোবর সকাল) ঠিক ততোধিক হইচই করতে করতে গিয়েছিলাম সিনেমা হলে। শুরু হলো সিনেমা। কী দারুণ ঝকঝকে ছবি, শব্দ, পরিপাটি কস্টিউম। আহা…। সবচেয়ে বড় কথা, কী দারুণ নৈঃশব্দ্য। ঢাকায় হল্লাহাটির মধ্যে এ এক বড় পাওয়াই বটে!
শুরুতেই ইরফান খান (সিনেমায় জাভেদ হাসান) যখন পরিবার নিয়ে পাহাড়ে বেড়াতে যাচ্ছেন পর্দায় তার উপস্থিতি দেখে পুরো প্রেক্ষাগৃহে দর্শকদের নড়েচড়ে বসার আভাস অন্ধকারেও টের পেয়েছি। কিন্তু জাভেদ সাহেব যখন মুখ খুললেন? এ কী! অবাক হয়ে যেতে হয় বাংলা উচ্চারণ শুনে। ‘ননবেঙ্গলির’ মেপে মেপে বাংলা যেমন, ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশে রাজ করার সময় কাজের জন্য বাংলা শিখে যেভাবে ভেঙে ভেঙে বলতেন বাংলাটা- ঠিক তেমন লেগেছে কানে। খটকা চরমে। তার মানে আর যাই হোক- এ চরিত্র সত্যি সত্যি আমাদের চেনা হুমায়ুন আহমেদের নন। সিনেমা হলে ঢোকার আগেই সেটা নির্ধারণ করে রেখেছিলাম। হুমায়ুন আহমেদকে মাথায় ঢুকতেই দেবো না। দেখি কার ক্ষমতা কত। ফলে ইরফান যখন জাভেদের বেশে ননবেঙ্গলি টানে বাংলা শুরু করলেন- কানে কটু লাগলেও তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি।

 মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও ইরফান খান
এরপর ঘটনা পরম্পরায় শুরুতেই ১৯৯০ এর ফ্ল্যাশব্যাকে গিয়ে যখন জাভেদ হাসান চরিত্রটি (ইরফান খান) ১৭ বছর বয়সী মায়াকে (রোকেয়া প্রাচী) নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ এনে তার পিতা থানায় অভিযোগ করছেন- সেখানে জাভেদ হাসানের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে এই বলে, তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে সিনেমা-ডকুমেন্টারি বানান। এটা দর্শক হিসেবে দ্বিতীয় খটকা।

তার মানে ইরফান যে চরিত্রে অভিনয় করছেন তিনি অ-বাঙালি নন, বাঙালিও নন, সোজা বাংলাদেশি। যাহ! সিনেমার শুরুতেই এটি ছিল ভিত নড়ে যাওয়া বাস্তবতা। সিনেমায় এই ‘ছোটখাট’ অসঙ্গতি থাকবে- ছয় নম্বর ছবিতে এসে এসব বলার সুযোগ ফারুকীর ক্যারিয়ারে এখন আর নেই। অবাক করা বিষয় হলো, পুরো সিনেমাজুড়ে এ ধরনের অসঙ্গতি আছে যা নজর এড়াবে না। সমাজের তথাকথিত নিয়ম ভাঙবে নাকি টিকিয়ে রাখবে…

 ইরফান খান ও পার্ণো মিত্র
সিনেমায় যে বিষয়গুলো নিয়ে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী নিজের অবস্থান বোঝাতে পেরেছেন সেগুলো হলো-  এক. দ্বিতীয় বিয়েতে কেবল নারীর ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্স তৈরি হয়, দুই. এত বড় ছেলেমেয়ে রেখে প্রেম নিষিদ্ধ, তিন. মেয়ের ‘বান্ধবীর’ সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে করলেও বিবাহিত জীবনে হীনমন্যতা কেবল মেয়েটিরই তৈরি হয়। এই তৃতীয় পয়েন্টটি দেখাতে গিয়ে জাভেদের দ্বিতীয় স্ত্রী নীতুর (পার্ণো মিত্র) চরিত্রটিকে তিনি যেভাবে ডোবাতে ডোবাতে তলানিতে নামিয়েছেন সেটি সমাজের জন্য ক্ষতিকর। এসব সামাজিক টানাপড়েন পুনঃউৎপাদনের মধ্যদিয়ে মেয়েটির দোষই খোঁজার রাস্তা তৈরি করে দেওয়া হয় দর্শকদের মনে কিংবা সমাজে।

রোকেয়া প্রাচী, ইরফান খান, তিশা ও পার্নো মিত্র
সামাজিক টানাপড়েনের যেকোনও সম্পর্কে ‘মেয়েটির দোষ’ হিসেবে যে সামাজিক ট্যাগ লাগানোর প্রবণতা রয়েছে, সেটি শক্ত করতে কেবল রাস্তা দেখালে হবে না। পরিচালক যা দেখাতে চান সেটিই যেন দেখে- নিশ্চিত করতে হবে। এবার পরিচালক সেই মিশনেও সফলতা পান যখন কিনা দেখানো হয়, ৫২ বছর বয়সী জাভেদ কোনোভাবেই চাচ্ছেন না মেয়ের ‘বান্ধবী’ নীতুর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক স্থাপন করতে। অথচ নীতুর চরিত্র নানাভাবে তাকে গ্রাস করছে। রাতের আঁধারে জাভেদ হাসানের নয়নতারা ফিল্ম সিটির দেয়াল টপকে নীতু প্রবেশ করছে, নানা ছলচাতুরির আশ্রয় নিচ্ছে জাভেদ হাসানের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে। ‘দায়িত্বশীল পুরুষ’ জাভেদ তাকে ধমকে ‘কী চাও তুমি’- প্রশ্ন তুলে ঘর থেকে বের করে দেন।

এখানে এসে সিনেমায় দরকার হয় প্রথম স্ত্রীকে শক্তিশালী করে উপস্থাপন করা। যার সঙ্গে পরিবার, সন্তান, সমাজ, সংসার এমনকি চাকরও থাকে, দ্বিতীয়টির সঙ্গে নয়। ফারুকী এখানে দেখিয়ে ফেলেছেন, জাভেদের ভালো বউ মায়া যখন তার ‘বিবাহ পবিত্র সম্পর্ক’-এর প্রমাণ দিতে জীবনযুদ্ধে নেমে শিক্ষকতা শুরু করেন, তখন তাদের মেয়ে সাবেরির সঙ্গে জীবনের সব প্রতিযোগিতায় হেরে যাওয়া বলে উপস্থাপিত দ্বিতীয় স্ত্রী নীতু জাভেদকে বিয়ে করে জয়ের আনন্দে ভাসেন! চরিত্রের সঙ্গে সুবিচার করেন না পরিচালক, যখন কিনা ছলচাতুরি করে বাবার বয়সী পুরুষকে বিয়ে করা নীতু আগের মেমসাহেবের দেওয়া বাসার সব পর্দা সরিয়ে ফেলেন। আগের কেয়ারটেকার বিদায় করে দেন এবং সেই দাপুটে লোকটিকে লুকিয়ে এসে ভাত চেয়ে খেতে হয়। অন্যদিকে, কাতর জাভেদ দ্বিতীয় বিয়ে করলেও বারবারই ফিরে যেতে চান সন্তানদের কাছে, পারেন না। বারবার সন্তানের কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে তিনি ফিরে আসেন দ্বিতীয় স্ত্রী নীতুর কাছেই। তাকে প্রথমবারের মতো জড়িয়ে ধরার পরের দৃশ্যে জাভেদ মারা যান।

 তিশা ও ইরফান খান
প্রিয়জনদের কাছ থেকে মানুষ দূরে গেলে, প্রয়োজন ফুরালে সে মানুষটি মারা যায়- বলে পুরো সিনেমাতে যে থিম হাজির করতে চাইলেন পরিচালক, সেটি প্রমাণ করে দ্বিতীয় স্ত্রী পার্ণো প্রিয় মানুষ নন। যার মধ্য দিয়ে এই বিয়ে, দ্বিতীয় সংসারের কোনও সুখস্মৃতি না দেখানোর কারণ এতক্ষণে নিশ্চিত হওয়া যায়। আর পার্ণোর বুকে মারা যাওয়া ইরফান যখন আগের মৃত্যুর পর আত্মা হয়ে প্রথম স্ত্রীর আশেপাশে মমতা নিয়ে ঘোরে, দোষ স্বীকার করে- তখন বোঝা যায় বিবাহ সম্পর্ক নিয়ে দ্বৈত নীতির অবস্থানে দাঁড়িয়েছেন ফারুকী। তাই বৈধ-অবৈধর মাপকাঠিতে পরিবর্তন আনতে সাহস করেননি তিনি।

এই সিনেমা দেখলে কানে শান্তি হয়, চোখে আরাম হয়। বিশেষ করে চিরকুট-এর ‘আহারে জীবন’ আর একই ব্যান্ডের পাভেল অরিনের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক- সত্যিই স্বস্তি দিয়েছে। খুবই অল্প চরিত্র, চিৎকারের সংলাপ নেই, পরিমিত আবহসংগীত। বারবারই সিনেমাটোগ্রাফি আর শব্দ সম্ভার ভালো বলে কিছুটা স্বস্তি বাড়াতে চেয়েছেন দর্শকরা। কিন্তু এটাও সত্য, ২০১৭ সালে এসে এরচেয়ে নিম্নমানের সিনেমাটোগ্রাফি-আবহসংগীত আপনি দেখতে চাইবেন? এটাই তো হওয়ার কথা। ভারত-বাংলাদেশ মিলিয়ে ১২ কোটি টাকা খরচা করে ছবির এই ঝকঝকে আর টনটনে মান না হলে কিসের কী?
অতলে ডুব দেবো কিভাবে…

সিনেমায় বেশ কয়েকটি দৃশ্য অপরিপূর্ণ, অর্থের দিক দিয়ে। আছে চেয়ার, টেবিলসহ আসবাবপত্র। আমরা দর্শকরা কি তার সেই নিঃশব্দ ভাষা বুঝতে চেষ্টা করিনি? বারবার ব্যর্থ হয়েছি। হয়তো এদের দিয়ে হাহাকার বোঝাতে চাইলেন কিন্তু এই ‘হয়তো’ শব্দটা যতক্ষণ দূর হলো ততক্ষণে হাহাকারের দৃশ্য চোখের সামনে থেকে গায়েব!
ডুবের গল্প হ‌ুমায়ূনেরই, পরিচালক সেই বোধই দিতে চেয়েছেন…

শুরুতেই বলেছি, সিনেমায় হ‌ুমায়ূন আহমেদকে টানবো না বলে হলে প্রবেশ করেছিলাম। কিন্তু সে উপায় খোদ পরিচালকই রাখেননি। জাভেদ হাসান কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক- দেখানো হয়নি ঠিকই কিন্তু তাকে সবাই স্যার ডাকেন! মৃত্যুর পর হ‌ুমায়ূন আহমেদের দাফন নিয়ে যে সংকট তৈরি হতে হতে থেমে যায় সেটিও এখানে দেখানো হয়েছে। হ‌ুমায়ূনকন্যা শীলার সঙ্গে এক স্কুলে না পড়লেও দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের সঙ্গে যে সখ্যতা কাজের খাতিরে তৈরি হয়েছিল- তাও সবার চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনা। নিকট অতীত ফ্রেমবন্দি করা কঠিন কাজ, ইতিহাস রচনা করতে সময় দিতে হয়। সেই সামান্য সংযমটুকু দেখানো যেত।

বারবার সিনেমায় ইরফান খানের (জাভেদ হাসান) মেয়ে তিশার মুখ দিয়ে বলিয়ে নেওয়া- ‘এসব কেবল তার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না পেরে বউ হয়ে টেক্কা দেওয়ার জন্যই করা’, খুবই আপত্তিকর ছিল। এর কোনও ব্যাকগ্রাউন্ড সিনেমার গল্পে পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে বড় কথা আনন্দবাজারকে ফারুকীই জানান- ‘ডুব’ হ‌ুমায়ূনের জীবন থেকে নেওয়া। বিষয়টা হলো এখন তিনি স্বীকার না করলেও এই ধারণাই দিতে চেয়েছিলেন সিনেমার পরতে পরতে- সেটা স্পষ্ট। এমন ঘটনা আমাদের এই দেশে বহু মানুষের জীবনেই ঘটে, এর চেয়েও ‘মর্মান্তিক’ ঘটনা ঘটে তা বলেও এখন আর রক্ষা হবে না। আমার এই অবস্থানের পেছনে প্রশ্ন উঠবে, পরিচালক সেই বোধ দিতে চাইলেন, তা কিভাবে বুঝলেন?

পরিচালক ছবিটি বানিয়েছেন আমার জন্য, মানে দর্শকের জন্য। দর্শক যখন সেটিকে ‍হ‌ুমায়ূনের জীবন বলেই বুঝে নিচ্ছে অনিচ্ছা সত্ত্বেও তখন আমি বলবো, পরিচালক সেটিই বুঝাতে চেয়েছিলেন। পরিষ্কার? শুরুতে কথা দিয়েছিলাম রেটিং এই আলাপের শেষে দেব। শুক্রবার থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নেতিবাচক মন্তব্যগুলো দেখছিলাম। কেউ কেউ ক্ষীণস্বরে বলতে চেয়েছেন, সিনেমার এত বোদ্ধা। আমরা বোদ্ধা নই, তবে আমরা ছাড়া সিনেমাও নেই। আমরা দর্শক। আমরা মস্তিষ্ক নই, আমরা হৃৎপিণ্ড। এই সিনেমায় ক্যামেরার কিছু দৃশ্য আর শব্দ ছাড়া কোনও গল্প নেই। এ সিনেমায় ছাড়া ছাড়া কিছু দৃশ্য আছে যা আমাদের আগে দেখা, বাস্তবে।