বিশ্ব স্রেফ দর্শকের ভূমিকা নেবে না হুঁশিয়ারি রেক্স টিলারসন

চলমান সংঘাত ও দমন-পীড়নের কারণে প্রাণ বাঁচাতে নিজভূম ত্যাগ করে প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা। বর্মি সেনাবাহিনীর নিপীড়নের কারণে উত্তর রাখাইনে খাদ্যাভাব ও ভয়াবহ এক মানবিক সংকট দেখা দিয়েছে। রাখাইন প্রদেশে চলমান সংঘাত বন্ধের জন্য বর্মি সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন।

পাশাপাশি বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যাতে নিরাপদে ফিরতে পারে, সে ব্যাপারে উদ্যোগী হতেও মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের সঙ্গে এক ফোনালাপে এ আহ্বান জানান রেক্স টিলারসন।  আন্তর্জাতিক মহল ও জাতিসংঘের পক্ষ থেকে এ সংঘাত বন্ধের পাশাপাশি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে বারবার আহ্বান জানানো হলেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী বা নেপিদো কেউই এতে কর্ণপাত করছে না। এ অবস্থায় বৃহস্পতিবার টেলিফোনে বিষয়টি নিয়ে মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে আলোচনা করেন রেক্স টিলারসন।

মার্কিন পররাষ্ট্র বিভাগের মুখপাত্র হিদার নয়ার্ট এক বিবৃতিতে জানান, মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে ফোনালাপে রাখাইনে উদ্ভূত মানবিক সংকট ও রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান নৃশংসতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন রেক্স টিলারসন। হিদার নয়ার্ট বলেন, ‘রাখাইনে চলমান সহিংসতা বন্ধ এবং এ সংকটের কারণে বাস্তুচ্যুতদের,  বিশেষ করে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরিয়ে নিতে বার্মার (মিয়ানমারের পুরনো নাম) সরকারকে সহায়তা করার জন্য দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।’ রেক্স টিলারসন গত সপ্তাহেই মিয়ানমারের প্রতিবেশী দেশ ভারত সফর করেন। মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে ফোনালাপে রাখাইনের উদ্বাস্তুদের মধ্যে মানবিক সহায়তা বিতরণে বর্মি সেনাবাহিনীর সহায়তাও চেয়েছেন তিনি।

হিদার নয়ার্ট জানান, ‘মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একই সঙ্গে রাখাইনে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নিপীড়নের বিষয়ে জাতিসংঘের পূর্ণাঙ্গ, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও স্বাধীন তদন্ত কার্যক্রমে বর্মি সেনাবাহিনীর সহায়তাও চেয়েছেন। একই সঙ্গে এ বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিতেরও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।’ ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সোমবার দেয়া এক বিবৃতিতে বলা হয়, সহিংসতার সঙ্গে জড়িত মিয়ানমারের সেনা কর্মকর্তাদের কেন্দ্র করে বেশকিছু নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বর্মি নিরাপত্তা বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের সব ধরনের আমন্ত্রণ ও ভ্রমণ সুবিধাও বাতিল করতে যাচ্ছে দেশটি।

এরও আগে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সেনা নেতৃত্বকেই এ উদ্বাস্তু সংকটের জন্য দায়ী মনে করছে বলে বক্তব্য দিয়েছিলেন রেক্স টিলারসন। বক্তব্যটির মাধ্যমে এ বিষয়ে অং সান সু চির নেতৃত্বাধীন নেপিদোর বেসামরিক সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর পার্থক্যরেখা টেনে দিয়েছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। গত সপ্তাহে দেয়া আরেক বক্তব্যে মিয়ানমারের প্রতি এক হুঁশিয়ারি বার্তায় রেক্স টিলারসন বলেছিলেন, ‘রাখাইনে যে ধরনের নৃশংসতার বর্ণনা পাওয়া যাচ্ছে, তাতে গোটা বিশ্ব এক্ষেত্রে স্রেফ দর্শকের ভূমিকা নেবে না।’

অন্যদিকে বর্মি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতা চালানোর অসংখ্য অভিযোগ থাকলেও নিজ বাহিনীর পক্ষে সাফাই গেয়ে আসছিলেন মিন অং হ্লাইং। মঙ্গলবার নিজের ফেসবুক পেজে বর্মি সেনাপ্রধান লেখেন, ‘রাখাইনের পশ্চিমাঞ্চলে উগ্রপন্থী বাঙালিদের সন্ত্রাসী হামলাকে উপেক্ষা করে মিয়ানমার ও এর নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে যেসব একতরফা বিবৃতি ও অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার কোনোটিই সত্য নয়।’

প্রসঙ্গত, মিয়ানমারে গত কয়েক দশকের সামরিক শাসনামলে হঠাত্ করেই রোহিঙ্গাদের সে দেশের নাগরিকত্ব থেকে বঞ্চিত করা হয়। এর কারণ হিসেবে জনগোষ্ঠীটিকে অভিবাসী বাঙালি হিসেবে আখ্যা দেয়া শুরু করে বর্মি উর্দিধারীরা। যদিও কয়েক শতক ধরেই বংশানুক্রমে রোহিঙ্গাদের দেশটিতে বসবাসের নানা ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায়।

অন্যদিকে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কয়েক দশক ধরেই রোহিঙ্গাদের পদ্ধতিগতভাবে সব ধরনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে রাখা হয়েছে। জাতিসংঘের তদন্তে উঠে এসেছে, জনগোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে শিশু-বৃদ্ধ-নারী-পুরুষ নির্বিশেষে নিরস্ত্র জনগণের ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। এছাড়া ব্যাপক হারে যৌন নিপীড়ন চালানোরও অভিযোগ উঠেছে বর্মি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে।