ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণকেন্দ্রে ই-বর্জ্য!

বঙ্গবন্ধু ও মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের সংযোগস্থলে প্রতিদিনই বসে ই-বর্জ্যের বাজার। ব্যবহার অনুপযোগী ইলেকট্রিক সামগ্রীর এ বাজারে এসে প্রতিনিয়ত  প্রতারিত হচ্ছেন অসংখ্য ক্রেতা। ঘটছে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও।

কলেজছাত্র মুক্তাদির ৩৫০ টাকায় কিনেছেন রাউটার। বাসায় নিয়ে দেখেন ওটা বিকল। ফেরত দিতে এসে দোকানিকে খুঁজে পাচ্ছেন না। অনেক কষ্টে দোকানিকে শনাক্ত করেও বিপত্তি কাটেনি। তার কাছ থেকে কেনা হয়নি বলে সরাসরি অস্বীকার দোকানির। সরজমিনে দেখা গেছে, মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের রবিউদ্দিন ফটক থেকে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের এক নম্বর ফটক পর্যন্ত ফুটপাতে পসরা সাজিয়ে বসেন দোকানিরা। বঙ্গবন্ধু ও মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের সংযোগস্থলের দুই নম্বর ফটক সবচেয়ে জমজমাট।

ল্যাপটপ, আইফোন, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের অ্যান্ড্রয়েড ফোন, ব্লেন্ডার, ডিভিডি প্লেয়ার, ওয়াই-ফাই রাউটার, ফ্লাস্ক, কেতলি, মোবাইল ও ল্যাপটপের চার্জার, ঘড়ি, রেডিও, সাউন্ড সিস্টেম এমনকি প্রজেক্টরও মিলবে ই-বর্জ্যের এ হাটে, যার অধিকাংশই বিকল। কেনার আগে অনেক ক্রেতাই এসব পণ্য পরীক্ষা করে দেয়ার কথা বলেন। বিদ্যুত্সংযোগ বিচ্ছিন্ন জানিয়ে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দোকানিরা পরীক্ষা না করেই নানা পণ্য ধরিয়ে দিচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি প্রতারণা হচ্ছে মোবাইল বিক্রির ক্ষেত্রে। সচল মোবাইল দেখিয়ে চার্জ শেষ বলে ধরিয়ে দেয়া হচ্ছে একই রকম দেখতে বিকল মোবাইল। স্টেডিয়ামের ফুটপাত থেকে সস্তা মোবাইল কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা।

মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের পশ্চিম দিকের প্রাচীরঘেঁষা চৌকিতে ব্লেন্ডারের সারি। কোনো বক্স বা বিক্রয় রসিদ নেই— খোলা অবস্থায়ই বিক্রি হচ্ছে এগুলো। দেড় দশকের বেশি সময় ধরে স্টেডিয়াম ও আশপাশ এলাকার ফুটপাতে ব্লেন্ডার ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি করছেন মোহাম্মদ শহিদ। পটুয়াখালী থেকে এসে ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করা ৫০ বছর বয়সী ভদ্রলোক দাবি করলেন— ক্রেতাদের ঠকানোর জন্য এখানে বসিনি। বলেছেন, ‘রাজধানীর বেগম বাজার থেকে আমি এসব ব্লেন্ডার নিয়ে আসি। এখানে যে পণ্য আছে, তার শতভাগই সচল। কোনো বিকল পণ্য থাকলে আমরা তা মেরামত করে বিক্রি করি।’

২৫ বছর বয়সী মোহাম্মদ মোস্তফার পৈতৃক ভিটা মুন্সীগঞ্জে। পাঁচ বছর ধরে ফুটপাতে নানা ইলেকট্রিক পণ্য ও যন্ত্রাংশ বিক্রি করছেন বর্তমানে নারায়ণগঞ্জবাসী মোস্তফা। তার কথাতেই পরিষ্কার, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাতিল পণ্যই বিক্রি হচ্ছে এখানে, ‘বায়তুল মোকাররম ও স্টেডিয়াম মার্কেটে পুরনো ইলেকট্রিক পণ্য নিলামে তোলা হয়। নিলাম থেকে পণ্য কিনে আমরা ব্যবসায়ীরা মিলে কয়েক ভাগে তা বিক্রির জন্য নিয়ে নিই।’ যোগ করেন, ‘রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ভাঙ্গারির (লোহা-লক্কড় ও বাতিল আসবাব) দোকান থেকেও পিস হিসেবে নানা ইলেকট্রিক পণ্য কিনে আনি আমরা। ওখান থেকে কিছু পণ্য ভালো পাওয়া যায়। কিছু পণ্য মেরামত করে বিক্রির উপযোগী করতে হয়।’

সহজ কথায়, দেশের ক্রীড়াঙ্গনের প্রাণকেন্দ্রে যা বিক্রি হচ্ছে, তা ই-বর্জ্য। অভিযোগ আছে, স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এসব পণ্য বিক্রিতে মদদ আছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (এনএসসি) কর্মকর্তাদের। যদিও স্টেডিয়ামে দায়িত্বশীল সংস্থাটির কর্মকর্তারা তা অস্বীকার করেছেন।

বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম প্রশাসক মোবারক করিম লিটন গতকাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ফুটপাতে এসব ব্যবসায় মদদ দেয়ার প্রশ্নই আসে না। স্টেডিয়াম এবং আশপাশ এলাকার সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখা আমাদের দায়িত্ব। আমরা সবসময়ই সে চেষ্টা করি। এ কাজে আমদের কিছু প্রতিবন্ধকতাও মোকাবেলা করতে হয়।’ স্টেডিয়াম প্রশাসকের কথায়, ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা নেপথ্যে থেকে এসব ব্যবসা পরিচালনা করেন। ফলে চাইলেও আমরা সবসময় সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারি না।’

ই-বর্জ্যের হাট থেকে বেরিয়ে দুই নম্বর ফটক দিয়ে স্টেডিয়াম চত্বরে প্রবেশ করলে দেখা যায়, মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের বারান্দার বাইরে মোবাইল অ্যাকসেসরিজ দোকানের সারি। এখানে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলে বিকিকিনি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা মোবাইল অ্যাকসেসরিজের এক ব্যবসায়ী জানালেন, ‘আমার ব্যবসার আকার ছোট। তাই প্রতিদিন স্টেডিয়ামের দায়িত্বে থাকা (নিরাপত্তারক্ষী) ব্যক্তিদের দিতে হয় ২০ টাকা। এছাড়া প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের নামেও ২০ টাকা করে নিয়ে যায় নির্ধারিত ব্যক্তিরা। ব্যবসার আকার অনুযায়ী টাকা দিতে হয়।’

মওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের প্রশাসক মশিউর রহমান অবশ্য নিরাপত্তারক্ষীদের অর্থ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘স্টেডিয়ামের এলাকার তুলনায় নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা খুবই কম, মাত্র ছয়জন। কর্মব্যস্ততায় দিন কাটে তাদের। ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে টাকা আনতে যাওয়ার সময় কই তাদের?’ যোগ করেন, ‘মাঠকর্মী, সুইপার, নিরাপত্তারক্ষীসহ আমার ৩৬ জন স্টাফ। তাদের একত্র করে প্রায়ই উচ্ছেদ অভিযান চালাই। কিন্তু দুদিন পর আবার এসে বসে। এসব ব্যবসায়ীর নেপথ্যে কারা— এটা তো আপনারাও বোঝেন।’