মৌলভীবাজার বছরে দুই লাখ পর্যটকের ভ্রমণ স্থান

জেলা প্রশাসনের আনুমানিক হিসাবে দর্শনীয় স্থানগুলোতে প্রতিবছর বেড়াতে আসে প্রায় ২ লাখ দেশি-বিদেশি পর্যটক।

পর্যটনে অমিত সম্ভাবনাময় জেলা মৌলভীবাজার। সেখানে পর্যটনকে কেন্দ্র করে গত এক দশকে পাঁচতারা মানের গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ এবং দুসাই রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা নামের দুটি হোটেল ও শতাধিক ছোট বড় কটেজ তৈরি হয়েছে।

পর্যটক আকর্ষণের জন্য জেলায় যেসব দর্শনীয় স্থান রয়েছে এর মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হলো বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই), চা জাদুঘর, চা কন্যা ভাস্কর্য, সাতরঙা সুপেয় চা, ডিনস্টন সিমেট্রি, মাধবপুর লেক, ভাড়াউড়া লেক, রাজঘাট লেক, হরিণছড়া লেক, সাতগাঁও লেক, আগর-আতর, রাবার বাগান, খাসিয়া পানের বাগান, বাংলা পানের বরজ, শীতলপাটি, হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, বাইক্কা বিল, কাউয়াদিঘি হাওর, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, মাধবছড়া ও পাথারিয়া পাহাড়, জলপ্রপাতের মধ্যে—মাধবকুণ্ড, পরিকুণ্ড, হামহাম জলপ্রপাত, ফুল ঢালনী ঝেরঝেরি ও ইটাহরী ফুলবাগিচা জলপ্রপাত, ঐতিহাসিক দিঘিগুলোর মধ্যে—কমলা রানীর দিঘি (ঘরগাঁও, রাজনগর), কালীদিঘি বা বেগদালি দিঘি (ঘরগাঁও, রাজনগর), দেওয়ান দিঘি, (টেংরা, রাজনগর), জামাল খাঁর দিঘি (রাজনগর), খোঁজার দিঘি (গয়গড়, মোস্তফাপুর), রাজচন্দ্রের দিঘি (সাধুহাটি, মৌলভীবাজার), হিয়ালী দিঘি (সম্পাশী, মৌলভীবাজার), দত্তের দিঘি (মোস্তফাপুর, মৌলভীবাজার), নবাব দিঘি (পৃথিমপাশা, কুলাউড়া), বড়দা ঠাকুরের দিঘি (নাছনি, ব্রাহ্মণবাজার, কুলাউড়া), ছয়ছিরি দিঘি (রহিমপুর, কমলগঞ্জ), রাজদিঘি (পতনউষার, কমলগঞ্জ), কুলাউড়ার গগন টিলা, শ্রীমঙ্গলের ওফিং হিল, বড়লেখার মাধবছড়ার কেরোসিন টিলা, কুলাউড়া-জুড়ীর লাঠি টিলা, কমলগঞ্জের মোকাম টিলা, কালেঞ্জী খাসিয়া টিলা, গারো টিলা ও আদমপুর বনবীট টিলা।

জেলায় আছে ৯২টি চা বাগান। ১ লাখ ৫৫ হাজার ৩০০ একর জমির ৮৫ হাজার ১৪০ একরে গড়ে তোলা এই চা বাগানগুলোতে বার্ষিক প্রায় সাড়ে ৪ কোটি কেজি চা উৎপাদিত হয়। চা বাগানের নৈসর্গিক সৌন্দর্য, শ্রমিকদের পাতা তোলার কৌশল, কারখানায় চা উৎপাদন প্রক্রিয়া এ সব কিছুই যেন পর্যটককে মুগ্ধতায় ভরিয়ে দেয়। চা বাগানগুলো দেখে মনে হয় কোনো শিল্পী যেন সুনিপুণ হাতে মনের মাধুরী মিশিয়ে স্তরে স্তরে সবুজকে সাজিয়ে রেখেছেন, কখনো মনে হয় সাগর যেন সবুজ ঢেউ দিচ্ছে; আবার কখনো মনে হয় পাহাড়ের ঢালে সবুজ গালিচা বিছানো মাঠ। প্রতিটি চা বাগানে আছে দৃষ্টিনন্দন বাংলো।

তাদের আকৃষ্ট করতে রয়েছে সবুজে ছাওয়া উঁচু-নিচু টিলা, সবুজ বনানী, হরেক রকমের পাখপাখালি, চা বাগান, লেক, হাওর, ঘন জঙ্গল, খনিজ গ্যাসকূপ, আনারস, লেবু, পান, আগর, রাবার বাগান, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতি আর ঐতিহাসিক স্থানগুলো। পর্যটকদের আনাগোনায় সারা বছরই জেলার দোকানপাটগুলোতে কেনাকাটা ভালো হয়। বীরশ্রেষ্ঠ সিপাহি হামিদুর রহমানের স্মৃতিসৌধ রয়েছে এই জেলায়।

নৃগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে—খাসিয়া, গারো, সাঁওতাল, ওঁরাও, ভূঁইয়া, নায়েক, গড়, কাহার, গঞ্জু, অলমিক, পাসি, হাজরা, দোসাদ, ননিয়া, রবিদাস, পরাধান, বাউরি, পান, পবর, তেলেগো, ভূমিজ, ঘাসি, হাজং, বড়াইক, তাতি, লোহার, তুরি, মহালি, কিসান, নাগিসিয়া, রাজগন্দ, মালপাহাড়িয়া, খারওয়ার ও খবিয়া। ক্ষুদ্রজাতির মধ্যে রয়েছে নিজস্ব সংস্কৃতি, উৎসব ও ভাষা। মণিপুরি, খাসিয়া, সাঁওতাল, টিপরা ও গারো সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র জীবনাচার এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ জীবন ও সংস্কৃতি দেখলে ক্ষণিকের জন্য হলেও পর্যটকদের পাহাড়ি হয়ে প্রকৃতির সঙ্গে মিশে যেতে মন চাইবে।

মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আশরাফুর রহমান জানান, দিন দিন এ জেলায় পর্যটন ব্যবসার প্রসার ঘটছে। পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর্যটকের জন্য নতুন নতুন কটেজ, রিসোর্ট নির্মিত হচ্ছে। অনেকের কর্মসংস্থান হচ্ছে। হোটেল-রেস্টুরেন্টে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ছে। ছোট ছোট দোকান ও ফেরিওয়ালাদেরও আয়-রোজগার ভালো হচ্ছে। পর্যটনকে কেন্দ্র করে জেলায় টাকা-পয়সার লেনদেন অনেক বেড়েছে।

মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. শাহজালাল জানান, পর্যটনের জন্য খুবই আকর্ষণীয় স্থান হচ্ছে মৌলভীবাজার জেলা। আর দেশ-বিদেশের পর্যটকদের কাছে এর প্রচারও আছে। সারা বছরই হাজার হাজার পর্যটক দর্শনীয় স্থানগুলোতে আসে। পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য জেলা পুলিশ ছাড়াও পর্যটন স্পটগুলোয় পর্যটন পুলিশ রয়েছে।

বিদ্যমান পর্যটন স্পটের সংখ্যা, আবাসন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থার বিবেচনায় সারা দেশের মধ্যে মৌলভীবাজার জেলা নিঃসন্দেহে এক অনন্য অবস্থানে রয়েছে। যদিও চলতি বছরের অত্যধিক বৃষ্টি ও কয়েক দফা বন্যায় জেলার সব রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলো ত্বরিত গতিতে সংস্কার ও মেরামত করা হলে আসছে শীত মৌসুমে মৌলভীবাজার জেলায় পর্যটক আগমনে রেকর্ড সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র মো. ফজলুর রহমান।