কুর্দিস্তানের বিচ্ছিন্নতায় গড়ে উঠেছে আঞ্চলিক ঐক্য

ইরাক থেকে আধ-স্বায়ত্বশাসিত কুর্দিস্তান এলাকা বিচ্ছিন্ন করার জন্য গণভোট অনুষ্ঠানের মাত্র দু’দিন পর স্থানীয় সরকার ও প্রেসিডেন্ট মাসুদ বারজানির বিরুদ্ধে ব্যাপক আঞ্চলিক ঐক্য গড়ে উঠেছে।

এখন পর্যন্ত যেসব খবরাখবর আসছে তাতে বোঝা যায়, কুর্দিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টার জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে চরম মূল্য দিতে হবে। কুর্দি বিচ্ছিন্নতাকামী তৎপরতার কারণে আসন্ন বিপর্যয় রোধে একদিকে ইরাকের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মহল ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছে অন্যদিকে এ অঞ্চলের প্রতিবেশী দেশগুলোও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।

ইরাকের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন কুর্দিস্তানের বিচ্ছিন্নতা প্রশ্নে অনুষ্ঠিত গণভোটকে সেদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে বড় ধরণের হুমকি হিসেবে অভিহিত করে বলেছে এতে করে ইরাকের অখণ্ডতা বিনষ্ট হবে। এ ব্যাপারে গত ২৭ সেপ্টেম্বর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, তেলমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টার উপস্থিতিতে সংসদের ১৬০জনের বেশি সদস্য জরুরি বৈঠক করেন। তারা অবৈধভাবে গণভোটের অপরাধে স্বায়ত্বশাসিত কুর্দিস্তান এলাকার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার জন্য একটি আইন পাশ করেন। ওই আইনের একটি ধারায় কুর্দিস্তান স্বশাসন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাসুদ বারজানিসহ গণভোট আয়োজনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই আহ্বান থেকে দেশের অখণ্ডতা বজায় রাখার জন্য জাতীয় ঐকমত্যের প্রমাণ পাওয়া যায়।

ইরাকের সংসদে পাশ হওয়া আইনের আরেকটি ধারায় কুর্দিস্তানে যাওয়ার সমস্ত সড়ক বন্ধ করে দেয়া এবং সীমান্ত দিয়ে ওই এলাকায় যেকোনো পণ্য আমদানি করাকে চোরাকারবারি হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী কুর্দি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিচারিক ব্যবস্থা নেয়া ছাড়াও ওই অঞ্চলের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক চাপ সৃষ্টির ক্ষমতাও কেন্দ্রীয় সরকারকে দেয়া হবে। কুর্দিস্তান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়াটা সহজ হবে এ কারণে যে, ওই এলাকায় স্থল পথে পদক্ষেপ নেয়া যাবে। এ কারণে ইরানের সংসদ সদস্যরা কুর্দিস্তানের অর্থনীতিতে তেলের ভূমিকাকে বিবেচনায় এনে কিরকুকের তেল ক্ষেত্রগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রী হায়দার আল এবাদির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

ইরাক সরকার শুধু যে কুর্দিস্তান কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে স্থলপথে অর্থনৈতিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিকল্পনা নিয়েছে তাই নয় একই সঙ্গে দেশটির বিমান পরিবহন সংস্থাও ওই এলাকায় বিদেশি সমস্ত ফ্লাইট বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এ কারণে ইরান, লেবানন ও মিশর কুর্দিস্তান এলাকায় তাদের সমস্ত ফ্লাইট বাতিল করেছে। তুরস্ক ও আমিরাতও একই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। জর্দানও এ ব্যাপারে ইরাক সরকারকে সহযোগিতা করবে বলে জানিয়েছে। এর ফলে পর্যটন খাতেও কুর্দিস্তান মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং ওই এলাকাটি কার্যত একঘরে হয়ে পড়বে।

এ ছাড়া, কুর্দিস্তানে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত গণভোট নিয়ে আলাপ করতে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন ইরান ও ইরাকের সেনাপ্রধানরা। তেহরানে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই সেনাপ্রধান কুর্দিস্তানের গণভোট পরবর্তী পরিস্থিতির পাশাপাশি সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ এবং দ্বিপক্ষীয় সামরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেন। দুই সেনাপ্রধান বলেন, কুর্দিস্তানের গণভোট মেনে না নেয়ার ব্যাপারে তেহরান ও বাগদাদ অভিন্ন অবস্থান নিয়েছে।

যাইহোক, এসব ঘটনা থেকে কুর্দিস্তান কর্তৃপক্ষের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে এ অঞ্চলের দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। তবে কুর্দিস্তানের বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধে যেভাবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে তাতে মাসুদ বারজানি শেষ পর্যন্ত গণভোটের ফলাফল বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত থাকবেন বলেই অনেকে মনে করছেন।