আইসক্রিমের বায়না ধরায় লাশ হতে হল ছোট্ট রুহিকে

রাজধানীর কদমতলীর একটি টিনশেড বাড়ি থেকে সাড়ে ৪ বছর বয়সী এক শিশুর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ। তার নাম রুহি করিম। নির্মম এ হত্যাকান্ড ঘটেছে গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর কদমতলীর দক্ষিণ মাতুয়াইল এলাকায়। 

সাড়ে চার বছরের রুহি করিম বাবাকে ফোন করে বলেছিল, ‘আব্বু আমি স্কুল থেকে বাসায় এসেছি। নিচে খেলতে যাব। আম্মু যেতে দিচ্ছে না। তুমি আম্মুকে বলে দাও, আমাকে যেতে দিক।’ এটাই ছিল বাবা রেজাউল করিমের সঙ্গে রুহির শেষ কথা। ফোনটি রেখেই সে বাসা থেকে নিচে নেমে যায় খেলতে। এর এক ঘণ্টা পর বাসা থেকে প্রায় ১০০ গজ দূরে একটি পরিত্যক্ত টিনের ঘরের মধ্যে শিশুটির লাশ পাওয়া যায়। রুহিকে গলাটিপে হত্যার পর লুঙ্গি পেঁচিয়ে ঘরের জানালায় ঝুলিয়ে রাখা হয়।

তার বাবা রেজাউল করিম পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ছৈলাবুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা। রুহি পড়তো স্থানীয় একটি স্কুলের শিশু শ্রেণিতে। নিহতের মামা তৌফিকুর রহমান জানান, সকালে স্কুল থেকে বাসায় ফিরে নাস্তা খেয়ে মায়ের অনুমতি নিয়ে নিচে খেলতে যায় রুহি। কিছুক্ষণ পর প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খবর পেয়ে রুহির বাবা রেজাউল তাদের বাসার পাশেই ওই পুরনো টিনশেড বাড়িতে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে রুহিকে বাড়িটির জানালার সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান। পুলিশ ধারনা করছে হত্যার পর শিশুটির লাশ ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

নিহতের লাশ ময়না তদন্তের জন্য হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। পুলিশ এ ঘটনায় হত্যায় জড়িত সন্দেহে হাসিবুর রহমান হাসিব নামে এক কিশোরকে গ্রেফতার করেছে। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে রুহিকে হত্যার কথা স্বীকার করে হাসিব বলেছে, রুহিসহ একই এলাকার চার শিশু তার কাছে আইসক্রিম খেতে চায়। সে দিতে রাজি না হওয়ায় তিন শিশু চলে গেলেও রুহি আইসক্রিমের বায়না ধরেই থাকে। এ সময় সে ভাবে, রুহিকে টিনের ঘরে আটকে রেখে তার বাবার কাছে মুক্তিপণ হিসেবে কিছু টাকা আদায় করবে। এ ভাবনা থেকেই রুহিকে রাস্তা থেকে ওই টিনশেড বাড়ির মধ্যে নিয়ে যায়। সেখানে রুহি চিৎকার করলে গলাটিপে ধরে হাসিব। কিছুক্ষণ পরই শিশুটি মারা যায়। এরপর ঘরের মধ্যে নিয়ে একটি লুঙ্গি গলায় পেঁচিয়ে শিশুটিকে জানালায় ঝুলিয়ে রাখে সে।

কদমতলী থানার ওসি আবদুল জলিল সমকালকে বলেন, স্বজনরা শিশুটিকে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ওই পরিত্যক্ত টিনের ঘরে ঝুলন্ত অবস্থায় পায়। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে মাতুয়াইল শিশু মাতৃসদন হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ওসি বলেন, শিশুটিকে গলাটিপে হত্যার পর জানালার সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। লাশ উদ্ধারের ২০ মিনিট আগে ঘটনাস্থলের পাশে শিশুটির সঙ্গে হাসিবকে দেখেছিল এলাকাবাসী। সে হিসেবে সন্দেহভাজন হাসিবকে দুপুরেই আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে সে রুহিকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে। রাতেই তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা হয়। ওই মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তার গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বাদিহরিণী এলাকায়। নিহত রুহি তার দুঃসম্পর্কে ভাতিজি ছিল। তার ও রুহিদের গ্রামের বাড়ি একই এলাকায়। ওসি বলেন, হাসিব মাদকাসক্ত। সে গ্রামের বাড়িতেই থাকে। তবে প্রায়ই দক্ষিণ মাতুয়াইলে তার মামা মেহেদীর বাসায় বেড়াতে আসে। এবার গত বুধবারে বেড়াতে এসেছে সে। রুহিরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকে ওই বাড়ির নিচতলায় থাকে হাসিবের মামা মেহেদী।

শিশুটির বাবা রেজাউল করিম বলেন, জানামতে তার কোনো শত্রু নেই। হাসিব বা হাসিবের কোনো স্বজনের সঙ্গে তার শত্রুতা নেই। হাসিবের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন তিনি। দক্ষিণ মাতুয়াইলের ৩ নম্বর গলির পাঁচতলা একটি বাড়ির তৃতীয় তলায় দুই মেয়ে ও স্ত্রী সানজিদা পারভীনকে নিয়ে ভাড়া থাকেন রেজাউল। ছোট ছেলের বয়স ১ বছর ৪ মাস। রেজাউল জানান, তিনি মাতুয়াইল হাসপাতালের ক্যান্টিন ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত। হাসপাতাল থেকে তার বাসার হাঁটাপথে দূরত্ব তিন মিনিটের মতো।

রেজাউল করিম জানান, রুহি মাতুয়াইলের আইসিএম স্কুলে প্লে গ্রুপের ছাত্রী। গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সে স্কুল থেকে বাসায় ফেরে। স্কুলের পোশাক পরিবর্তনের পর সে নিজেই বাবাকে ফোন দিয়ে নিচে খেলতে যাওয়ার কথা বলে। ওই বাড়ির নিচে কয়েকটি শিশুর সঙ্গে সে নিয়মিত খেলত। মা সানজিদাকে না জানিয়ে দুপুর ১২টার দিকে নিচে খেলতে চলে যায় সে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সানজিদা তাকে (রেজাউল) ফোনে জানান, মেয়েকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সানজিদা বাসা থেকে নিচে নেমে প্রতিবেশীদের সহায়তায় আশপাশে খোঁজাখুঁজি করেন। তখন এক নারী প্রতিবেশী জানান, হাসিব নামে এক যুবকের সঙ্গে টিনশেডের পাশে পানি দেখছিল রুহি।

সেখানে ৯টি টিনের ঘর। কয়েক মাস ধরে ওই ঘর ও আশপাশ জলাবদ্ধ থাকায় ৭টি ঘরের ভাড়াটে চলে যায়। দুটি ঘরে ভাড়াটে থাকে। এর মধ্যে একটি ঘর হোটেল কর্মচারীদের মেস। সন্দেহ হওয়ায় দুপুর ১টার দিকে টিনশেডের একটি ঘরে খোলা দরজা দিয়ে এক নারী প্রতিবেশী ঢোকেন। এরই মধ্যে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছান রেজাউল। ঘরের জানালার সঙ্গে শিশুটি গলায় লুঙ্গি পেঁচানো অবস্থায় ঝুলছিল। মেয়েকে সেখান থেকে নামিয়ে মাতুয়াইল হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ছোট্ট মেয়েটিকে হারিয়ে কাম্নায় ভেঙে পড়েন মা-বাবাসহ স্বজনরা। ফুটফুটে শিশুটির চলে যাওয়া যেন কেউ মানতে পারছেন না। আর্তনাদ করতে থাকেন সবাই। পুরো হাসপাতালে নেমে আসে শোকের ছায়া।

খবর পেয়ে পুলিশ হাসপাতাল থেকে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদেন্তর জন্য স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠায়। হত্যার আগে শিশুটি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল কি-না তা পরীক্ষা করেন চিকিৎসক। মাতুয়াইল হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ও মেয়েটির চাচা ডা. মাম্নান সমকালকে বলেন, প্রাথমিকভাবে যৌন নিপীড়নের আলামত পাওয়া যায়নি।