মনোয়ারের অকাল মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে বৃদ্ধা মা

আফ্রিকার মালিতে শান্তি রক্ষার কাজে গিয়ে সন্ত্রাসীদের পুতে রাখা আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইজ) বিস্ফোরণে নিহত সৈনিক মো. মনোয়ার হোসেনের (৩০) বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। প্রিয়জনকে হারিয়ে দিশেহারা তার পরিবারের সদস্যরা। তাদের আহাজারিতে মনোয়ারের বরিশাল নগরীর জিয়া সড়ক এলাকার বাড়িতে নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির অকাল মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছে তার দুই নাবালক মেয়েসহ স্ত্রী এবং বৃদ্ধা মা। কোন সান্ত্বনা তাদের আশ্বস্ত করতে পারছেনা। কাঁদতে কাঁদতে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন মনোয়ারের মা রওশন আরা। বাকরুদ্ধ তার স্ত্রী ইভা আক্তার। অঝোর ধারায় কাঁদতে দেখা যায় মনোয়ারের ৭ বছর বয়সী কন্যা নুশরাতকে। কিছু না বুঝলেও অন্যদের আহাজারি দেখে কাঁদছে মনোয়ারের দেড় বছর বয়সী কন্যা তাসমিনও। এখন দ্রুত সময়ের মধ্যে মনোয়ারের লাশটি ফেরত পাওয়া এবং তার বিধবা স্ত্রী, দুই এতিম সন্তান এবং সন্তানহারা মায়ের দায়িত্ব সরকারকে নেয়ার দাবি জানিয়েছেন নিকটাত্মীয়রা। রোববার সন্ত্রাসীদের পুতে রাখা শক্তিশালী বোমার আঘাতে প্রাণ হারায় ৩ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী। একই ঘটনায় আহত হয়েছেন আরো চারজন।

মনোয়ারের মূল বাড়ি বরিশাল সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন গ্রামে। পরিবার-পরিজন নিয়ে তিনি বরিশাল নগরীর জিয়া সড়ক এলাকার বাড়িতে থাকতেন। ওই বাড়িতে জড়ো হওয়া আত্মীয়-স্বজনরা জানালেন, তিন ভাই-বোনের মধ্যে মনোয়ার ছিলেন সবার বড়। ছোট ভাই রবিউল ইসলাম পুলিশে চাকরি করেন। এক বোন স্বামীর সঙ্গে থাকেন ঢাকায়।

স্বজনরা আরও জানান, চলতি বছরের মে মাসের শেষ দিকে মিশনের উদ্দেশে দেশ ছাড়েন মনোয়ার। এরও দিন কয়েক আগে বাড়ির সবার কাছ থেকে বিদায় নেন তিনি। তার মা রওশন আরা চাননি, মনোয়ার মিশনে যান। তবু দুই মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি মিশনে যান।

২০০৩ সালে সেনা বাহিনীর সৈনিক পদে চাকরি নেয় তিনি। ২০০৮ সালে একই এলাকার মো. কবির হাওলাদারের মেয়ে ইভা আক্তারকে বিয়ে করে মনোয়ার। তাদের দাম্পত্য জীবনে দুই মেয়ে নুসরাত জাহান ইলমুন (৭) এবং তাসমিন (দেড় বছর)। ছোট ভাই রবিউল ইসলাম সদ্য পুলিশ কনস্টেবলে চাকরি পেয়ে প্রশিক্ষণরত রয়েছে। একমাত্র বোন জোহরা বেগম গৃহিনী। চাকরি নেয়ার পর ১০ বছর আগে নগরীর ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের চহুতপুর এলাকায় এক খণ্ড জমি কিনে টিনের ঘর তৈরি করে সেখানে পরিবার-পরিজন রেখে যশোর ক্যান্টনমেন্টে সৈনিক পদে কর্মরত ছিলেন আনোয়ার। বাবা না থাকায় বৃদ্ধা মাকেও নিজের বাসায় এনে রাখেন তিনি। এরই মধ্যে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী মিশনে যাওয়ার সুযোগ জোটে তার কপালে।

গত ৩০ মে (২ রমজান) জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী মিশনে যায় মনোয়ার। তারা জানতে পারেন, রোববার বাংলাদেশ সময় দুপুর ১টার দিকে মালিতে টহল কার্যক্রম শেষে ক্যাম্পে ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের শক্তিশালী হামলার শিকার হন শান্তিরক্ষীরা। তারা সফলতার সহিত সন্ত্রাসী হামলা প্রতিরোধ করেন। কিন্তু একপর্যায়ে সন্ত্রাসীদের পুতে রাখা আইইডি বিস্ফোরণে ৩ বাংলাদেশি সৈনিক নিহত এবং এক মেজরসহ ৪জন আহত হন। মনোয়ার নিহত হওয়ার খবর নিকটাত্মীয়রা প্রথমে স্ত্রী এবং তার মায়ের কাছে চেপে গেলেও নানা পারিপার্শ্বিকতায় তারা বুঝে গেছেন তাদের মনোয়ার আর নেই।