সালমান শাহ’র ৪৬ তম জন্মদিনে মা নীলা চৌধুরীর স্মৃতিচারণ

বাংলা চলচ্চিত্রের প্রিয় মুখ সালমান শাহ। আজ তার ৪৬ তম জন্মদিন। বিশেষ এই দিনে প্রয়াত এই নায়কের স্মৃতিচারণ করেন তার মা নীলা চৌধুরী। বর্তমানে খুব বেশি ভালো নেই তিনি। শরীরটা একটু খারাপ। জানান ছেলের স্মৃতি নিয়েই তো বেঁচে আছেন তিনি।

মায়ের কাছে সন্তানের সব কিছুই অমলিন। তাই জন্মদিনে সালমান শাহ’র সব স্মৃতিই যেন ঘিরে ফেলে তাকে। ছেলের জন্মদিনে তিনি ছিলেন আবেগে আপ্লুত। নীলা চৌধুরী জানান সব চেয়ে বেশি যে স্মৃতি বেশি মনে পড়ছে তা হলো সালমান শাহ’র জন্মের সেই দিনের স্মৃতি…

“জন্মের পর প্রথম যখন দেখেছিলাম ফর্সা মুখমণ্ডল, মাথা ভরা চুল। ও তখন কাঁদছিলো। আমার কোলে দেয়ার সাথে সাথেই ওর কান্না থেমে গেলো। আমিও আমার কষ্ট ভুলে গেলাম, সেটাই বেশি মনে পড়ছে। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস, আবার আমার সামনেই সে চলে গেলো।”

নীলা চৌধুরী বলেন- “বেঁচে থাকতে খুব জাঁকজমক ভাবেই তার জন্মদিন পালন করা হতো। প্রথম জন্মদিন থেকে শুরু করে আমরা খুব ধুমধাম ভাবে আয়োজন করতাম। আমার ছোট ছেলে শাহরান হওয়ার পরে দু’জনের জন্মদিন একদিনে পালন করতাম। দু’জনের জন্মদিনের দিন দু’জনের একসাথে জন্মদিন পালন করতাম। মানে এক বছরে তাদের দুটো জন্মদিন পালন করা হতো। ১২:০১ মিনিট থেকে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হতো। প্রথম জন্মদিন পালন করা হয়েছিলো সিলেটে আমার আব্বার বাসায়। আব্বা কিন্তু জন্মদিনে কেক কাটতে দিতেন না। কিন্তু ওরটাতে কোন আপত্তি করেননি। ঘর ভর্তি আত্মীয়-স্বজন, মেহমান সবাই ইমনকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলো।”

জন্মদিনে প্রত্যেক সন্তানেরই বাবা মায়ের কাছে কিছু না কিছু আবদার থাকে। সালমানের কখনো এমন কোন বিশেষ বায়না থাকতো না জানতে গিয়ে নীলা চৌধুরী বলেন- “ঈদের দিন যেমন আমরা সবকিছু নতুন পরি। জন্মদিনের দিনও তার জন্য সবকিছু নতুন করে কেনা হতো। শুধু তাই না চুল কাঁটা, নখ কাঁটা থেকে শুরু করে সবকিছুই করা হতো। সে চাওয়ার আগেই আমরা সবকিছু হাজির করে দিতাম। আমাদের কাছ থেকে পাওয়া উপহারেই সে খুশি থাকতো। বাড়তি কোন বায়না করতো না। ১৬তম জন্মদিনে জন্মদিনে সালমান সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছিলো।

ঢাকায় আমার গ্রীনরোডের বাসার ছাদে আয়োজন করা হয়েছিলো। তখনকার দিনে দেড় লাখ টাকা খরচ হয়েছিলো। একদম বিয়েতে যেমন আয়োজন করা হয় সেভাবেই জন্মদিনের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছিলো। গরু জবাই করে কাবাব করা হয়েছিলো, ৬টা খাসি জবাই করে কাচ্চি করা হয়েছিলো। ইমন তখন ভীষণ খুশি হয়েছিলো। ওর ১৬ বছর, মানে সে বড় হলো। আমি তাদের দুই ভাইকে একই ধরণের সাদা শেরওয়ানী কিনে দিয়েছিলাম। তখনই প্রথম শেরওয়ানী পড়েছিলো, আর কিন্তু পড়ে নাই। ওর বাবা বলেছিলো, শেরওয়ানী তো বিয়ের দিন পরবে তুমি আজকে দিচ্ছো কেন? আমি বলেছিলাম, বিয়ের সময় মেয়ের বাড়ি থেকে শেরওয়ানী আসবে আমার ছেলে সেটা পরবে। আজকে ওর বয়স ১৬ হলো মানে সে বড় হচ্ছে, আমার ছেলেকে আমিই শেরওয়ানী পড়ালাম।”

অনেকেই হয়তো জানেন না যে সালমান শাহ তার বিয়েতে শ্বশুর বাড়ির শেরওয়ানী পড়েননি। সেসম্পর্কে বলতে গিয়ে তার মা জানান- “দেখুন আল্লাহ্‌র কি কুদরত। বিয়েতে তো সে শেরওয়ানী পরে নাই। কোর্টে বিয়ে করলো। তারপর যেদিন শ্বশুরবাড়ি গেলো স্যুট পরলো। খুব মনে পড়ছে এগুলো।”

মৃত্যুর পরও সালমানের পরিবার তার জন্মদিন পালন করে যাচ্ছেন। নীলা চৌধুরী জানান- “পরিবার থেকে সবসময় করা হয়, কিন্তু আমরা এগুলো ফোকাস করি না। বাইরে যেখানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় আমরা সেখানে উপস্থিত হই। কবর জিয়ারত করা হয়। আমরা মনে করি না সালমান মরে গেছে, সে আমাদের মাঝেই আছে। বিজয়ের প্রথম প্রহরে আমি তাকে পেয়েছি। আমার কাছে প্রথম বিজয়টা সেই ছিলো।” তিনি জানান সালমান শাহ’র জন্মের দিনটা কেমন ছিল। সেদিনের কথা মনে করে তিনি বলেন- “সেদিন সিলেটে খুব সুন্দর দিন ছিলো। সন্ধ্যা থেকে আমি অসুস্থ ছিলাম। সকাল ৭টার দিকে ওর জন্ম হলো। ১১ পাউন্ডের মোটাসোটা বাচ্চা। সুন্দর একটি দিনে সুন্দর একটি উপহার পেয়েছিলাম। আমার মা মারা গিয়েছে ১৯৬৬ সালে। সেদিন থেকে আমাদের বাড়িতে একটা দুঃখ বোধ ছিলো। ইমন আমাদের ঘর আলো করে এসেছিলো।

সালমানকে কোনদিন আমি কোন বিষয়ে না করিনি। যার কারণে সামিরাকে আমি মেনে নিয়েছিলাম। আর এটাই আমার বড় ভুল। একটা কথা না বললেই নয়, ঢাকার নারিন্দার পীর সাহেব আজকে তিনি নেই। চাষাডার আর একজন পীর সাহেব তারা বলেছিলেন, বিয়ে হলে সালমানের জন্য খুব ক্ষতিকারক হবে। উনি ইমনকে বলেছিলেন, শুক্রবারে মেয়েটা চলে আসবে, কিন্তু তোমার জন্য ক্ষতিকারক হবে। সে কিচ্ছু বলেনি চুপ করে ছিলো। সত্যি সত্যি কিন্তু সামিরা শুক্রবার রাতে চলে এসেছিলো। আমি এগুলো মানি না, কিন্তু কাকতালীয় ভাবে ঘটনা মিলে গেলো। আর এটাই আমার বাচ্চার জীবনে ক্ষতি করে গেলো। শুধু তার না আমাদের পরিবারের সবার ক্ষতি হলো। এই ক্ষতি অপূরণীয়। আমার সাথে তার শেষ জন্মদিন যেটা হয়েছিলো সেটা ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির পরে। আমি সালমানকে ৫টা পোশাক উপহার দিয়েছিলাম। সেদিন সামিরার মা রুমেই ছিলো। সালমান সামিরার মায়ের সামনেই কাপড়গুলো চেঞ্জ করতে থাকে। আমি বলেছিলাম, কি করিস তোর শাশুড়ির সামনেই কাপড় চেঞ্জ করছিস কেন? সালমান উত্তর দেয়, শাশুড়ি সামনে দাঁড়িয়ে আছে কেন? সে এমন পাগলামি করেছে। এরপর আমার বাসায় আর জন্মদিন সেভাবে হয়নি।”

জন্মদিনকে কেন্দ্র করে সামিরার সাথে সালমানের কোন ঘটনা আছে কিনা সেসম্পর্কে নীলা চৌধুরী জানান- “ ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির শুটিং তখন শেষ পর্যায়ে। একটি জন্মদিনে সারাদিন বাসায় লোকজন আসছে। কাচ্চি বিরিয়ানি করা হয়েছে। মৌসুমী আসছে, সঙ্গে মা-বাবা ছিলো। মিডিয়ার অনেকেই এসেছে। সন্ধ্যা ৭টার দিকে ইমন গান গাইছিলো। তখন একটা ফোন আসলো, ফোনটা ছিলো সামিরার। ইমন ফোনটা ধরলো। ফোনের ওপাশ থেকে সামিরা উইশ করার পর ইমন বলছে, বার্থডে তো হয়ে গেছে রাত ১২:০১ মিনিটে। সারাদিন থেকে বার্থডে হয়ে এখনতো বার্থডে শেষ হয়ে গেলো। তখন সামিরা বলে, ‘আচ্ছা ঠিক আছে আমি রাখি সাথে বন্ধুরা আছে।’ তোমরাই বলো কোন প্রেমের সম্পর্ক কি এরকম হয়? প্রেমিকের জন্মদিনে উপস্থিত না থেকে কেউ বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়? এটা কেমন ভালোবাসা?”

সালমান শাহ’র নামটি দেয়া নিয়ে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল। সালমানের জন্মদিনে সেই বিতর্কের একটি সচ্ছ রূপ তুলে ধরেন তার মা নীলা চৌধুরী।

“সালমানের জন্মদিনে একটা কথা পরিষ্কার করে দিতে চাই, সালমান শাহ নামটা আমারই দেয়া। তার পোশাক-পরিচ্ছদ, ফ্যাশন সবকিছু আমি ঠিক করে দিতাম। তোমরাই বলো নীলা চৌধুরী একটি প্রতিষ্ঠান। আমি আর একটি প্রতিষ্ঠান উপহার দিয়েছিলাম। আমার ছেলে একটি প্রতিষ্ঠানই ছিলো।

ভক্তদের জানিয়ে দিয়ো পরিচালক সোহানুর রহমান সোহান যখন কথা বলেন সালমান শাহর জননীকে তুই তোকারি করে এটা কেন? এসব তো কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এটা কি ঠিক? মৌসুমীর নাম ছিলো শারমিন। সে শারমিন নাম বদলে মৌসুমী দিয়েছিলো। তেমনই ইমনের নাম বলেছিলো সালমান খান রাখতে। তখনই আমি বলেছিলাম, ওর নামের সাথে তো সালমান আছে তুমি চৌধুরী লাগাও। সোহান বলেছিলো, না চৌধুরী হলে গ্ল্যামারাস হবে না। আমি বলেছিলাম, তাহলে আমাকে একটু চিন্তা করতে দাও। পরে আমি বললাম এক কাজ করো, সালমানের সাথে শাহরিয়ারের শাহ লাগাও। এভাবেই সালমান শাহ নামটা আসে। এটার মানে এই হলো না যে, সোহান আবিষ্কার করে দিয়েছেন। তাহলে জন্মের বৃত্তান্তটা কি ভুল? সোহান যে ক্রেডিট নিতে চান সেটা কেন? মায়ের কথা কি ভুল? সালমানের সবকিছুই নিজস্ব ছিলো। এখানে সোহানের পরিচালনার কোন কৃতিত্ব নেই। সবকিছু সালমানেরই কৃতিত্ব।

একজন সম্রাটের দুই ছেলের নাম ছিলো শাহরান ও শাহরিয়ার। তাদের নামেই আমি আমার ছেলেদের নাম রেখেছি। সালমান রাখার পরেই অনেকে বলেছিলো নামটা কেমন গ্রাম্য গ্রাম্য হয়ে গেলো।

আরেকটা জিনিস ভুল করা হয়, উইকিপিডিয়ায় সামিরা ইচ্ছা করে ভুল ইনফরমেশন দিয়েছে। সেখানে উল্লেখ আছে সালমানের জন্মস্থান জকিগঞ্জ। একটা মানুষের প্রোফাইল চেঞ্জ করলে পুরোটা চেঞ্জ হয়ে যায়। জকিগঞ্জ একটা গ্রাম। ওখানে তো সালমান কোনদিন যায়নি। তার বাবাও সেখানে যায়নি। জকিগঞ্জ তার দাদার জন্মস্থান। সালমানের নানার বাড়ি দারিয়াপাড়া সালমান শাহ ভবন। ওর জন্মস্থান এটা। বাড়িটি আমার মায়ের নামে ছিলো ‘হায়াতুন্নাহার’। তার মৃত্যুর পর এটাকে ‘সালমান শাহ ভবন’ করা হয়েছে। অথচ সালমানের জন্মস্থানকে ক্রিটিসাইজ করে লেখা হয় সে জকিগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেছে। যারা উপস্থাপনা করে তাদের উচিত একটা মানুষ সম্পর্কে জেনে নেয়া। না জেনে জোর করে বসিয়ে দেয়া যায় নাকি? আমরাতো এগুলোর উপরে মামলা করতে পারি। শুধুমাত্র সালমান শাহর স্বার্থে আমরা কিছু করি না।”

সালমান ভক্তদের উদ্দেশ্যে নীলা চৌধুরী বলেন- “দেশবাসি ও ভক্তদের উদ্দেশ্যে বলবো, শুধু সালমানকে না, একটা ইন্ডাস্ট্রিকে মেরে ফেলা হয়েছে। এর বিচার যেন খুব দ্রুত করা হয়। আমি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, তার কাছে সাহায্য চাইছি। তিনি যেন খেয়াল করেন, অতি সত্ত্বর এই মামলার যেন নিষ্পত্তি হয়। কোন মা মিথ্যা বলে না, আমিও বলি না। আপনারা সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন।”