মিয়ানমার সেনাদের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করতে হবেঃ এইচআরডব্লিউ

রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ‘জাতিগত নিধন’ রুখতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর কঠোর অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)। একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমারের শাস্তি নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।

এইচআরডব্লিউ’র ওয়েবসাইটে গতরাতে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ এবং রোহিঙ্গা ইস্যুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উচিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর ওপর কঠোর অবরোধ ও অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা যেন তাদের ‘জাতিগত নিধন’ সংক্রান্ত প্রচারণা ও কার্যক্রম বন্ধ করা যায়।”

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমারের শাস্তি নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে, “প্রথমত নিরাপত্তা পরিষদের একটি উন্মুক্ত আলোচনায় বসা উচিত। রাখাইন পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার জন্য মহাসচিব অ্যান্টেনিও গুতেরেসকেও আমন্ত্রণ জানানো উচিত আলোচনায়। যারা এরকম নৃশংস অপরাধ করেছে তাদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মাধ্যমে শাস্তির বিষয় নিশ্চিত করা উচিত পরিষদের।”

তবে নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা না করে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে দ্রুত মিয়ানমারের ওপর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা আরোপেরও প্রস্তাব দিয়েছে এই মানবাধিকার সংস্থাটি। এইচআরডব্লিউ মনে করছে, “রোহিঙ্গা ইস্যুতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করা উচিত নয়। মিয়ানমারে তাদের ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা উচিত এবং অপরাধী নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা উচিত। সামরিক সহায়তা বন্ধ করা অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারি করা এবং মিয়ানমারের সেনা পরিচালিত ব্যবসাগুলোর আর্থিক লেনদেনও বন্ধ করা উচিত।”

এইচআরডব্লিউ’র বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “রোহিঙ্গাদের ওপর ভয়াবহ সহিংস ভূমিকার কারণে বিশ্বব্যপী নিন্দিত হচ্ছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী। এবার দেশটির সেনাবাহিনীর ওপর এমন কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা দরকার যেন কোনোভাবেই সে দেশের জেনারেলরা তা উপেক্ষা করতে না পারেন।”

গত ২৪ আগস্ট রাতে রাখাইন রাজ্যে পুলিশ ক্যাম্প ও একটি সেনা আবাসে কথিত সন্ত্রাসী হামলার পর মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনী নিরস্ত্র রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশুদের ওপর নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে থাকে। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী নির্বিচারে গ্রামের পর গ্রামে হামলা-নির্যাতন চালাচ্ছে। নারীদের ধর্ষণ করছে। গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে, রোহিঙ্গাদের ঘরবাড়িতে লুটপাট করছে। সেনাবাহিনীর জুলুম নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে প্রায় ৫ লাখ মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে বলে এইচআরডব্লিউ’র বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

চলতি মাসের প্রথম দিকে একটি স্যাটেলাইট ছবি প্রকাশের মাধ্যমে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছিল, অন্তত ৭০০ বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। তারা স্বাধীন পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে কাজ করার সুযোগ দিতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বানও জানিয়েছিল। গতকালের বিবৃতিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ মিয়ানমারকে উপনিবেশিক ‘বার্মা’ হিসেবে পরিচিত করেছে।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনকে ‘জাতিগত নিধন’ উল্লেখ করে তা বন্ধে বারবার সতর্ক করে আসছে জাতিসংঘ। তবে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ সেনাবাহিনীর অভিযানকে ‘সন্ত্রাসবাদবিরোধী’ বলে আখ্যা দিয়ে এতে কোনো বেসামরিক লোক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না বলে দাবি করেছে। এ অবস্থায় জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্টেনিও গুতারেস হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি এই মুহূর্তে সু চি কোন পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে পরিস্থিতি চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। ভবিষ্যতে এই পরিস্থিতি কিভাবে পরিবর্তন আসবে তা নিয়েও ভয়ের কারণ রয়েছে। আর আসলে আমি জানি না সেই ভয়ানক পরিস্থিতির পরিবর্তন কিভাবে আসবে।

এর আগে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক সংস্থার প্রধান জেইদ রা’দ আল হুসেইন রাখাইনের ঘটনাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞের পাঠ্যপুস্তকীয় দৃষ্টান্ত’ আখ্যা দিয়েছেন।