মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিবেন সু চি

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ, জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের উদ্বেগ, মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ, বিভিন্ন রাষ্ট্রের কড়া হুঁশিয়ারি—এককথায় গোটা বিশ্বের প্রতিবাদের পরও নির্বিকার মিয়ানমার। বিশ্ববাসীর বার্তাকে তোয়াক্কাই করছে না অং সান সু চির সরকার। যেকোনো উপায়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের তাদের দেশ থেকে উত্খাতের উদ্দেশ্যে পরিচালিত সশস্ত্র আক্রমণকে দেশটির সেনাপ্রধান বলছেন ‘পরিচ্ছন্নতা অভিযান’। গতকাল রবিবার তাঁর সরকারি ফেসবুক পাতায় ফুটে উঠেছে সেনাপ্রধান সিনিয়র জেনারেল মিন অংয়ের আন্তর্জাতিক জনমতকে উপেক্ষার বিষয়টি। রোহিঙ্গা নামের কোনো জনগোষ্ঠী মিয়ানমারে ছিল না এ নির্লজ্জ দাবি করে তিনি বলেছেন, ‘বেঙ্গলি ইস্যু একটি জাতীয় সমস্যা এবং এ সত্য প্রতিষ্ঠায় আমাদের ঐক্য প্রয়োজন। ’ ঐতিহাসিক ও দালিলিকভাবেই প্রমাণিত যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে শত শত বছর ধরে বসবাস করছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার ষড়যন্ত্রের নীলনকশার অংশ হিসেবে তাদের ‘বেঙ্গলি ’হিসেবে দাবি করাই শুধু নয়, তাদের হত্যা করছে, বাধ্য করছে দেশ ছাড়তে।

জাতিসংঘ মহাসচিবের প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি ও বিশ্বব্যাপী প্রবল নিন্দার মধ্যেই নিজেদের অপকর্মের সাফাই গাইলেন দেশটির সেনাপ্রধান। রাখাইনের মুসলমান জনগোষ্ঠীকে রোহিঙ্গা বলতে নারাজ তিনি। সেনা নিয়ন্ত্রিত ’গণতান্ত্রিক’ সরকারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চিও রোহিঙ্গা নাগরিকদের ‘রাখাইন রাজ্যের মুসলমান’ বলে অভিহিত করেন। বিশ্বজুড়ে এত প্রতিক্রিয়ায়ও মন গলেনি তাঁর।

তাঁর বিবেকবোধ জাগ্রত করার চেষ্টায় বিবৃতি দিয়েছেন সতীর্থ নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ীরা। ব্যক্তিগতভাবে চিঠি দিয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকারকর্মী সাবেক আর্চ বিশপ ডেসমন্ড টুডু, তিব্বতের বৌদ্ধ ধর্মগুরু দালাই লামা। এখনো মুখ খোলেননি একসময়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক এই নোবেল বিজয়ী। তবে নীরবতা ভাঙবেন মিয়ানমারের এই নেত্রী। ক্ষমতায় আসার পর এই প্রথম জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন তিনি। মঙ্গলবারের ভাষণে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে তাঁর দীর্ঘ নীরবতার কারণ হয়তো বিশ্ববাসী জানতে পারবে।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীদের অব্যাহত নৃশংসতা ও বর্বরতার মুখে প্রাণ বাঁচাতে নিজ ভূমে সহায়-সম্পদ ও স্বজন হারিয়ে বাংলাদেশ অভিমুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গার স্রোতে কিছুটা ভাটা পড়লেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ভেঙে আগ্রাসী আচরণ করছে বলে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী শরণার্থী শিবিরে অবস্থানকারী বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা কালের কণ্ঠকে জানান, যেসব পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গারা আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশের দিকে দলে দলে আসছিল, সেসব পয়েন্টে এখন অবস্থান নিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। পাশাপাশি তাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি তো রয়েছেই। সেনাবাহিনী দুই দিন ধরে অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি সেখানে বাংকারও নির্মাণ করছে।

মিয়ানমারের আগ্রাসী ও বর্বরোচিত আচরণের নিন্দায় এখন সরব বিশ্বের বড় বড় গণমাধ্যমও। শনিবার ওয়াশিংটন পোস্টের সম্পাদকীয়তে রোহিঙ্গা সমস্যাকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ব্যাপক ও নিষ্ঠুর জাতিগত নিধনের ঘটনা বলা হয়েছে। মিয়ানমারের পোড়ামাটি নীতির কারণে উত্তর রাখাইনের ৪৭১টি গ্রামের মধ্যে ১৭৬টি পুরোপুরি খালি করে দেওয়ার কথা দেশটির সরকারি ভাষ্যেই স্বীকার করা হয়েছে। এ সংকটে আন্তর্জাতিক সাড়া এখনো দুঃখজনকভাবে [জঞঋ নড়ড়শসধত্শ ংঃধত্ঃ: ]-ড়েইধপশ[জঞঋ নড়ড়শসধত্শ বহফ: ]-ড়েইধপশদুর্বল বলে উল্লেখ করে প্রভাবশালী পত্রিকাটি বলছে, বুধবার রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পর দেওয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বিবৃতিটি ছিল খুবই নরম ধাঁচের। মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চির দিকেই সবার নজর বেশি, যদিও রোহিঙ্গা নির্যাতনে তিনি দুঃখজনকভাবে নিশ্চুপ। সু চির বদলে বরং দেশটির সেনাবাহিনীর ওপর সরাসরি চাপ প্রয়োগ প্রয়োজন বলে মনে করছে পত্রিকাটি। যুক্তরাষ্ট্র সরকারেরও মিয়ানমার ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নেওয়া উচিত বলেও মনে করে দেশটির প্রভাবশালী এই দৈনিকটি। ওয়াশিংটন পোস্ট বলেছে, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সহায়তা করতে ওবামা প্রশাসন যেসব অবরোধ তুলে নিয়েছিল, এখন যুক্তরাষ্ট্রের উচিত মিয়ানমারের ওপর সেগুলো আবারও বহাল করা। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চলতি সপ্তাহে মিয়ানমারকে নিয়ে বৈঠক হয়েছিল রুদ্ধদ্বার। ওয়াশিংটন পোস্ট মনে করে, জাতিসংঘের উচিত মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নিপীড়নের বিষয়টি প্রকাশ্যে আলোচনা করা। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী বিক্ষোভ আরো বেশি হওয়া উচিত বলেও মনে করে পত্রিকাটি।

গতকাল ওআইসি এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, আজ সোমবার নিউ ইয়র্কে শুরু হতে যাওয়া জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের সাইডলাইনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বেশ কিছু বৈঠক করবে মুসলিম দেশগুলোর আন্তর্জাতিক এ সংস্থাটি। তারা বছরের পর বছর ধরে মিয়ানমারে মুসলমান রোহিঙ্গাদের ওপর চালানো জাতিগত নিধন, দেশ থেকে বিতাড়নে করণীয় নিয়ে আলোচনা করবে।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী রেক্স টিলারসন লন্ডনে বলেছেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে যে সহিংসতা চলছে তা অগ্রহণযোগ্য, এটি অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। তাঁর সঙ্গে থাকা যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন মিয়ানমারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অং সান সু চিকে তাঁর নৈতিকতাবোধ থেকে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর দুর্দশার অবসান ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

গত সপ্তাহে স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, রাখাইন রাজ্যে আগুন জ্বলছে, সেখানে মুসলিম গ্রামগুলোতে পরিকল্পিতভাবে আগুন লাগানো হয়েছে। এর আগে জাতিসংঘের একটি সংস্থা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা নাগরিকদের ওপর দেশটির সেনাবাহিনীর নির্বিচার হত্যা, নির্যাতনের ঘটনাকে জাতিগত নিধনযজ্ঞের নিখুঁত উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। ইউরোপীয় পার্লামেন্টও রাখাইনে রোহিঙ্গা নাগরিক হত্যা ও নির্যাতনের কঠোর নিন্দা জানিয়েছে।

বিশ্বের মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর সংগঠন ওআইসির মহাসচিব ড. ইউসুফ বিন আহমাদ আল-ওথাইমিন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দেখতে বাংলাদেশে এসেছিলেন। তিনি এ সময় জাতিগত নিধনের শিকার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দিয়ে সব ধরনের নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানান।

বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা বিশ্বের ভয়াবহতম শরণার্থী সমস্যার দিকে যাচ্ছে—এমন ইঙ্গিত আগে থেকে দিয়ে এলেও মানবিক বিপর্যয়ের ব্যাপকতায় বিহ্বল হয়ে পড়েছে উগান্ডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন উপদ্রুত অঞ্চলে উদ্বাস্তুদের নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো। জাতিসংঘের অভিবাসী বিষয়ক সংস্থা আইওএম-এর এক পরিচালক বলেন, বিশ্বের ভয়াবহতম পরিস্থিতির চিত্রই স্পষ্ট হচ্ছে। অন্ধ হলে প্রলয় বন্ধ থাকে না। বালিতে মুখ গুঁজে রেখে বলার উপায় নেই যে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। যদি রাজনৈতিক সমাধান না পাওয়া যায়, তাহলে মিয়ানমারের সব রোহিঙ্গাই হয়তো বাংলাদেশে চলে আসবে।

এদিকে গত শনিবার ও গতকাল রবিবার বাংলাদেশে আসা কয়েকজন রোহিঙ্গা জানায়, সীমান্তের কাঁটাতারের কাছে বিজিপির পাশাপাশি এখন সেনাবাহিনীও অবস্থান নেওয়ায় তারা বিকল্প উপায়ে নদীপথে মিয়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশে এসেছে। ২৫ আগস্টের পর থেকে যেভাবে সীমান্ত খুলে দেওয়া হয়েছিল, সেই সুযোগ আর দিচ্ছে না তারা। আবার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা যাতে ফের মিয়ানমারের রাখাইনে ঢুকতে না পারে সে জন্য কঠোর নজরদারি করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বিজিপি।

নবাগত রোহিঙ্গারা আরো জানায়, মংডু এলাকার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত গ্রামগুলোর মধ্যে একটিও আর অবশিষ্ট নেই। এখন বলতে গেলে মংডু রোহিঙ্গাহীন হয়ে গেছে। তাই মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও রাখাইন সন্ত্রাসীরা এখন রাখাইনের বন্দর শহর আকিয়াবের দিকে ঢুকেছে। তবে গত দুই দিনে সেই আকিয়াবে কোনো রোহিঙ্গা বসতিতে আগুন দেওয়ার খবর তারা পায়নি।

এদিকে টেকনাফের সদর, সাবরাং, বাহারছড়া এই তিন ইউনিয়নের বিভিন্ন সীমান্ত পয়েন্ট এবং টেকনাফের হোয়াইক্যং, উখিয়ার পালংখালী ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুনধুম সীমান্ত দিয়েও একেবারে কমে এসেছে বাংলাদেশ অভিমুখী রোহিঙ্গার স্রোত। এসব পয়েন্ট দিয়ে গত দুই দিনে দেড় হাজার থেকে দুই হাজারের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসে। এসব পয়েন্টেও মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও সীমান্তরক্ষী বিজিপি অবস্থান করছে।

সীমান্তে সেনাবাহিনীর চলাফেলা এবং বাংকার নির্মাণের বিষয়টি সরাসরি গতকাল দুপুরে প্রত্যক্ষ করেছে নাফ নদের এপারের তীরবর্তী বাসিন্দারা। টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ও নাফ তীরের উলুবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা হারুণ সিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার এলাকা উলুবুনিয়া থেকে সরাসরি দেখা যায় মিয়ানমার সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট। এসব পয়েন্ট দিয়ে ২৫ আগস্টের পর থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে। কিন্তু দুই দিন ধরে এসব পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের আসা বলতে গেলে দেখাই যাচ্ছে না। ’

হারুণ সিকদার আরো বলেন, ‘আজ (গতকাল) সকাল থেকেই দেখছি সীমান্তের এসব পয়েন্টে এখন সরাসরি পোশাক পরে বিপুলসংখ্যক সেনাবাহিনীর সদস্য অবস্থান নিয়েছে। সেখানে তারা এখন বাংকারও নির্মাণ করছে। এ কারণেই এদিকে রোহিঙ্গার স্রোত বাংলাদেশ অভিমুখে একেবারে কমে গেছে। ’

এর পরও গত ২৪ ঘণ্টায় আরো ১০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ জোর দিয়ে বলে আসছে রোহিঙ্গা সমস্যা মিয়ানমারের সৃষ্টি, এর সমাধান করতে হবে মিয়ানমারকেই। রোহিঙ্গা নাগরিকদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ দিতে বিশ্ব সম্প্রদায়ের প্রতিও আহ্বান জানিয়ে আসছে বাংলাদেশ। বিভিন্ন দেশের সরকার রোহিঙ্গা বিষয়ে তাদের অবস্থান এরই মধ্যে ব্যক্ত করেছে, জাতিসংঘের অধিবেশনেও আলোচিত হবে বিষয়টি। জাতিসংঘের আসন্ন সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে জোরালোভাবে প্রসঙ্গটি তুলবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।