প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন মজুদ আছে ধান, তবে কেন বাড়ছে চালের দাম?

আব্দুল কাদের পেশায় সরকারি চাকুরে। কয়েক দিন আগে সকালে তিনি কুষ্টিয়া পৌর বাজারে সবজি কিনতে যান। বাজার শেষে বাড়ি ফেরার পথে চালের দোকানে গিয়ে মিনিকেট চালের দাম জানতে চান। দোকানি জানান কেজি ৫৮ টাকা। অফিস শেষে বিকেলেই আব্দুল কাদের চাল কিনতে ওই একই দোকানে গেলে দোকানি জানান, দাম বেড়ে গেছে, কেজিপ্রতি ৬০ টাকা দিতে হবে। এ নিয়ে উভয় পক্ষে শুরু হয় বিতণ্ডা। অনড় দোকানি জানান চাল কিনলে কেজিপ্রতি ৬০ টাকাই দিতে হবে।

শুধু আব্দুল কাদের নন, চাল কিনতে এসে দোকানদারের সঙ্গ ক্রেতাদের এ রকম বচসা এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কুষ্টিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায় কিছুতেই না চালের বাজারের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে। চালকল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশিদের চালকলে টাস্কফোর্সের অভিযান ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায়ের এক দিন পর ১২ সেপ্টেম্বর থেকে আবারও কুষ্টিয়ার বাজারে মিনিকেটসহ সব ধরনের চালের দাম কেজিতে দুই থেকে পাঁচ টাকা বাড়ে। এ নিয়ে এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে কুষ্টিয়াসহ আশপাশের জেলায় তৃতীয় দফায় কেজিপ্রতি চালের দাম ৮ থেকে ১২ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।

কুষ্টিয়ার খুচরা চাল বিক্রেতারা জানায়, দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরের হাতে গোনা কয়েকজন মিল মালিকসহ ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেট করে দফায় দফায় চালের দাম বাড়িয়েছে। চালের বাজার নিয়ন্ত্রেণের বাইরে চলে যাচ্ছে। খাজানগরে প্রায় ৫০০ চাল কল রয়েছে। এসব কল থেকে প্রতিদিন প্রায় তিন হাজার টন চাল ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়। খাজানগরে অটোমেটিক মিল রয়েছে প্রায় ৪০টি। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অটোমেটিক মিলটির মালিক আব্দুর রশিদ। মিলের নাম রশিদ অ্যাগ্রো ফুড। তাঁর চারটি অটোমেটিক ও আটটি হাস্কিং মিল রয়েছে। রশিদের চারটি অটোমেটিক মিলে প্রতিদিন প্রায় ২০০ টন চাল উৎপাদন করা হয়।

খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, রশিদ অ্যাগ্রো, দাদা রাইসমিল, স্বর্ণা রাইসমিল, জোয়ার্দার রাইসমিল, ব্যাপারী রাইসমিল, বিশ্বাস অ্যাগ্রোসহ হাতে গোনা কয়েকটি অটোমেটিক চালকল মালিকদের কারসাজির কারণে চালের বাজারের অস্থিরতা কমছে না। তারা কম দামে ধান কিনে গুদামজাত করে রাখায় এ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

তবে খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ অস্বীকার করে দাদা রাইসমিলের মালিক ও কুষ্টিয়া জেলা চালকল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জয়নাল আবেদিন প্রধান কালের কণ্ঠকে জানান, মিল মালিকরা কারসাজি করলে বাজারে চালের ঘাটতি থাকত। কিন্তু বাস্তবতা উল্টো। ধানের ঘাটতি রয়েছে। চালের কোনো ঘাটতি নেই। কৃষকের ঘরে ধান না থাকলে মিল মালিকরা কী করবে? দেশে এখন ধানের সংকট চলছে। তাই ধান কেনার ক্ষেত্রে আমরা দাম দেখছি না। মিল চালু রাখার জন্য যে দাম পাচ্ছি সেই দামেই ধান কিনতে বাধ্য হচ্ছি। শুধু দেশে নয়, বিদেশেও চালের দাম বেড়েছে। আমদানি করা চালের দামও কেজিতে দুই টাকা বেড়ে গেছে। যার প্রভাব পড়েছে দেশের চালের বাজারে।

কিন্তু প্রশাসনের পক্ষ থেকে মিল মালিকদের দাম সহনীয় রাখতে বারবার অনুরোধ করার পরও চালের দাম বেড়েই চলেছে। গত ১০ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় চালের মূল্য বৃদ্ধি নিয়ে মিল মালিকদের সঙ্গে আলোচনা হয়। কিন্তু তাতেও কোনো ফল না হওয়ায় ১১ সেপ্টেম্বর দুপুরে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম চালের মোকাম কুষ্টিয়ার খাজানগরে চালকল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশিদের চালকলে টাস্কফোর্স অভিযান চালায়। অভিযানে আব্দুর রশিদের মিলের ১৩টি গুদামে টাস্কফোর্সের প্রধান কুষ্টিয়া সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার সাইফুল ইসলাম আড়াই লাখ টন ধানের মজুদসহ সেখানকার আরো কয়েকটি মিলে ১০ লাখ টনেরও বেশি ধান মজুদের প্রমাণ পান। প্রশাসনের অভিযান আর কঠোর নজরদারির মধ্যেই তৃতীয় দফায় ১২ সেপ্টেম্বর বিকেল থেকে কুষ্টিয়ার বাজারে আবারও মিনিকেটসহ সব ধরনের চালের দাম বৃদ্ধি পায়।

বর্তমানে খাজানগরের মিল গেটে সবচেয়ে ভালোমানের মিনিকেট ৫০ কেজির বস্তা তিন হাজার টাকা বিক্রি হচ্ছে। গতকাল সকালে কুষ্টিয়ার বাজারে মিনিকেট চাল বিক্রি হয় ৫৮ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে। কাজললতা চাল আগে যেখানে ছিল ৪৮ টাকা, এখন সেখানে ৫৪ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর আটাশ চাল আগে যেখানে ছিল ৪২ টাকা কেজি, এখন তা ৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে।

কঠোর নজরদারির মধ্যেই কুষ্টিয়ায় কেন তৃতীয় দফায় চালের দাম বাড়ল—এমন প্রশ্নের জবাবে কুষ্টিয়ার ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান বলেন, ‘চালের অব্যাহত দাম বৃদ্ধির বিষয়টি প্রশাসন খুব সিরিয়াসলি নিয়েছে। দেশের অন্য কোথাও চালকলে অভিযান পরিচালিত না হলেও আমরা খাজানগরে চালকল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশিদের চালকলে অভিযান চালিয়ে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছি। প্রতিদিনই খাজানগরে ম্যাজিস্ট্রেটসহ টিম পাঠানো হচ্ছে। আসলে কী কারণে চালের দাম দফায় দফায় বাড়ছে এটা আমরাও নিশ্চিত হতে পারছি না। ’

কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি এবং কুষ্টিয়া জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাজি রবিউল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চালের বাজারে অস্থিরতায় মানুষ উৎকণ্ঠিত হয়ে যার এক বস্তা প্রয়োজন সে দুই বা তিন বস্তা কিনেছে। বাজারে কোনো পণ্যের অস্থিরতা দেখা দিলে এমনটি হয়। আর কারা ধানের মজুদ করছে, তা জেলা প্রশাসনের অভিযানে প্রমাণিত হয়েছে। তাই আমি মিল মালিকদের উদ্দেশে বলব, নিজেদের স্বার্থের কথা ভুলে গিয়ে দেশের কথা বিবেচনা করে মজুদকৃত পুরনো ধান দিয়ে চাল উৎপাদন করুন এবং কম মুনাফা করুন। ’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের চিকন (মিনিকেট) চালের যে চাহিদা তার পুরোটা যায় কুষ্টিয়ার এই খাজানগর মোকাম থেকে। গত এক মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে এই মোকামে মিনিকেট চালের দাম তৃতীয় দফায় বেড়েছে কেজিপ্রতি আট টাকা। আর অন্যান্য চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি আট থেকে ১২ টাকা। চালকল মালিকদের দাবি, বন্যার কারণে ধানের চরম সংকট। তাই বর্তমানে বাজার থেকে বেশি দামে ধান কেনার কারণেই তাঁরা চালের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।

তবে চালকল মালিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, বর্তমানে যে ধান থেকে চাল উৎপাদন করা হচ্ছে তা কয়েক মাস আগেই কম দামে বাজার থেকে সংগ্রহ করে গুদামজাত করা।

তবে রশিদ অ্যাগ্রো ফুডের মালিক বাংলাদেশ চালকল মালিক সমিতির কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুর রশিদ সাংবাদিকদের বলেন, ধানের দাম বাড়ার কারণে এবং আবহাওয়া খারাপ থাকার কারণেই চাল উৎপাদন খরচ বাড়ছে, তাই চালের দাম বেড়েছে। আগামীতে আরো চালের দাম বাড়বে।

সম্প্রতি চালের বাজারে অস্থিরতার কারণ সরকারি একটি গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানে কুষ্টিয়া জেলায় ৫০০ মিলের মধ্যে ৭০টিতে চালের অস্বাভাবিক মজুদের প্রমাণ মেলে। এর মধ্যে ৫০টি হাস্কিং এবং ২০টি অটোমেটিক রাইসমিলের নাম রয়েছে। এসব মিলে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি ধান মজুদ রয়েছে।

সর্বশেষ খবর অনুযায়ী সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে চালের বাজারে অস্থিরতার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে রশিদ অ্যাগ্রো ফুডের মালিক আব্দুর রশিদের কুষ্টিয়ার খাজানগরের রশিদ অ্যাগ্রোসহ সংলগ্ন কয়েকটি মিলে গতকাল বিকেলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তল্লাশি চালিয়েছে।