কুর্দিস্তানে গণভোট ঠেকাতে ইরান-তুরস্কের কূটনৈতিক তৎপরতা

ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা উচ্চ পরিষদের সচিব আলী শামখানি বলেছেন, অখণ্ড এবং ফেডারেল শাসন ব্যবস্থার অধীনে ইরাকি সরকারকেই কেবল তেহরান স্বীকার করে। ইরাকের স্বায়ত্বশাসিত কুর্দিস্তান এলাকার প্রেসিডেন্ট মাসুদ বারাজানি ওই এলাকা বিচ্ছিন্ন করার জন্য গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যাপারে তার অবস্থানে অটল থাকায় এর প্রতিক্রিয়ায় আলী শামখানি এ কথা বলেছেন।

তিনি ইরাকের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ঐক্য রক্ষার ব্যাপারে ইরানের দৃঢ় অবস্থানের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, কুর্দিস্তানের স্বশাসন কর্তৃপক্ষ যদি কোনো ভুল পথে চলে তাহলে তাদের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের নীতিতে ইরান পরিবর্তন আনতে বাধ্য হবে। স্বায়ত্বশাসিত কুর্দিস্তান ইরাক থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য গণভোট নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

ইরাকের সব রাজনৈতিক দল, প্রতিবেশী দেশগুলো, ইউরোপ ও এমনকি আমেরিকাও কুর্দিস্তানে গণভোটের বিরোধিতা করা সত্বেও মাসুদ বারাজানি তার অবস্থানে অটল রয়েছেন। স্বশাসন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাসুদ বারাজানি যে কোনো পরিস্থিতিতে ২৫ সেপ্টেম্বর গণভোট অনুষ্ঠানের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, তবে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর যদি গণভোটের জন্য উপযুক্ত সময় না হয় তাহলে আন্তর্জাতিক সমাজকে উপযুক্ত সময়ে গণভোট দেয়ার বিষয়ে নিশ্চয়তা দিতে হবে। তবে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ইরান বারাজানির এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, কুর্দিস্তানকে ইরাক থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য প্রস্তাবিত গণভোট ইরাক ও প্রতিবেশী দেশগুলোর সীমান্তে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির সুযোগ এনে দেবে। উগ্র তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী দায়েশের মাধ্যমে নৈরাজ্য ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর এখন কুর্দিস্তান নিয়ে ফের গোলযোগ সৃষ্টির ষড়যন্ত্র চলছে যার ফলে একমাত্র ইসরাইলই লাভবান হবে। ইসরাইল বহু দিন ধরে এ অঞ্চলের মুসলিম দেশগুলোতে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে আসছে। ইরাকের ভাইস প্রেসিডেন্ট নুরি আল-মালিকি বাগদাদে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডগলাস সিলিম্যানের সঙ্গে বৈঠকে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, তার দেশের উত্তরাঞ্চলে কুর্দিস্তান নামের কোনো ‘দ্বিতীয় ইসরাইলের’ অস্তিত্ব মেনে নেবে না বাগদাদ।

এ অবস্থায় ইরাকের প্রতিবেশী দেশগুলো যারা শুরু থেকেই কুর্দিস্তানে গণভোটের তীব্র বিরোধিতা করে আসছে তারা এর বিপজ্জনক পরিণতির বিষয়ে বার বার সতর্ক করেছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বাহরাম কাসেমি কাতারের আল জাজিরা টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেছেন, “কুর্দিস্তানকে ইরাক থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য গণভোটের পদক্ষেপ মারাত্মক ভুল এবং এ অঞ্চলের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বিরাট হুমকি।” তুরস্ক সরকারও কুর্দিস্তানে গণভোটের তীব্র বিরোধিতা করেছে এবং আঙ্কারা ও তেহরান গণভোট ঠেকাতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। কুর্দিস্তানে গণভোটের সমর্থকরা মনে করছেন, দায়েশ সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব ও চলমান যুদ্ধের কারণে ইরাকে এই মুহূর্তে অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করায় কুর্দিস্তানে গণভোটের এখনই সুযোগ।

যাইহোক, ইরাকের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে এবং ইরাকের নিরাপত্তা ইরানেরও নিরাপত্তা। তাই ইরান যে কোনো মূল্যে ইরাকের ভৌগোলিক অখণ্ডতা বজায় রাখার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এ ছাড়া, কুর্দিস্তান এলাকায় ইরান ও ইরাকের দীর্ঘ সীমান্তে ইরান বিরোধী তৎপরতা চলছে এবং এর পেছনে ইসরাইলের হাত রয়েছে। এ অবস্থায় বিচ্ছিন্নতার জন্য কুর্দিস্তানে গণভোট তেহরানের পক্ষে মেনে নেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যদি কুর্দিস্তান আলাদা হয়ে যায় তাহলে ইরান তার নিরাপত্তার স্বার্থে কঠোর অবস্থান নিতে বাধ্য হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।