নায়করাজের স্মরণে চলচ্চিত্র পরিবার আয়োজিত স্মরণ সভা

গতকাল ২৬ আগস্ট শনিবার নায়করাজ রাজ্জাকের স্মরণে চলচ্চিত্র পরিবার এক স্মরণ সভার আয়োজন করে। এই স্মরণ সভায় চলচ্চিত্র পরিবারের পক্ষ থেকে দিনভর আলোচনা সভা, কোরআন খতম, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়ে ছিল।

সকাল ১০টায় এফডিসির জহির রায়হান কালার ল্যাব ভিআইপি অডিটরিয়ামে নায়করাজের কর্মময় জীবনের ওপর আলোচনা সভার পর দুপুরে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়ে ছিল। এছাড়া এফডিসি মসজিদে সকাল থেকে কোরআন খতম করা হয়। উক্ত অনুষ্ঠানে চলচ্চিত্র পরিবারের প্রায় সবাই উপস্থিত ছিলেন। অভিনেতা আলমগীর, ফারুক, সোহেল রানা, ফেরদৌস, চম্পা, সুচন্দা, নতূন, জায়েদ খান, মিশা সওদাগর, বাপ্পারাজ, সম্রাট, টেলিসামাদ, নিপুণ, রোজিনা, আনোয়ারা, আমজাদ হোসেন সহ আরও অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী, কলাকুশলী তখন উপস্থিত ছিলেন। প্রত্যেকেই নায়করাজকে নিয়ে নিজেদের অনেক স্মৃতিচারণও করেন।

আলোচনা সভায় ব্যাক্তব রাখেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী সুচন্দা। তিনি বলে, ‘নায়করাজ বাংলা চলচ্চিত্রের ধ্রুবতারা। আমার চোখে মহানায়ক নায়করাজ রাজ্জাক। নিষ্ঠা আর শ্রম দিয়ে মানুষের হৃদয়ে তিলে তিলে জায়গা করে নিয়েছেন। তিনি আমাদের চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি। তিনি আমাদের অভিভাবক। তার অভিনয়শৈলী নিয়ে বলার মতো দুঃসাহস আমার নেই।’

রাজ্জাকের সাথে জুটি বেঁধে সুচন্দার প্রথম সিনেমা ‘বেহুলা’। এই ছবি দিয়ে রাজ্জাকও চলচ্চিত্রে নায়ক হিসেবে পা রাখেন উল্লেখ করে সুচন্দা বলেন, ‘আমরা একসাথে ২৫-৩০টির মতো সিনেমা করেছি। সবই সুপারহিট। তার অনেকগুলো কালজয়ীও হয়েছে। উনার মতো ত্যাগী অভিনেতা আমি আর কোথাও দেখিনি। না খেয়ে না ঘুমিয়ে তিনি দিনের পর দিন এফডিসিতে পড়ে থাকতেন, শুটিং করতেন।’

আলোচনা সভায় সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে হাজির হয়ে ছিলেন নায়ক রাজ্জাকের বড় ছেলে বাপ্পারাজ ও ছোট ছেলে সম্রাট। বাপ্পারাজ তার বাবা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বেশ কয়েকবার বাকরুদ্ধ হয়ে যান, আবেগে কাঁদেন, কখনো কখনো আবেগের সঙ্গে মিশে ছিল ক্ষোভও। তিনি নিজেও একসময় বাংলা সিনেমার জনপ্রিয় নায়কদের একজন ছিলেন। সন্তান হিসেবে বাবা সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা আর সমালোচনার উত্তর দিলেন বাপ্পারাজ।

উত্তরায় রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স নিয়ে প্রচলিত ভুল ধারণার কথা নিয়ে বলেন, ‘একটা ভুল ধারণা আছে যে, উনি সিনেমা হলের নাম করে মার্কেট করেছেন। অনুমতিটা সিনেমা হলের নাম করে নিয়েছেন। না, মার্কেটের কথা বলেই অনুমতি নেওয়া। মার্কেটটা ওখানে মার্কেট হিসেবেই তৈরি করা হয়েছিল। পরে আমরা সিনেমা হল করার চেষ্টা করেছিলাম, রাজউক থেকে অনুমতি দেওয়া হয়নি। মার্কেটটির নকশায় একটা বাধা ছিল। ওই ভবনটায় অনেক পিলার ছিল। সেটা ভেঙে জায়গা বের করে সিনেমা হল করার কোনো উপায় ছিল না। পরে ওপরে সিনেমা হল করার চেষ্টা করেছিলাম, তখনো অনুমতি দেওয়া হয়নি। কিছুদিন আগেও ওখানের বিসিকের একটা অডিটোরিয়াম ছিল, ওটাও আমরা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম সিনেমা হল করার জন্য। উত্তরার একটি স্কুলের পাশে হওয়া সেটাও করা যায়নি। তাই করা হয়নি। এই হলো রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্স ঘটনা।’

তিনি আরোও বলেন, ‘এটা নিয়ে অনেকেরই ভুল ধারণা আছে, আমি পরিষ্কার করে দিলাম। রাজ্জাক সাহেব দুই নম্বরি করে মার্কেট বানাননি, রাজ্জাক সাহেব সৎ থেকে মার্কেট বানিয়েছেন। রাজ্জাক সাহেব যদি দুই নম্বরি করে বানাতেন, তাহলে উত্তরায় আরও চার-পাঁচটা মার্কেট থাকত। তিনি সৎ থাকার কারণে নিজেদের বাড়ির একটা অংশ বিক্রি করে দিতে হয়েছিল। আমাদের এত বড় একটা বাড়ি ছিল, ব্যবসায় ক্ষতি করার পরে ব্যাংকের মাত্র চার কোটি টাকা ঋণ ছিল। লাখ লাখ, কোটি কোটি টাকা মানুষ মেরে দেয়, আবুল-করিম-গফুররা এমন করে, কোনো কথা ওঠে না কখনো। কিন্তু রাজ্জাক সাহেবের নামে আসবে, রাজ্জাক সাহেব চার কোটি টাকা মেরে দিয়েছেন, ব্যাংকে ডিফল্টার। আমরা আমাদের বাড়ি বিক্রি করে লোন শোধ করে দিয়েছি। আমরা অসৎ হলে মেরে দিতে পারতাম ওই টাকা। আরও বাড়ি করতে পারতাম, ডেভেলপার দিয়ে ফ্ল্যাট বানাতাম। এই ফ্ল্যাটগুলো কিন্তু আমাদের না, সেগুলো আমরা বিক্রি করে দিয়েছি। ওখানে আমাদের কোনো ফ্ল্যাট নেই।’

তারপর বর্তমানে চলচ্চিত্র পরিবারের একেক সময় একেক তারকাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা, নোটিশ পাঠানো ইত্যাদি নিয়েও বাপ্পারাজ কথা বলেন। তিনি বলেন- ‘রাজ্জাকের সম্মানে আজকে থেকে আমরা এই নিষিদ্ধ নিষিদ্ধ খেলাটা বন্ধ করে দিই। আমরা আমাদের পরিবারের সদস্যদের বুকে নেওয়ার অভ্যাসটা গড়ে তুলি। আজকে সুচন্দা আন্টি (নায়িকা সুচন্দা) যদি শাকিবকে ফোন করে বলে, তুমি এফডিসিতে পরিচালক সমিতিতে আসো, আমি তোমার সঙ্গে কথা বলব। ফারুক সাহেব, আলমগীর সাহেব যদি অফিসে বসে বলে, শাকিব আসো, তোমার সঙ্গে কথা বলব। শাকিব অবশ্যই আসবে। এটার জন্য নোটিশ করার দরকার হয় না। পুলিশ পাঠানোর দরকার হয় না।’

এরপর মিশা সওদাগর তার বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন- ‘মিশা বলেছেন, আমরা কাউকে বয়কট করিনি। শুধু স্থায়ীভাবে আমরা একজনের সদস্যপদ স্থগিত করেছি। যেটা মিডিয়াতে প্রচার হয়েছে সেটা ভুল।’