একুশে আগস্ট, রক্তাক্ত ও কলঙ্কময় একটি দিনের নাম

একুশে আগস্ট, রক্তাক্ত ও কলঙ্কময় একটি দিনের নাম। বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নারকীয় সন্ত্রাসী হামলার ১৩তম বার্ষিকী আজ। ১৩ বছরেও শেষ হয়নি ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা দুই মামলার বিচার। ২০০৪ সালের এইদিনে রাজধানী ঢাকায় আওয়ামী লীগের সমাবেশে চালানো হয় নজিরবিহীন এক হত্যাযজ্ঞ। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় গ্রেনেডের দানবীয় ত্রাস আক্রান্ত করে মানবতাকে।

ওই হামলায় প্রাণে বেঁচে যান বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। তবে প্রাণ দিতে হয় আওয়ামী লীগের ২৪ নেতাকর্মীকে। ওই হামলার ক্ষত এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতাকর্মী। সেই দিনের সন্ত্রাসী হামলায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। রাজধানীর মতিঝিল থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা দুটি দায়ের করা হয়। বিচারকাজ কবে শেষ হবে তাও জানে না রাষ্ট্রপক্ষ! রাষ্ট্রপক্ষ বলছেন, বিচারপ্রার্থীরা মামলার রায়ের জন্য আদালতের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাদের জন্য মামলা দুটির বিচার কার্যক্রম খুব দ্রুত শেষ করা উচিত। আমরা আশাবাদী খুব দ্রুতই মামলা দুটির বিচার শেষ হবে।

হামলার ধরন ও প্রচণ্ডতা থেকে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যেকোনও মূল্যে শেখ হাসিনাকে হত্যা করাই ছিল ওই গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণের উদ্দেশ্য। ওই সময় আওয়ামী লীগের নেতারা শেখ হাসিনাকে ঘিরে ধরে মানববর্ম রচনা করে রক্ষা করেছিলেন। তবে নিহত হন দলের মহিলা বিষয়ক সম্পদক ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিনী আইভি রহমানসহ ২৪ জন নেতা-কর্মী। আহত হন পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী। তাদের অনেকেই আজও পঙ্গু অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

২১ আগস্টের হামলার শিকার বর্তমান সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ছিল তৎকালীন জোট সরকারের অব্যাহত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমাদের শান্তির সমাবেশ। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে করা হয়েছিল সমাবেশের প্রধান অতিথি। ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর মৃত্যুপুরী থেকে নেত্রীকে আমরা উদ্ধার করে নিয়ে আসি। শেখ হাসিনা ওখান থেকে কোনওভাবেই আসবেন না।

ওই হামলার পর আমরা যখন রাজনৈতিক কর্মসূচি নিয়ে ভাবছি শেখ হাসিনা তখন সেসব কিছুর ঊর্ধ্বে উঠে চিন্তা করছিলেন দেশের জনগণ ও গণতন্ত্রের কথা। তিনি ভাবছিলেন দেশের শান্তি-শৃঙ্খলার কথা। সন্ত্রাসবিরোধী শান্তি মিছিলের আগে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ট্রাকের ওপর বানানো মঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা করেন শেখ হাসিন। বক্তৃতা শেষ হওয়ার পরপরই তাকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি গ্রেনেড হামলা শুরু হয়। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে থাকে একের পর এক গ্রেনেড। কিছু বোঝে ওঠার আগেই মুহুর্মুহু ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরণের বীভৎসতায় মুহূর্তেই মানুষের রক্ত-মাংসের স্তূপে পরিণত হয় সমাবেশস্থল। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ পরিণত এক মৃত্যুপুরীতে।  রক্তের স্রোত বয়ে যায় রাজপথে। গ্রেনেডের স্প্লি­ন্টারের আঘাতে মানুষের হাত-পাসহ বিভিন্ন অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। সভামঞ্চ ট্রাকের চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় রক্তাক্ত নিথর দেহ। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। মুমূর্ষুদের কাতর আর্তনাদে অবর্ণনীয় মর্মান্তিক এক দৃশ্যের অবতারণা হয় সেদিন। রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় আহতদের তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।

ঘটনার পরদিন মতিঝিল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে থানা পুলিশ। পরে তদন্তের দায়িত্ব পায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। পরবর্তীতে মামলাটি যায় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগে (সিআইডি)। ২০০৮ সালের ১১ জুন সিআইডির জ্যেষ্ঠ এএসপি ফজলুল কবির মুফতি হান্নানসহ ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন।

২০০৯ সালের ৩ আগস্ট রাষ্ট্রপক্ষ মামলাটি অধিকতর তদন্তের আবেদন করলে ট্রাইব্যুনাল তা মঞ্জুর করেন। মামলা তদন্তের দায়িত্ব পান সিআইডির পুলিশ সুপার আব্দুল কাহ্হার আখন্দ। তিনি ২০১১ সালের ৩ জুলাই তারেক রহমানসহ ৩০ জনের নাম যুক্ত করে মোট ৫২ জনের নামে হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি অভিযোগপত্র দেন।

মামলায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও জেএমবি সদস্য শহিদুল আলম বিপুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ায় তাদের নাম বাদ দেয়ায় এখন আসামির সংখ্যা ৪৯। এর মধ্যে তারেক রহমানসহ ১৮ জন পলাতক রয়েছেন। এছাড়া জামিনে আট এবং কারাগারে রয়েছেন ২৩ জন।