মরণোত্তর বিচারের সুযোগ থাকলে জিয়ার বিচার করতাম: আইনমন্ত্রী

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ এনে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মরণোত্তর বিচারের দাবি করলেও এর সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক। আইনে মরণোত্তর বিচারের কোনো সুযোগ নেই, থাকলে করতাম বলে জানিয়েছেন তিনি। 

শনিবার ধানমন্ডির জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মৃতি জাদুঘরে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। ‘বঙ্গবন্ধু মার্ডার কেস: জার্নি, অ্যাকমপ্লিসমেন্ট অ্যান্ড রিমেইনিং চ্যালেঞ্জ’ (বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলা: ধারাবাহিকতা, অর্জন ও প্রতিবন্ধকতা) শীর্ষক এই আলোচনা সভার আয়োজন করে আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন (সিআরআই)।

এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যার সঙ্গে জড়িত, কিন্তু তিনি মৃত বিধায় তাকে আসামি করা হয়নি। আইনে মরণোত্তর বিচারের কোনো সুযোগ নেই, থাকলে করতাম।’ তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় না এলে বঙ্গবন্ধুর খুনিদের বিচার হতো না। বঙ্গবন্ধুর যেসব খুনি এখনো বিদেশে অবস্থান করছে তাদের এনে বিচার কার্যকর করা হবে। তারা যে গর্তেই থাকুক না কেন তাদের টেনে বের করে আনা হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হাইকোর্টের আটজন বিচারপতি এ মামলা পরিচালনায় বিব্রতবোধ করেছেন। এমন আচরণ দায়িত্বহীনতার কাজ। তারা কেন বিব্রত হয়েছেন সেটা খতিয়ে দেখা উচিত।’

বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহেনার ছেলে রেদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি আলোচনা শেষে সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বক্তব্য দেন। তিনি প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার দায়িত্বে আছেন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত শ্রোতাদের প্রশ্ন নেয়া হয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও আইন পেশাসহ বিভিন্ন পেশার কয়েকশ লোক অনুষ্ঠানে শ্রোতা ছিলেন।

পলাতক খুনিদের মধ্যে নূর চৌধুরী কানাডায় এবং এ এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, ‘কানাডায় মৃত্যুদণ্ড আইন নেই । তারা বলছে তাকে পাঠাতে পারি কিন্তু তোমাদের কথা দিতে হবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে পারবে না। কিন্তু সেটাতো হয় না। আর এ এম রাশেদ চৌধুরী রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন যুক্তরাষ্ট্রে। আমরা তাদেরসহ সব খুনিকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করতে কাজ করছি।’

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যা এবং ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় একই পরিবার নেপথ্য ভূমিকায় ছিল বলে অভিযোগ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘১৫ আগস্টের ঘটনায় জিয়াউর রহমান সুবিধা পেয়েছেন। তিনি খুনিদের পুরস্কৃত করেছেন, বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়েছেন। ‍বঙ্গবন্ধুর খুনিদের যেন বিচার না হয় এর ব্যবস্থা করেছেন। আর ২১ আগস্টের মোটিভ ছিল শেখ হাসিনাকে হত্যা করার। এসময় সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই তাজউদ্দিনকে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়া হয় হাওয়া ভবনের নির্দেশে।’ বঙ্গবন্ধুর খুনিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের কাজ একাংশ শেষ হয়েছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘কর্নেল রশিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়েছে। আর যারা পলাতক আছেন তাদের সম্পত্তি চিহ্নিত ও বাজেয়াপ্ত হচ্ছে।’

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সময় সেনাপ্রধান ছিলেন কে এম সফিউল্লাহ আর বিমান বাহিনীর প্রধান ছিলেন এ কে খন্দকার। পরবর্তী সময়ে এ কে খন্দকার মন্ত্রী এবং কে এম সফিউল্লাহ আওয়ামী লীগের এমপি হয়েছিলেন। তাদের ভূমিকা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার তারা তাদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। ইতিহাস দেখবে যে তারা কীভাবে এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন।’

মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর জীবনী মিডিয়ায় আরও তুলে ধরতে হবে।’ এক পরিসংখ্যান দেখিয়ে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বেঁচেছিলেন ৫৫ বছর, এর মধ্যে ৩১ বছর সক্রিয় রাজনীতি করেছেন। যেখানে তিনি প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা ঘুমাতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মাত্র এক হাজার ৩১৩ দিনে তিনি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে দাঁড় করিয়েছেন। আমার মনে হয় এ কথাগুলো মিডিয়ায় কেন জানি গুরুত্ব সহকারে প্রকাশ হয় না।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু বলেছেন আমার বড় যোগ্যতা আমি মানুষকে ভালোবাসি আর আমার দুর্বলতা আমি মানুষকে বড় বেশি ভালোবাসি। আমাদের এ কথার মর্ম বুঝতে হবে।’ ঢাবি ভিসি বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলাম ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসবেন, আমরা তার কথা শুনবো। কিন্তু পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। কালো আইন জারি করে এ হত্যাকাণ্ডের বিচারের পথ বন্ধ করা হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরপরই দায়মুক্তি (ইনডেমনিটি) অধ্যাদেশ জারি করা হয়। ২১ বছর পর বিচার শুরু হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের কোথাও নেই হত্যা করেছে, বিচার করবে না আবার করতেও দেবে না। ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বর দায়মুক্তি আইন বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার।’

জনকণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায় বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার পর বাংলাদেশের গণমাধ্যম বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবিতে দাঁড়ায়নি। যেটা হত্যা পরবর্তী পেপার দেখলেই বোঝা যায়। এর জন্য আমার লজ্জা হয়। এমকি এ নিয়ে তেমন লেখাও হয়নি। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে ব্যাপক জনসমর্থন পেলে কিছুটা লেখা শুরু হয়।’

https://www.facebook.com/cri.bangladesh/videos/1436243816413287/