রোহিঙ্গা মুসলিমদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল ভারত, আতঙ্কে রোহিঙ্গা মুসলিম

ভারতে অবৈধভাবে বসবাসরত প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমদের ফেরত পাঠানোর খবরে যথেষ্ট আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তারা। গত সপ্তাহেই ভারতের স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী কিরেন রিজিজু জানান, ভারতে অবৈধভাবে বাস করা রোহিঙ্গা মুসলিমদের চিহ্নিতকরণ করে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠোনোর ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট রাজ্য সরকারগুলিকে একেবারে জেলা স্তর থেকে টাস্কফোর্স গঠন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

১৯৪৬ সালের ১৪ ফরেনারস অ্যাক্ট অনুয়ায়ী অবৈধ রোহিঙ্গা মুসলিমদের ফেরত পাঠানো হবে বলেও জানান তিনি। সরকারের ওই সিদ্ধান্তের পরই আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে গত ছয় বছর ধরে দক্ষিণ ভারতের হায়দরাবাদের ওল্ড সিটিতে উদ্বাস্তু হিসাবে বসবাস করা কয়েক হাজার রোহিঙ্গা মুসলিম পরিবারের।

হায়দরাবাদের বালাপুর এলাকায় অবস্থান করা মুসলিম ধর্মগুরু মৌলানা হামিদ-উল-হক (৫০) জানিয়েছেন, ‘আমাদের নিজেদের দেশে (মিয়ানমার) ফেরত না পাঠিয়ে যদি ভারতেই মেরে ফেলা হতো তবে ভাল হতো। আমাদের যদি জোর করে দেশে ফেরত পাঠানো হয় তবে নিশ্চিত যে, সেখানে আমাদের খুন করে ফেলা হবে’।

২০১১ সালে মিয়ানমারে সেদেশের সেনাবাহিনী ও বৌদ্ধ মৌলবাদীরা রোহিঙ্গা মুসলিমের ওপর নির্যাতন করে বলে অভিযোগ। সেসময়ই মিয়ানমার ছেড়ে অরক্ষিত বাংলাদেশ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের হায়দরাবাদে আশ্রয় নেয় মৌলানাসহ কয়েকশত রোহিঙ্গা মুসলিম।

মৌলানা জানান, ‘আমাদের উদ্বাস্তু হিসাবে স্বীকার করে ভারত সরকার আমাদের ওপর যথেষ্ট দয়ালু মনোভাব দেখিয়েছে। তেলেঙ্কানা রাজ্য সরকার আমাদের ওপর খুব ভালভাবে নজর দিয়ে আসছে এবং আমরা এখানে খুব নিরাপদ ও সুরক্ষিত বলে মনে করছি। এখন হঠাৎ করে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্তে আমাদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার করেছে’।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্তে রাতের ঘুম উধাও হয়েছে সুলতান মোহম্মদ (৭০)এরও। প্রায় তিন বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন স্টেটে তাঁর কৃষি জমি ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া রোহিন্দা মুসলিম সুলতান বর্তমানে হায়দরাবাদের হাফিজ বাবা নগরে শিক্ষকতার কাজ করছে। সুলতান জানান, ‘মিলিটারি সেনারা আমার বাসায় হামলা চালায় এবং আমার সব সম্পত্তি নষ্ট করে দেয়। এরপর আমি আমার স্ত্রী ও দুই ছেলেকে নিয়ে ভারতে চলে আসি। আমরা নরেন্দ্র মোদির সরকারের কাছে কৃতজ্ঞ যে, তারা উদ্বাস্তু হিসাবে আমাদের এখানে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আমি প্রায় মৃত্যুর কাছাকাছি চলে এসেছি এবং আমি আমার পরিবারকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই’।

কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাথমিক অনুমান ভারতে প্রায় ৪০ হাজার অবৈধ রোহিঙ্গা মুসলিম অবস্থান করছে, যদিও জাতিসংঘ হাইকমিশন ফর রিফিউজি (ইউএনএইচসিআর)’এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করা এনজিও সংস্থা ‘কনফেডারেশন অফ ভলান্টারি অ্যাসোশিয়েসন’এর ডিরেক্টর মাজহার হোসেন জানান, সংখ্যাটা মোটেও ১৬ হাজারের বেশি হবে না। সরকারের দাবি অনুযায়ী তারা অবৈধ অনুপ্রবেশকারী নয়, জাতিসংঘ কনভেনশন অনুযায়ী তারা সকলেই শরণার্থীর মযার্দা পেয়েছে। হায়দরাবাদে বসবাসরত এই শরণার্থীদের ইউএনএইচসিআর’এর পক্ষ থেকে সচিত্র পরিচয়পত্রও প্রদান করা হয়েছে’।

হায়দরাবাদের বালাপুর, হাফিজ বাবা নগর, পাহাড়িশরিফ, মীর মোমিন পাহাড়ি এবং কিষাণবাগ বস্তি এলাকায় অর্ধমানবিক অবস্থায় বসবাস করছে কয়েক হাজার রোহিঙ্গারা। বাসা ভাড়ার জন্য প্রতিটি পরিবারকেই মাসিক প্রায় ৬০০ রুপি ব্যায় করতে হয়। ইউএনএইচসিআর’এর নিবন্ধিকরণ কর্মকর্তা মহম্মদ মুসা আজমি জানান, ‘প্রায় ৮০ শতাংশ রোহিঙ্গা মুসলিমই এই এলাকায় বসবাস করছে এবং তারা প্রত্যেকেই দৈনিক শ্রমিকের কাজ করে’।

মিয়ানমারের বৌথিডাউং থেকে হায়দরাবাদে আশ্রয় নেওয়া দিল মোহম্মদ (৫৩) জানান, ‘প্রতি সপ্তাহে আমি দুই দিন করে কাজ পাই, দিনপ্রতি ৪৫০ রুপির কাজ করি। এই আয় দিয়েই আমার পুরো পরিবারকে চালাতে হয়।

ভারতের ব্যুরো অফ ইমিগ্রেশন’এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী হায়দরাবাদ ছাড়াও উত্তর প্রদেশ, হরিয়ানা, দিল্লি, রাজস্থান এবং মুসলিম অধ্যুষিত রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরে রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে।