শাহজালাল বিমানবন্দরে অগ্নিকান্ড, ২ ঘণ্টা বন্ধ ছিল বহির্গমন কার্যক্রম

গতকাল শুক্রবার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের মূল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় প্রায় দুই ঘণ্টা বিমান উড্ডয়নসহ টার্মিনাল ভবনে বহির্গমন কার্যক্রম বন্ধ ছিল। এ সময়টাতে আন্তর্জাতিক রুটের অন্তত ছয়টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়। তবে দু-একটি ফ্লাইট অবতরণ করে। কয়েকটি ফ্লাইট ঘুরিয়ে চট্টগ্রামে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। হঠাৎ করে এমন পরিস্থিতিতে বিপাকে পড়েন হজযাত্রীসহ বিদেশগামী কয়েক শ যাত্রী।

ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ফ্লাইট স্বাভাবিক হয়ে আসে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, অগ্নিকাণ্ডে এয়ার ইন্ডিয়া অফিস ছাড়া তেমন ক্ষতি হয়নি। তবে আগুনের কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি। ঘটনা তদন্তে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তাদের সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসও তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে। তাদের চার কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে হবে। একাধিক সূত্র জানিয়েছে, দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে এমন আগুনের পেছনে কর্তৃপক্ষের অবহেলা রয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত স্থাপনার ভেতরেই যেখানে-সেখানে বিমানবন্দরে কর্মরতরা লুকিয়ে ধূমপান করেন। তৃতীয় তলার বৈদ্যুতিক সংযোগও ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জুমার নামাজের পরপর বেলা দেড়টার দিকে বিমানবন্দরের মূল ভবনের তৃতীয় তলায় আগুনের সূত্রপাত হয়। বিমানবন্দরজুড়ে বেজে ওঠে ফায়ার অ্যালার্ম। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় বহির্গমন হল। পোড়া গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। পুরো বিমানবন্দরের বিদ্যুৎ-সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিমানে ওঠার জন্য যেসব যাত্রী বহির্গমন হলে ঢুকেছিলেন, তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। নিরাপত্তারক্ষী এবং বিমানবন্দরের কর্মকর্তারা সবাইকে বহির্গমন হল থেকে বাইরে বের করে দেন। অবতরণ চালু ছিল। বিকেল চারটার দিকে বিমানবন্দরের পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন কাজী ইকবাল করিম সাংবাদিকদের বলেন, সব মিলিয়ে দুই ঘণ্টার মতো কার্যক্রম বন্ধ ছিল। ডিপারচার (বহির্গমন) এবং অ্যারাইভাল (আগমন) বিঘ্নিত হয়েছে, কিন্তু কোনোটা বাতিল হয়নি। যাত্রীদের এক ঘণ্টার মতো দেরি হয়েছে। কোনো ধরনের হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। এ ঘটনার জন্য কাকে দায়ী করবেন এমন প্রশ্নের জবাবে পরিচালক বলেন, ‘আমরা এখনো নিশ্চিত নই, উৎস কী। উৎস যদি মনুষ্যসৃষ্ট হয়, তাহলে আমরা ব্যবস্থা নিব। মনুষ্যসৃষ্ট না হলেও ধরে নিব সিস্টেমের কোনো ত্রুটি আছে। যদি শর্টসার্কিট হয়, তবে কিসের জন্য শর্টসার্কিট হলো, এটার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।’ তিনি বলেন, এত নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার মধ্যেও এ ধরনের ঘটনা যে ঘটতে পারে, এটা তাঁদের জন্য বড় শিক্ষণীয় বিষয়।

বহির্গমন হল থেকে বের করে দেওয়ার পর যাত্রীদের অধিকাংশই অবস্থান নেন বাইরে। হাফিজ আবদুর রহমান নামের এক হজযাত্রী প্রথম আলোকে বলেন, নওগাঁর সাপাহার থেকে তাঁরা ১৮ জন এসেছেন। বিকেল ৫টা ২৫ মিনিটে সৌদি এয়ারলাইনসে তাঁদের ফ্লাইট ছিল। বিমানবন্দরে ঢুকে লাগেজ জমা দিতে গিয়ে ফায়ার অ্যালার্ম বেজে ওঠে। ধোঁয়া আর পোড়া গন্ধ এসে নাকে লাগে। যাত্রীদের সবাইকে বাইরে বের হয়ে যেতে বলা হয়। তাঁরাও বাইরে বেরিয়ে আসেন। আবদুর রহমানের ফ্লাইট ছাড়ে প্রায় দুই ঘণ্টা দেরিতে, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায়। আগুন লাগার পর থেকে পুলিশ, এপিবিএন এবং র‍্যাবের সদস্যরা বহির্গমন এলাকায় ঢোকা ও বের হওয়ার পথে অবস্থান নেন। তাঁরা কাউকে ভেতরে ঢুকতে দেননি। এ সময় অনেক যাত্রীকে বিভ্রান্ত দেখা যায়। কিশোরগঞ্জের আবদুস সোবহানের দুবাই যাওয়ার ফ্লাইট ছিল ৪টা ৩৫ মিনিটে। অগ্নিকাণ্ডের কারণে সবকিছু বন্ধ দেখে তিনি একেকবার একেকজনকে একেক প্রশ্ন করছিলেন। কিন্তু কারও কাছ থেকেই কোনো উত্তর পাচ্ছিলেন না। শেষমেশ বহির্গমনে ঢোকার পথের সামনেই বসে পড়েন।

অগ্নিনির্বাপণকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূল ভবনের তৃতীয় তলায় যেখানে আগুন লেগেছে, সেখানে এয়ার ইন্ডিয়া, কাতার এয়ারওয়েজ ও সৌদিয়ার কার্যালয় পাশাপাশি। আগুনে এয়ার ইন্ডিয়ার কার্যালয়ের লকার, কাগজপত্র সব পুড়ে যায়। অগ্নিনির্বাপণ করতে গিয়ে আশপাশের দু-একটি কার্যালয় কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। উত্তরা ফায়ার ব্রিগেডের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আইপিএস থেকে বা শর্টসার্কিট থেকে আগুন লেগেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগুনে কক্ষের সবকিছু পুড়ে যাওয়ার পর ওপরের ফলস সিলিংয়ে লাগায় বেশি ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়। ঘটনাস্থলে থাকা উত্তরা ফায়ার ব্রিগেডের স্টেশন অফিসার শফিকুল ইসলাম জানান,  আগুন লাগার ঘটনায় কী ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তা নিরূপণ করতে আরও সময় লাগবে।