বিশ কিলোমিটার খাল অবমুক্ত করতে পানিতে নামলেন ইউএনও মনদীপ

ভবদহের মৌসুমী দুঃখ ফিরে এসেছে আবার। পলি জমে ভরাট হয়ে গেছে খাল-নদী। আবার সরকারি খাল প্রভাবশালীদের দখলে চলে যাওয়ায় কয়েক দফা ভারী বর্ষণে তলিয়ে গেছে এ অঞ্চলের শতাধিক গ্রাম। পানি ঢুকে বন্ধ অর্ধশত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অনেকে বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছেন রাস্তায়। বন্যাদুর্গত এ অধিবাসীদের আস্থা নেই স্থানীয় সংসদ সদস্য বা জনপ্রতিনিধিতে। অতীত অভিজ্ঞতায় মনুষ্যসৃষ্ট মৌসুমী এ দুর্যোগকে তাই ‘ভাগ্য’ হিসেবে নিয়েছেন তারা।

তবে গত ৩০ জুলাই জলাবদ্ধ এলাকার একাংশ অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মনদীপ ঘরাইয়ের এক ফেসবুক স্ট্যাটাস বদলে দিয়েছে দৃশ্যপট। কোনো জনপ্রতিনিধি, অনুদান নয়, এলাকাবাসীই উদ্বুদ্ধ হয়ে দিচ্ছে স্বেচ্ছাশ্রম। নিজ শ্রমে তারা কচুরিপানা আর নেট-পাটায় আটকে থাকা পানি সরানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। শুক্রবার (৪ আগস্ট) উপজেলার ভৈরব নদের সঙ্গে যুক্ত আমডাঙ্গা থেকে মুক্তেশ্বরী নদী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার খাল অবমুক্ত করতে লেগে পড়েছেন এলাকাবাসী। প্রায় দেড় সহস্রাধিক মানুষ সাঁতরিয়ে ওঠাচ্ছেন কচুরিপানা। তুলছেন নেট-পাটা। আর এই কর্মযজ্ঞে খালে নেমে পানিতে ভিজে নেতৃত্বে রয়েছেন খোদ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মনদীপ ঘরাই।সরেজমিন অভয়নগর উপজেলার সুন্দলী এলাকার পাথরঘাটা খালে গিয়ে দেখা যায়, শ’দুয়েক মানুষ কচুরিপানা তুলছেন। এদের মধ্যে সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধ যেমন রয়েছেন, তেমন রয়েছে ১৫ বছরের কিশোর। পানিতে নেমে কাজ করছে স্কুলছাত্রী, সামাজিক সংগঠনের সদস্য, রাজনৈতিক কর্মীও।

একই চিত্র দেখা গেলো উপজেলার ওয়াবদা, ভাটবিলা, ফুলেরগাতি, রাজাপুর এলাকায়। এসব এলাকার খালের কচুরিপানা আর নেট-পাটা অপসারণে স্বেচ্ছাশ্রমে পানিতে নেমে গেছেন শত শত নারী-পুরুষ। কাজের ফাঁকে পাথরঘাটা খালে কথা হয় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান বিকাশ রায় কপিলের সঙ্গে। তিনি বলেন, ইউএনও সাহেব এই উদ্যোগ নিয়েছেন। তার একটি স্ট্যাটাস দেখে স্থানীয় যুবকরা আমাকে জানায়। এরপর আমি নিজে তার সঙ্গে কথা বলেছি। স্থানীয়দের বুঝিয়েছি। তারা সবাই নিজেদের সমস্যা নিজেরাই সমাধান করার উদ্যোগ নিয়েছি। আগামী দু’দিনের মধ্যে আমরা ২০ কিলোমিটার খাল পানি চলাচলের জন্য উপযুক্ত করে ফেলবো।

নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মনদীপ ঘরাই সাংবাদিকদের বলেন, খালে জমে থাকা কচুরিপানার কারণে পানি সরতে পারছে না। এজন্য বন্যা পরিস্থিতির দিন দিন অবনতি হচ্ছে। এ নিয়ে করণীয় ভাবতে গিয়ে আমার মাথায় কচুরিপানা অবমুক্তকরণের বিষয়টি আসে। এ কাজে স্থানীয় জনসাধারণকে সম্পৃক্ত করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি আহ্বান জানাই। চারশোজন কর্মঠ ব্যক্তিকে এ কাজে এগিয়ে আসতে আহ্বান জানাই। কিন্তু কাজে এসে দেখি দেড় হাজার ছাড়িয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, আশা করছি আমরা আমাদের পরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারবো। কাজ শেষে দুপুরে একসঙ্গে খিচুড়ি ও ডিম ভাজি খাওয়ার আয়োজন করেছি। এছাড়াও অংশগ্রহণকারী সবাইকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্বীকৃতি সনদ দেওয়া হবে।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জলাবদ্ধ অঞ্চলের অভয়নগর অংশের সীমানা খাল ও ডুমুরিয়া খাল কচুরিপানায় এতোটাই ভরে গেছে যেখান দিয়ে পানি সরতে পারছে না। এই কচুরিপানা অপসারণে শুক্র ও শনিবার কাজ করবে দেড় সহস্রাধিক স্বেচ্ছাসেবী। যাদের মধ্যে রয়েছেন শিক্ষক, সাংবাদিক, কবি, লেখক, জনপ্রতিনিধি, শ্রমজীবী, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক সংগঠক, এনজিও কর্মী, মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্র-ছাত্রী, সমাজসেবক, নারী নেত্রী, সরকারি, বেসরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ স্থানীয় সাধারণ মানুষ।

এর আগে বৃষ্টিতে ভিজে খালের নেট-পাটা উচ্ছেদে নামেন ইউএনও মনদীপ ঘরাই। এতে দুর্গতদের আস্থা অর্জন করেন তিনি। অভয়নগর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগ দিয়ে তিনি অফিস দালালমুক্ত করেন। ভূমি অফিসের মধ্যে অরক্ষিত জায়গা পরিপাটি করে গড়ে তোলেন মুক্তিযুদ্ধ অঙ্গন। যেখানে যশোরের মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র ও ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে।

হারুন-অর-রশীদ । ফরিদপুর প্রতিনিধি