নির্যাতনের পরেও অনেকের কাছে তুফান ছিল ‘সোনার ডিমপাড়া হাঁস’

বগুড়ায় ধর্ষিতা কিশোরী ও তার মায়ের মাথা ন্যাড়া করার ঘটনায় আলোচিত তুফানের ভাই মতিনের আস্তানায় চলত বিচার। প্রতি রাতেই কারও না কারও ওপর চালানো হতো বর্বর নির্যাতন। প্রতিদিন বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চকসূত্রাপুরে তার ‘নিরাপদ দুর্গ’ খ্যাত আস্তানায় শহরের জায়গাজমিসহ নানা বিষয় নিয়ে বিচারের আয়োজন হতো। পাশাপাশি মদ-জুয়ার রমরমা আসরও বসত সেখানে। অন্যদিকে ছোট ভাই তুফান গোটা শহর চষে বেড়াত তার হোন্ডা বাহিনী নিয়ে। শহরের যে কোনো প্রান্তে ত্রাসের রাজত্ব করে অন্যের জমি দখল, বিচার, সালিস, সন্ত্রাস সৃষ্টি, ছিনতাই, মাদক বাণিজ্যসহ টার্গেট কিলিংয়ের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ে সে।

জেলা শ্রমিক লীগের প্রভাবশালী একটি গ্রুপের তত্ত্বাবধানে ফুলে-ফেঁপে বেড়ে ওঠে তুফান সরকার। বগুড়ায় বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে এক কিশোরী শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের পর ধর্ষিতা ও তার মাকে অমানবিক নির্যাতনসহ মাথা ন্যাড়া করার ঘটনায় অভিযুক্ত তুফান সরকার গ্রেফতার হওয়ার পর থেকেই তার অপরাধজগতের নানা অজানা কাহিনী বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে।

জেলায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী অঙ্গসংগঠনের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে রয়েছে তুফানের সুসম্পর্ক। তুফান সরকার ২০১৫ সালে শহরের চকসূত্রাপুর এলাকায় বাণিজ্য মেলার নামে প্রায় দেড় বছর জুয়া পরিচালনা করে। অভিযোগ রয়েছে, সেখান থেকেই কয়েক কোটি টাকা আয় করে সে। চোরাই গাড়ি কেনাবেচারও অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। প্রায় দুই বছর বগুড়া শহরে অন্তত ১০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা চাঁদাবাজি করেছে সে। তার স্টিকার ছাড়া কোনো রিকশা সড়কে চলতে পারত না। প্রতিটি রিকশায় এককালীন দেড় হাজার টাকা ও দৈনিক ২০ টাকা চাঁদা নেওয়া হতো। শুধু ব্যাটারিচালিত রিকশা থেকেই প্রতিদিন তুফানের আয় ছিল অন্তত ১০ হাজার টাকা।

ধর্ষিতা কিশোরী ও তার মায়ের মাথা ন্যাড়া করার পর আলোচিত দুই ভাই তুফান ও মতিন সরকারের পরিবারে গ্রেফতার আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। পরিবারের সদস্যরা রাতে কেউ বাড়িতে থাকছে না। সংবাদকর্মীদের সঙ্গে কেউ কোনো কথাও বলছে না। বগুড়া শহরের চকসূত্রাপুর এলাকায় বসবাসকারীরাও কেউ আর মুখ খুলছেন না। তুফান জামিনে মুক্ত হয়ে ফিরলে আবারও ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করবে এই ভয়ে এলাকাবাসী ভীত হয়ে আছেন। তুফান সরকারের বড় ভাই মঙ্গলবার রাতে বগুড়া শহর যুবলীগ থেকে বহিষ্কৃত আবদুল মতিন সরকারও গ্রেফতার এড়াতে গা ঢাকা দিয়েছে।

২০০০ সালের আগেই মতিন বগুড়া শহরে সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত পায়। পাড়ার ছিঁচকে সন্ত্রাসী মতিন বগুড়া জেলা যুবলীগের কর্মী হিসেবে কর্মকাণ্ড শুরু করে। যুবলীগের নাম-পরিচয়ে চকসূত্রাপুর এলাকায় দাপটের সঙ্গে মাদকের ব্যবসা চালিয়ে যেতে থাকে সে। মাদকের ব্যবসা করে অল্প সময়ের মধ্যে সে অবৈধ টাকার কুমির হয়ে যায়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুই ভাই তুফান সরকার ও মতিন সরকার রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় শ্রমিক লীগ ও যুবলীগের পদ বাগিয়ে নেয়। পর্যায়ক্রমে আবদুল মতিন বগুড়া শহর যুবলীগের যুগ্ম-সম্পাদক (বর্তমানে বহিষ্কৃত) ও ছোট ভাই তুফান সরকার বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক (বর্তমানে বহিষ্কৃত) হয়ে যায়। তুফান সরকারের পেছনে কাজ করেন জেলা শ্রমিক লীগের দাপুটে নেতারা। দুই ভাই দুই পদ নিয়ে দলের পরিচয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। ত্রাসের রাজত্ব করে অন্যের জমি দখল, বিচার, সালিস, সন্ত্রাস, ছিনতাই, মাদক, এমনকি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গেও তারা জড়িয়ে পড়ে। বাবা মজিবর সরকার ছিলেন রিকশাচালক। অথচ তার দুই সন্তানই মাদক বিক্রি করে কিনেছে দামি একাধিক গাড়ি।

তুফান সরকার ২০১৫ সালে ফেনসিডিল ও বিপুল অঙ্কের টাকাসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়। পরে হাজত খাটার পর জামিনে মুক্ত হয়। মাদক ব্যবসা থেকে নিজেকে কিছুটা আড়াল করে গঠন করে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মালিক সমিতি। এরপর শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে অর্ধশতাধিক কর্মীকে লাঠি হাতে রিকশা থেকে চাঁদা তোলার দায়িত্ব দেয় সে। তার লোকজন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ধরে চকসূত্রাপুরে তুফানের আস্তানায় নিয়ে যেত। এরপর সমিতিতে ভর্তি বাবদ আদায় করা হতো তিন হাজার টাকা। এ ছাড়া শহরে চলাচলের জন্য প্রতিদিন অটোরিকশা থেকে আদায় করা হতো ২০ টাকা করে চাঁদা। এভাবে ছয় হাজারের বেশি অটোরিকশা থেকে আদায় করা হয়েছে দুই কোটি টাকার ওপরে। আর এখান থেকেই আঙুল ফুলে কলাগাছে পরিণত হয় তুফান। চকসূত্রাপুরে বিল্ডিং বাড়ি, দুটি বিলাসবহুল প্রাইভেট কার এবং শহরের চকজাদু সড়কে অন্যের জমি দখল করে কোটি টাকা ব্যয়ে দোকানের মালিক বনে যায় তুফান সরকার।

২০১৪ সালের নির্বাচনের পর মতিন কৌশল পাল্টিয়ে চামড়া ব্যবসায়ী ও ট্রাক মালিক সমিতির পদ বাগিয়ে নেয়। আর এই দুই পদকে পুঁজি করে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে সে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে এলাকায় জায়গাজমি দখল থেকে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে মতিন। তার প্রভাব লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ায় শুধু বগুড়া শহর নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে জমিজমার বিচার নিয়ে লোকজন আসতে থাকে মতিনের কাছে। প্রতিদিন বিকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চকসত্রাপুরে তার আস্তানায় সালিস চলত। পাশাপাশি সেখানে বসত মদ ও জুয়ার আসর।

উল্লেখ্য, ১৭ জুলাই কলেজে ভর্তি করার কথা বলে কিশোরীকে কৌশলে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে তুফান সরকার। এ ঘটনার পর ২৮ জুলাই দুপুরে ওই এলাকার পৌর কাউন্সিলর রুমকি ও তার সহযোগীরা বিচারের নামে ওই কিশোরী ও তার মাকে ধরে নিয়ে আটকে রেখে মারধর করে মাথা ন্যাড়া করে দেয়। বগুড়া সদর থানায় এসব ঘটনায় কিশোরীর মা মুন্নী বেগম বাদী হয়ে অপহরণ, ধর্ষণ ও মারধরের অভিযোগে মামলা করেন।