দুই ভাই মিলে তৈরি করেছিল বগুড়ার অপরাধজগৎ

দুই ভাই শহরে চলাফেরা করেন দলবল নিয়ে। বগুড়া শহরের সব মাদকের ঘাঁটি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে। বগুড়ার সদর থানার পাশেই তালুকদার মার্কেট। স্টেশনারি দোকানে ঠাসা। মাস তিনেক আগে এই মার্কেটের একটি দোকান হঠাৎ বেদখল হয়ে যায়। দোকানের সামনে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেওয়া হয় ‘যেকোনো সমস্যার জন্য যোগাযোগ করুন’, নিচে তুফান সরকারের নাম ও ফোন নম্বর। 

ঘটনার শিকার এই দোকানি এ নিয়ে এখন আর কিছু বলতে চান না। পরে পানির দামে তিনি দোকানটি বিক্রি করে দেন। কোনো প্রতিবাদ করতে পারেননি। বগুড়ার স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলেন না। তাঁরা শহরে চলাফেরা করেন দলবল নিয়ে। বগুড়া শহরের সব মাদকের ঘাঁটি তাঁদের নিয়ন্ত্রণে। এর সঙ্গে আছে দখল আর চাঁদাবাজি।

তুফান

২৪ বছর বয়সী তুফান পারিবারিকভাবে ছোট পুঁজির চামড়ার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাঁর বড় ভাই যুবলীগের নেতা মতিন সরকারের মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। এলাকার অনেক কিছুই তাঁদের নিয়ন্ত্রণে। দুই ভাইয়ের হাতেই বগুড়ার অপরাধজগৎ।

ভুক্তভোগী শ্রমিকেরা জানান, তুফান ও তাঁর লোকজন মোটর শ্রমিক ইউনিয়ন, পৌর টোল, পার্কিংসহ বিভিন্ন খাতে প্রতিদিন সিএনজিচালিত প্রতিটি অটোরিকশা থেকে ৫০ টাকা, চার্জার ইজিবাইক থেকে ৬০ টাকা এবং চার্জার ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ভ্যান থেকে ২০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করতেন। প্রতিটি রিকশা ও ভ্যানের মালিককে সমিতির সদস্যভুক্ত হতে আগেই ১ হাজার ৮০০ টাকা করে দিতে হতো। রাতে শহরের সাতমাথা, চারমাথা, তিনমাথা ও মাটিডালি মোড়ে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বাস, কোচ ও ট্রাক থেকে ২০০ টাকা করে আদায় করতেন। এ ছাড়া শহরতলীর চারমাথায় লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্যরা দিনভর বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা পিকআপসহ অন্যান্য যানবাহন থামিয়ে প্রকাশ্যে চাঁদা তুলতেন। এই চাঁদাবাজির একটা অংশ অসাধু পুলিশ, রাজনীতিক, শ্রমিকনেতা ও দালালদের পকেটে যেত বলে অভিযোগ আছে।

বগুড়া জেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তুফানের অপকমের্র বিষয়টি নিয়ে কাউকে মুখ দেখাতে পারছি না। তাঁর সব অপকর্ম জানার পরও প্রভাবশালী কোনো কোনো নেতার আশীর্বাদ থাকায় এত দিন নিজেও অসহায় ছিলাম।’

বগুড়ার পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, অটোরিকশা থেকে তুফান সরকারের চাঁদাবাজি ইতিমধ্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ছাত্রী ধর্ষণ ও নির্যাতনের অভিযোগ পাওয়ার পরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্য কোনো অপরাধে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ মিললে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

২০১২ সালের ৪ এপ্রিল তুফানকে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে তিনি জামিনে বেরিয়ে আসেন। একই বছরের ২০ জুলাই একটি হত্যাচেষ্টার মামলায় তুফান এবং তাঁর তিন ভাই ঝুমুর, ওমর ও সোহাগ গ্রেপ্তার হন। তবে কোনোবারই তাঁদের বেশি দিন জেলে কাটাতে হয়নি।

বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল বলেন, ছাত্রী ধর্ষণ ও নির্যাতনের দুটি মামলাসহ তুফান সরকারের বিরুদ্ধে হত্যা, হত্যাচেষ্টা, মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধে পুলিশের নথিতে ছয়টি মামলার তথ্য রয়েছে। ২০১৫ সালে র‌্যাব কয়েক শ বোতল ফেনসিডিলসহ তুফান সরকারকে তাঁর বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছিল। ২০১৩ সালে যুবদলের নেতা ইমরান হত্যা মামলার আসামি ছিলেন তিনি। ইমরানের মা তখন তুফান ও তাঁর ভাইদের জড়িত থাকার অভিযোগ করেন। এখন ইমরানের মা এ নিয়ে কোনো কথা বলতে চান না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তুফানের স্ত্রী ও নিজের নামে দুটি ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে। শহরের চকসূত্রাপুর চামড়া গুদাম এলাকায় পাঁচতলাবিশিষ্ট নির্মাণাধীন বাসা। ঢাকা ও বগুড়ার অভিজাত এলাকায় রয়েছে আরও দুটি ফ্ল্যাট। সম্প্রতি শহরের চকযাদু লেনে কোটি টাকা ব্যয়ে চালু করা হয়েছে ‘তুর্য সেনেটারি স্টোর’ নামের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দীন এর উদ্বোধন করেন। এ বিষয়ে মমতাজ বলেন, ‘আমি চেম্বারের সভাপতি ছিলাম। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উদ্বোধন তো করতেই পারি।’ বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম আছাদুর রহমান বলেন, তুফান সরকারের মতো লোকজনকে যাঁরা দলীয় পদে বসান, ছাত্রী নির্যাতনের এই ঘটনায় তাঁরাও সমান দায়ী।

মতিন সরকার

২০১২ সালের ২৪ আগস্ট যুবলীগের নেতা মতিনকে চামড়া গুদাম লেনের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে ফেনসিডিল, বিয়ার, হেরোইন, বিদেশি চাকু, জুয়া খেলার সরঞ্জাম, ১০ লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তার করে র‍্যাব। পরদিন র‌্যাবের তৎকালীন অধিনায়কের অপসারণ দাবিতে শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে যুবলীগ।

তখন পুলিশ জানিয়েছিল, মতিন শহরের শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাঁর বিরুদ্ধে সদর থানায় ছয়টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে ২০০১ সালের একটি অস্ত্র মামলায় তাঁর ২৭ বছরের কারাদণ্ড হয়েছে। এ ছাড়া ২০০৬ সালে তিনটি, ২০০৩ সালে একটি এবং ২০০১ সালেও দুটি মামলা হয়। এ পর্যন্ত পুলিশ তাঁকে চারবার, র‌্যাব দুবার এবং যৌথ বাহিনী একবার গ্রেপ্তার করেছে।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ১৯৯৮ সালের ১৮ জুন নুরানী মোড়ে খুন হন গোলাম রসুল। এই হত্যাকাণ্ডে মতিনের নাম আসে। ২০০১ সালে চকসূত্রাপুরে অভ্যন্তরীণ কোন্দলে খুন হন মতিনের ঘনিষ্ঠ মুন্সি উজ্জ্বল। মাটিঢালি বাণিজ্য মেলার মাঠে ২০১১ সালে খুন হন যুবলীগের নেতা শফিক চৌধুরী। এ ঘটনায়ও মতিনের নাম আসে। ২০১২ সালের ২ ডিসেম্বর যুবদলের নেতা ইমরান হত্যার প্রধান আসামি ছিলেন মতিন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাঁকে অভিযুক্ত করেনি।

এলাকার বাসিন্দারা জানান, মতিনকে রাজনীতিতে আনেন জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মঞ্জুরুল আলম। কিন্তু তিনি এখন তাঁর পক্ষে নেই। মতিন এখন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মমতাজ উদ্দিনের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।

মতিনের সঙ্গে কথা বলার জন্য গতকাল তাঁর চামড়াপট্টির বাসায় গিয়ে শোনা যায়, তিনি ভেতরে আছেন। কিন্তু সাংবাদিক শুনে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।