কুড়িগ্রামের শত শত মানুষ ভারতে কারাবন্দী

কুড়িগ্রামের শত শত মানুষ আটকে আছে ভারতের বিভিন্ন কারাগারে। এদের মধ্যে কাজের সন্ধানে গিয়ে গিয়ে আটক, পাচারের শিকার হয়ে আটক এবং মাদক পাচার করতে গিয়ে আটকের সংখ্যাই বেশী। কিন্তু বিভিন্ন আইনি জটিলতায় তারা ফিরতে পারছে না দেশে।

আটকদের স্বজনদের কাছে জানা যায়, আটক ব্যক্তিদের বেশীর ভাগই জেলার ফুলবাড়ী উপজেলার সীমান্ত দিয়ে ২০১২-১৩ সালে ভারতে পাড়ি জমান। আবার কেউ বা পাচারের শিকার হন। অনেকের ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা ভারতের জেলে আটক রয়েছেন। বর্ণনা দিতে গিয়ে তারা অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। ওই স্বজনরা জানিয়েছেন, আটকরা ছিটমহলগুলো স্বাধীনের আগেই বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দা দেখিয়ে দালালের মাধ্যমে ফুলবাড়ী উপজেলার চন্দ্রখানা, পূর্বচন্দ্রখানা, নাগদাহ, নওদাবস,বড়ভিটা, ঘোঘারকুটি, কুটিচন্দ্রখানা, আজোয়াটারী, ধর্মপুর, ভাঙ্গামোড়, কাশিপুর এলাকার নারী-পুরুষ ও শিশুদের প্রলোভন দেখিয়ে ভারতের বিভিন্ন ইটভাটায় কাজ দেওয়ার জন্য কৌশলে কাঁটাতারের বেড়া টপকে পাচার করে দেয়। আবার অনেকেই নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছতে পারলেও কাজ শেষে ফেরার পথে ভারতীয় দালালরা কৌশলে বিএসএফ সীমান্তে এবং পুলিশের হাতে বিভিন্ন রেল ও বাস স্টেশনে ধরিয়ে দেয়। পরে তাদের জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় দালালরা মজুরদের কাছে যা কিছু থাকে তা লুট করেও নেয়। নারী ও পুরুষকে আলাদা আলাদা রেখে নারীদের সম্ভমহানির মত দুঃখজনক ঘটনাও ঘটায়। তারা আরো বলেন, বাংলাদেশি ওই নারী-পুরুষ ও শিশুদের ভাগ্যে আইনি সহযোগিতা পাওয়ার যে অধিকার, তা থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে অনির্দিষ্টভাবে তাদের ভারতের জেলে থাকতে হচ্ছে।

ফুলবাড়ী উপজেলার পানিমাছকুটি গ্রামের নুরুল হকের ছেলে আব্দুল খালেক, আজোয়াটারী গ্রামের মৃত তবারক আলীর ছেলে একরামুল হক, একই গ্রামের মৃত ওছমান আলীর ছেলে সেরাজুল ইসলাম, নওদাবস গ্রামের বরকত আলীর ছেলে আব্দুস ছামাদ, আব্দুস ছামাদের স্ত্রী সামিনা বেগম, সামাদের শিশু সন্তান মুছা, শিমু (৯), নাগদাহ গ্রামের নাজমুল (১৫), শাহবাজা ঘোঘার কুটি গ্রামের আবুল ব্যাপারীর শিশু ছেলে স্বাধীন মিয়া (১২), মাইদুল ইসলাম (১৮), বড়ভিটা গ্রামের সৈয়দ আলীর ছেলে মোঃ রোস্তম আলী (২৬), পূর্ব-চন্দ্রখানা গ্রামের বকুল পোদ্দারের ছেলে ফারুক পোদ্দার (২৬), তার স্ত্রী আফরোজা (২৩), ১ বছরের শিশু সন্তান আব্দুল্লাহ, ঘোঘারকুটি গ্রামের মৃত আনোয়ারের ছেলে ছায়াদ আলী (৫২), নওদাবস গ্রামের আবুবকর সিদ্দিকের ছেলে আব্দুল রাজ্জাক (২৯), একই গ্রামের আলেপ উদ্দিন (৫৯), নাগদাহ গ্রামের ফজলু মিয়ার ছেলে বেলাল হোসেন (১৫), কামালপুর দেবীরপাঠের কুদ্দুস আলীর ছেলে সাইদুল হক (৩৯), তার স্ত্রী শাহিনুর বেগম (৩৬), জমশেদ আলীর ছেলে খোরশেদ আলম (৩২) আব্দুল কাদেরের ছেলে মহির উদ্দিন (৩৩), বেলাল হোসেনের ছেলে লাভলু মিয়া (২৯), লাভলু মিয়ার স্ত্রী জাহানারা (২৬), শিশু সন্তান লাভনী (৪ বছর), মৃত আব্দুল কাদেরের ছেলে হাসেন আলী (৫১),তার স্ত্রী মনোয়ারা বেগম (৪০), হোসেন আলীর ছেলে হেলাল হোসেন (৩৭), স্ত্রী রুজিনা বেগম, শিশু সন্তান রাব্বি, আব্দুর রশিদের ছেলে হাফিজুর রহমান (২৩) এদের মধ্যে অন্যতম।

জানা গেছে, এরই মধ্যে দেড় বছর ধরে ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শুভায়ন শিশু অবজার হোমে আটক থাকার পর উপজেলার কামালপুরের হাসেন আলীর ছেলে রাজু ও একই গ্রামের হোসেন আলীর ছেলে দুলাল বাড়িতে ফেরত আসে। তারা জানায়, তাদের পরিবারের আরও পাঁচ গ্রামের তিনজন ভারতের কারাগারে আটক রয়েছে। এর মধ্যে তিনজন শিশুও আছে। অন্যদিকে, ২০১২-১৩ সালে জানুয়ারি মাসে উপজেলার কাশিপুর সীমান্ত দিয়ে পাচার করে দেয় দালালরা। তারা দিলির গতমপুর, রাজস্থানের সুবাসের ভাটা, গাজিয়াবাদের ভোটা গাঁও, হসসং, ডাসনা গ্রাম এলাকার নির্মাণাধীন বিল্ডিং কেউ বা ইটভাটায় কাজ শেষে ভারতের পশ্চিম বাংলার বালুরঘাটের হিলি ও কোচবিহার জেলার দিনহাটা থানার সীমান্তবর্তী কিশামত কড়লা এলাকা দিয়ে তাদের ২০১৪ সালের ডিসেম্বর, ২০১৫ সালের জুলাই ও ২০১৭ জুন মাসের শেষের দিকে এপারে দেওয়ার সময় বিএসএফ ও ভারতীয় পুলিশ আটক করে। এ সময় লোমহর্ষক নির্যাতন চালানো হয় আটকদের ওপর। এখন তারা বালুরঘাট, দিনহাটা, কোচবিহার জেলে রয়েছেন।

আটকের সংখ্যা জানা না গেলেও ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার বালুরঘাট শুভায়ন শিশু অবজার হোমে বেশ কিছু শিশুও আটক রয়েছে। এদিকে ২০১৫ সালের অক্টোবর মাসে দালালর মাধ্যমে কাঁটাতারের বেড়া টপকিয়ে ভারতে পাচার করে দেয়ার সময় ভূরুঙ্গামারী উপজেলা সীমান্তের ওপারে সাহেবগঞ্জ বিএসএফ হাজরা নামে কামালপুরের ২৪ বছরের যুবতিকে আটক করে নির্যাতন চালিয়ে পুলিশে স্থানান্তর করে। তিনি এখন ভারতের কোন জেলে রয়েছেন, তা জানাতে পারেনি তার স্বজনরা। আটকদের স্বজন রানা মিয়া, আবুল হোসেন ব্যাপারী, মিজানুর রহমান জানান, ফুলবাড়ী উপজেলার দেড় শতাধিক নারী পুরুষ ও শিশু আজো ভারতের আলিপুরদুয়ার, মাতাভাঙ্গা, মেখলিগঞ্জ, কোচবিহার, দিনহাটা, তুফানগঞ্জ, জলপাইগুড়ি সেন্টাল জেল, শিলিগুড়ি, ইসলামপুর, কলিকাতা ও মুর্শিদাবাদ জেল ও শিশু অবজার হোমে আটক রয়েছেন। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিলুপ্ত ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দিপ্তীমান সেনগুপ্ত বলেন, এটি একটি জটিল বিষয়। আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত বিষয়টি নিষ্পত্তি করা যায় সেটি করা হচ্ছে। তবে দু’দেশের সরকারকে মানবিকতার দিকে তাকিয়ে আটকদের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানাই।

বিলুপ্ত বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা খান ভারতীয় সহকারী হাই-কমিশনার সন্দীপ মিত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানান, তার সঙ্গে কথা হলে তিনি জানিয়েছেন, যেহেতু বাংলাদেশ ভারতের অভ্যন্তরের ছিটমহালগুলো নিয়ে একটা রেজাল্ট হয়েছে। ২০১৫ সালের ৩১ জুলাই মধ্যরাতে দু’দেশের সরকার কার্যকরও করেছে। বাংলাদেশের জনমত জরিপে তারা এখন বাংলাদেশের নাগরিক। ছিটমহল এখন পরিচয় নেই। বিষয়টি আইনগত। তবে তিনি আটকদের দেশে ফিরে আনার জন্য দুই দেশের সরকারের আইনি সহযোগিতা কামনা করেছেন।

মোঃ মনিরুজ্জামান, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি