ছাত্রী ধর্ষণের আসামিদের ৩ দিনের রিমান্ড, কাউন্সিলর রুমকি ও তার মা গ্রেফতার

গত শুক্রবার বগুড়ায় সদ্য এসএসসি পাস করা এক ছাত্রীকে ধর্ষণ এবং পরে বিচারের নামে মা সহ তার মাথা ন্যাড়া করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। বর্তমানে মা ও মেয়েকে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ (শজিমেক) হাসপাতালের ফিমেল সার্জারি বিভাগে ভর্তি রয়েছে।

শুক্রবার রাতে বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সনাতন চক্রবর্তী এ ঘটনাকে পরকীয়া বললেও শনিবার নির্যাতিত তরুণীর মা বাদী হয়ে ১০ জনের বিরুদ্ধে অপহরণ ও ধর্ষণের মামলা করেন। মামলার বিবরণ থেকে জানা যায়, বগুড়া শহরের নামাজগড় এলাকায় মা ও বাবার সাথে ভাড়া বাসায় বসাবাস করে ওই কিশোরী। সে এবার বগুড়া শহরের জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করেছে। তার বাবা একজন ব্যবসায়ী। শাজাহানপুর উপজেলার রাতাইল বন্দরে তার একটি খাবারের ছোট হোটেল রয়েছে। এসএসসিতে এ প্লাস না পাওয়ার কারণে ভালো কলেজে ভর্তি হতে পারবে না বলে কিশোরীর বাড়ির পাশেই বগুড়া শহরের চকসুত্রাপুরের বাসিন্দা বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক প্রভাবশালী নেতা তুফান সরকারের (২৪) সাথে যোগাযোগ করে। কোথাও ভর্তি হতে না পারায় প্রতিবেশী আলী আজম দিপু ওই তরুণীকে শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকারের মাধ্যমে সরকারি কলেজে ভর্তি করে দেয়ার আশ্বাস দেয়।গত ১৭ জুলাই তুফান সরকার তার স্ত্রী-সন্তান বাসায় না থাকার সুযোগে ওই তরুণীকে কলেজে ভর্তি করিয়ে দেয়ার আশ্বাসে বাসায় ডেকে নেয়। কলেজে ভর্তির বিষয়ে সাহায্যের নাম করে ওই ছাত্রীকে বাড়িতে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে তুফান। অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে ওই তরুণী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়া হয়। পাশাপাশি বিষয়টি কাউকে না বলার জন্য তরুণীকে ভয়ভীতি দেখানো হয়। পরে ধর্ষণের ঘটনাটি তরুণীর মা জানতে পারেন এবং বিষয়টি এলাকায় জানাজানি হয়।

স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ লোকমুখে জানতে পারেন শ্রমিক লীগ নেতা তুফান সরকারের স্ত্রী। পরে স্থানীয় এক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সহযোগিতায় উল্টো মেয়েটিকেই এ ঘটনার জন্য দায়ী করে বিচারের নামে নির্যাতিতা ও তার মাকে ন্যাড়া করে দেওয়া হয়। এরপর তাদের এলাকা ছাড়া করার জন্য এসিড মারার হুমকি দেওয়া হয়েছে। ১৭ জুলাই ঘটা ধর্ষণের ওই ঘটনার পর শুক্রবার (২৮ জুলাই) দুপুরে তাদের চুল কেটে দিলে নির্যাতিতরা থানায় মামলা করেন। এরপর শুক্রবার রাতেই ধর্ষক হিসেবে অভিযুক্ত বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকার সহ তার তিন সহযোগী আলী আজম দিপু, আতিকুর রহমান ও রুপম হোসেনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এদিকে ঘটনার পরপরই তুফানের স্ত্রী আশা খাতুন, স্ত্রীর বড় বোন পৌর কাউন্সিলর রুমকি এবং তুফানের শাশুড়ি রুমী বেগম আত্মগোপন করেন। পরবর্তীতে মারজিয়া হাসান রুমকি ও তার মা রুমি বেগমকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রোববার রাত ৮টার দিকে বগুড়া ডিবি পুলিশের বিশেষ একটি দল পাবনা মেডিকেল কলেজ এলাকার একটি বাড়ি থেকে মা-মেয়েকে গ্রেফতার করে। তবে ওই বাড়িতেই আত্মগোপনে থাকা বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের সভাপতি তুফান সরকারের স্ত্রী আশা খাতুন ও ড্রাইভার জিতু পুলিশি অভিযানের আগেই পালিয়ে গেছে।

বগুড়ার ডিবি পুলিশের পরিদর্শক আমিরুল ইসলাম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পাবনা মেডিকেল কলেজ এলাকার একটি বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। এটি তুফান সরকারের শাশুড়ি রুমি বেগমের দুঃসম্পর্কের আত্মীয়ের বাড়ি। ওই বাড়ি থেকে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়।

গ্রেফতার হওয়ার পর কাউন্সিলর মারজিয়া হাসান রুমকি পুলিশকে জানান, বেলা ১১টার দিকে ড্রাইভার জিতুর সঙ্গে নিজের প্রাইভেটকার নিয়ে আশা তার ছেলের খাবার কেনার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। এরপর আর ফিরে আসেনি। ধারণা করা হচ্ছে সে অন্য কোনো স্থানে গাঢাকা দিয়েছে।

পালিয়ে যাওয়া প্রসঙ্গে রুমকি পুলিশকে আরও জানান, ওই তরুণী আর তার মায়ের মাথা ন্যাড়া করে দেয়ার পর পুলিশ যখন অভিযান শুরু করে তখনো তারা বাড়িতেই ছিল। পরে আশা নিজেদের প্রাইভেটকার নিয়ে এসে তাদের বের করে নিয়ে যায়। শুক্রবার রাতেই তারা পাবনা শহরে পালিয়ে আসে।

অন্যদিকে গ্রেফতারকৃত আসামিদের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানালে ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। রবিবার (৩০ জুলাই) দুপুরে বগুড়ার অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শ্যাম সুন্দর রায় তাদের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ডে নেওয়া আসামিরা হলেন-বগুড়া শহর শ্রমিক লীগের আহ্বায়ক তুফান সরকার (২৮), কসাইপাড়ার দুলু আকন্দের ছেলে আলী আজম দিপু (২৫) ও কালিতলার জহুরুল হকের ছেলে রুপম (২৪)। গ্রেফতারের পর পুলিশের হেফাজতে থাকা অন্য আসামি হলেন খান্দার সোনারপাড়ার মোখলেসার রহমানের ছেলে আতিক (২৫)। সে গ্রেফতারের পরপরই ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেওয়ায় তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করা হয়নি।

রোববার জেলা প্রশাসক নূরে আলম সিদ্দিকী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মা-মেয়েকে দেখতে যান। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তিনি মেয়েটিকে চিকিৎসা ও আইনি সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেন।