নওয়াজের পতনে ইমরানের ছক্কা!

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ পদচ্যুত হওয়ার পর পারমাণবিক অস্ত্রধারী একটি দেশের শীর্ষপদে কার্যত শূন্যতা তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে দেশটিতে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা তৈরি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগে দেশটির সাবেক ক্রিকেট তারকা থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) আগামী নির্বাচনে নওয়াজের পতনের সুবিধাভোগী হতে পারে।

দুর্নীতির অভিযোগে শুক্রবার দেশটির সুপ্রিম কোর্ট নওয়াজ শরিফকে প্রধানমন্ত্রী পদের অযোগ্য হিসেবে ঘোষণা দেয়ায় তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতার পূর্ণ মেয়াদ পূরণ করা সম্ভব হলো না পাকিস্তানি এই রাজনীতিকের। যদিও শুরু থেকেই তার ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে আনা দুর্নীতির অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক আশকারি বলেন, এটা পিটিআই; যে দলটি নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল। তাই তারা খ্যাতি এবং বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে প্রধান সুবিধাভোগী হতে যাচ্ছে। বিশ্লেকরা বলছেন, পাকিস্তানের সামরিক শাসনের ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতা সম্ভবত একটি বেসামরিক সরকারের হাতে থাকবে এবং সম্ভবত এই ক্ষমতার উত্তরাধিকারী হবে নওয়াজ শরিফেরই রাজনৈতিক দল পাকিস্তান মুসলিম লীগই (পিএমএল)-এন।

ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান উইলসন সেন্টারের বিশ্লেষক মাইকেল কুজেলম্যান বলেন, ‘পাকিস্তানের মতো বিশৃঙ্খল একটি দেশে যখন একজন প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করা হয়; তখন সেখানে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো ভালো কারণ থাকতে পারে।’ কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, সবকিছুর সমাধান হয়ে যাবে- একজন উত্তরাধিকারী নির্বাচিত হবেন এবং বর্তমান সরকার তার মেয়াদ পূরণ করবে।’

পাকিস্তানের ৭০ বছরের ইতিহাসের বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সামরিক অভ্যুত্থান এবং অস্থিতিশীলতার নজির আছে। কিন্তু সম্প্রতি জঙ্গিবাদে জর্জরিত উন্নয়নশীল দেশটিতে আশাবাদের ঢেউ দেখা যায়। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার নাটকীয় উন্নতি ও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতিবাচক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা। ২০১৩ সালের সাধারণ নির্বাচনে যখন নওয়াজ শরিফ তৃতীয়বারের মতো পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসেন; সেটি ছিল দেশটির স্থিতিশীলতার শক্তিশালী প্রতীক। শুধু তাই নয়, পাকিস্তানে নির্বাচিত এক সরকারের হাত থেকে অন্য সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রথম গণতান্ত্রিক পালাবদলও ছিল সেটি।

শরিফ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বের অযোগ্য হিসেবে ঘোষিত হয়েছেন। কিন্তু পিএমএল-এন’র প্রধান রয়েছেন তিনি। পার্লামেন্টে এই দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক হাসান আশকারি বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীকে সুপ্রিম কোর্ট ক্ষমতাচ্যুত করার পরও পাকিস্তানের সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা অব্যাহত রয়েছে।

তিনি বলেন, শরিফ দল থেকে কিছু ব্যক্তিকে সামনের কাতারে তুলে নিয়ে আসবেন। তবে অবশ্যই তাদের ব্যক্তিত্ব শরিফের মতো হবে না; যতটা শরিফের ছিল। হাসান আশকারি বলেন, কিন্তু এই মুহূর্তে আমরা বলতে পারি, বিচারের প্রথম প্রভাব হিসেবে অস্থিতিশীল হওয়ার কোনো লক্ষণ দেশে দেখা যায়নি।  দেশটিতে জাতীয় নির্বাচনের মাত্র এক বছর বাকি আছে। এই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের অপসারণের বিষয়টিকে বিরোধী দলগুলো নিজেদের পক্ষে কাজে লাগাতে পারে কি না সেই প্রশ্নও উঠছে।

দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর থেকে নওয়াজের পদত্যাগের দাবিতে বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক তারকা ক্রিকেটার ইমরান খান দলীয় ব্যানারে ব্যাপক হুমকি দিয়ে আসছিলেন। পাকিস্তানের চার প্রদেশের একটির ক্ষমতায় আছে ইমরান খান নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ। তবে দলটি ক্ষমতায় থেকেও এখনও জাতীয় রাজনৈতিক দলের কাতারে যেতে পারেনি।

আশকারি বলেন, ‘এটা পিটিআই’; যে দলটি নওয়াজ শরিফের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। তাই তারা খ্যাতি এবং বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে প্রধান সুবিধাভোগী হতে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, আগাম নির্বাচন হলে ইমরান খানের এই দলটিই মোটা দাগে সুবিধা পাবে। পিটিঅাইর প্রতিও মানুষের শক্ত সমর্থন রয়েছে। নওয়াজ ও তার পরিবারের দুর্নীতি ইস্যুতে মামলা, আন্দোলন হলেও জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ নওয়াজের পিএমএল ২০১৮ সালের জুনেই সাধারণ নির্বাচনের জন্য হাঁটবে।

তবে এ সিদ্ধান্ত পিটিআই’র জন্য গেম চেঞ্জার হবে না। দেশটির জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাসুল বখশ বলেন, এতে যে পরিবর্তন হতে পারে সেটি হচ্ছে নওযাজ শরিফ এখন আর পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নন। নওয়াজ শরিফের পদত্যাগের পর পাকিস্তানিদের প্রতিক্রিয়া ছিল নিঃশব্দ। এর একটি কারণ হতে পারে যে, নওয়াজ প্রধানমন্ত্রী না থাকলেও তার রাজনৈতিক দল পিএমএল-এন এখনো ক্ষমতায় রয়েছে। বিশ্লেষকরাও এ বিষয়ে একমত পোষণ করেছেন।