মানব সম্পদ ও অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবেঃ ড. নূর-উন-নবী

যেসব স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশ মোট প্রজনন হার বা টোটাল ফার্টিলিটি রেট কমিয়ে রাখায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে, বাংলাদেশ তার মধ্যে অগ্রগণ্য। আমাদের দেশটি মুসলিম প্রধান- এ বিষয়টিও আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞরা বিবেচনায় রাখেন।

ষাটের দশকে দুটি আন্দোলন বিশ্বব্যাপী আলোচিত ছিল- অধিক খাদ্য ফলাও ও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ। এ আন্দোলনের ঢেউ লাগে তৎকালীন পাকিস্তানে। এ দেশটির বঞ্চিত অংশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় ভালো ভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে। খাদ্য উৎপাদনেও সফলতা আসে। স্বাধীনতা পরবর্তী সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন তিন গুণের বেশি বেড়েছে। ফলে এ সময়ে জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণের বেশি হওয়ার পরও আমাদের খাদ্য সংকট থেকে কেবল রেহাই দেয়নি; মাথাপিছু খাদ্য প্রাপ্যতাও যথেষ্ট বৃদ্ধি করেছে। আলোচ্য সময়ে বাংলাদেশে মোট প্রজনন হার ৬ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। পরিবারের আকার ছোট রাখায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও সরকারের সহায়ক বহুমুখী কর্মসূচি এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। অথচ ষাটের দশকে পাকিস্তানের পশ্চিম অংশেও এ কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছিল। তখন পূর্ব পাকিস্তানের লোকসংখ্যা ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বেশি (এ কারণে জাতীয় পরিষদের ৩০০ আসনের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য ১৬২টি এবং পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ১৩৮টি আসন বরাদ্দ হয়েছিল)। কিন্তু এখন পাকিস্তানের লোকসংখ্যা বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম আমাদের ভূখণ্ডে যতটা সফল হয়েছে, পাকিস্তানে সেটা হয়নি।

বাংলাদেশ কেবল জনসংখ্যা অপেক্ষাকৃত সীমিত রাখতেই সফল হয়নি; এখানের গড় আয়ুও বেড়েছে, যা উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর কাছাকাছি। আমাদের শিক্ষার হার বাড়ছে। দেশে ছাত্রছাত্রী এখন পাঁচ কোটির মতো। বলা যায়, লোকসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ছাত্রীদের পদচারণায় মুখর। স্বাস্থ্য সেবারও উন্নতি ঘটছে। প্রত্যন্ত গ্রামেও মেলে স্বাস্থ্য সেবা। তবে সমস্যাও কম নেই। খাদ্য সংকট না থাকলেও মাঝে মধ্যে উদ্বেগ যে সৃষ্টি হয় না, তা বলা যাবে না। চলতি বছরে হাওর এলাকায় আগাম বন্যায় মাত্র ১০ লাখ টনের মতো চাল উৎপাদন কম হয়েছে। অথচ তার জেরে বাজার সাময়িক সময়ের জন্য হলেও অস্থির হয়ে উঠেছিল। খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণ দেশের সরকারকে চাল আমদানির দিকে মনোযোগ দিতে হয়। এ সুযোগে রফতানিকারক দেশগুলো চালের দাম বাড়িয়ে দেয়। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডারেও চাপ পড়ে।

আমাদের বাংলা ভাষায় যুগ যুগের প্রবাদ – মাছে ভাতে বাঙালি। ভাতের জন্য চাই চাল। খাদ্যাভ্যাসে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা পরিবর্তন ঘটছে। ফলে গমের ব্যবহার বাড়ছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বর পঞ্চম বৃহত্তম গম আমদানিকারক দেশ। আমরা চাইলেই গমের উৎপাদন বাড়াতে পারব না। এ ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা আবহাওয়া। তবে ধান, গম ছাড়াও আমরা অন্যান্য ফসল উৎপাদনে মনোযোগী হতে পারি। ডাল, সবজি, মাছ উৎপাদন বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে খাদ্য সুষম হবে। এক ফসল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার বিকল্প থাকবে।

শহরমুখী জনসংখ্যা ক্রমাগত বেড়ে যাওয়া আরেকটি বড় সমস্যা। এখন ঢাকা মহানগরে লোকসংখ্যা ২ কোটির কাছাকাছি, ২০৩৫ সালে যা সাড়ে তিন কোটি হতে পারে এমন পূর্বাভাস রয়েছে। বিশ্বে ফাস্টেস্ট গ্রোয়িং মেগাসিটির তালিকার ওপরের দিকে রয়েছে আমাদের রাজধানী ঢাকার নাম। অথচ ইতিমধ্যে এ মহানগরে ৪০ লাখ নারী-পুরুষের জীবন কাটে বস্তিতে। আমাদের দুটি সিটি করপোরেশন এডিস মশার হুমকি মোকাবেলা করতে হিমশিম খাচ্ছে। মশার প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ছে, একই সঙ্গে বাড়ছে আমাদের অসহায়ত্ব। আমরা জলাবদ্ধতা ও যানজটের শিকার। কেবল যানজটের কারণে দিনে ঢাকায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট, এমন মত বিশেষজ্ঞদের। আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে- অচিরেই ঢাকায় গাড়ির চেয়ে দ্রতগামী হবে চরণ যুগল! এ ধরনের নগরে বসবাস করা মানুষ কীভাবে সুস্থ-সবল থাকবে?

বাংলাদেশ এখন ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের সময় অতিক্রম করছে। এখন কর্মক্ষম লোকের সংখ্যা বেশি, নির্ভরশীল বয়স্ক ও শিশুর সংখ্যা কম। এটা বোনাস হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু এই পপুলেশন বোনাসকে কি আমরা ডিভিডেন্ডে পরিণত করতে পারছি? এটা করার জন্য যথোপযুক্ত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ- মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের নিশ্চয়তা। আমাদের উন্নয়ন ঘটছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের ওপরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে। সে তুলনায় কর্মসংস্থান বাড়ছে না। শিক্ষার প্রসার ঘটছে, কিন্তু উচ্চশিক্ষিত বিপুলসংখ্যক নাগরিক বেকার। আমাদের পোশাক শিল্প যথেষ্ট এগিয়েছে। ৪০ লাখের বেশি লোক এ শিল্পে কাজ করছে, যাদের বেশির ভাগ নারী। কিন্তু এই শিল্পের উদ্যোক্তারা বলছেন, টেকনিক্যাল কর্মীর ঘাটতি প্রকট এবং তা পূরণে শ্রীলংকা ও ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। এদের পেছনে ব্যয় করতে হচ্ছে পোশাক রফতানি থেকে আয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ। অথচ উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করলে দেশের ভেতরেই এ ধরনের শ্রমশক্তি আমরা তৈরি করতে পারি।

আমাদের অর্থনৈতিক বিকাশে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ খাত জনশক্তি রফতানি। প্রতি বছর লাখ লাখ নাগরিক দেশের বাইরে যাচ্ছে এবং তারা রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছে। প্রায় এক কোটি নাগরিক দেশের বাইরে কাজ করছে- এমন তথ্য সংবাদপত্রে দেখেছি। তাদের কারণে দেশের শ্রমবাজার এবং খাদ্য ও বাসস্থানের ওপর চাপ কম থাকছে। প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ বিনিয়োগ হচ্ছে এবং তাতেও অনেক পরিবার উপকৃত হচ্ছে। প্রবাসে দক্ষ লোকের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু আমরা তো অভ্যন্তরীণ দক্ষ কর্মী চাহিদাই পূরণ করতে পারছি না। আমরা মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করছি, তার অপরিহার্য শর্ত- দেশের ভেতরে ও বাইরের বাজারের জন্য দক্ষ কর্মী বাহিনী তৈরি করা। আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত যেসব পেশা রয়েছে তার বেশির ভাগ নিম্ন আয়ের। এখান থেকে উত্তরণ ঘটাতে হবে উচ্চ আয়ের পেশায়। এ জন্য অর্থনীতির কাঠামোতে যেমন পরিবর্তন চাই, তেমনি চাই উপযুক্ত প্রশিক্ষণ। তাহলে ১৬০০ ডলারের মাথাপিছু আয়ের দেশটিকে প্রথমে ৬-৭ হাজার ডলার এবং আরও কিছু সময় পরে ১৪-১৫ হাজার ডলার আয়ের দেশে পরিণত করা সম্ভব। আগেই বলেছি, আমাদের বর্তমান সময়টি গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে উৎপাদক বেশি, ভোক্তা কম। এ সময়টিকে কাজে লাগাতে না পারলে ভবিষ্যতে খেসারত দিতে হবে, যখন উৎপাদক কম হবে, ভোক্তা বেশি হবে।

আমাদের কিছু উদ্বেগজনক সংকেত মিলছে। প্রথম আলোর জরিপ বলছে, তরুণ-তরুণীদের বড় অংশ অবসর সময় কাটাচ্ছে টেলিভিশন দেখে। ইন্টারনেট-ফেসবুকে তারা আসক্ত। এ ধরনের অভ্যাস খারাপ নয়, কিন্তু মাত্রা ছাড়ালে বিপদ। কারণ তাতে যৌবনের সৃজনশীল সময়ের অপচয় ঘটে। তরুণদের মধ্যে বিজ্ঞানী হওয়ার ঝোঁক কম। শিল্প-সাহিত্য চর্চায় উৎসাহ কম। তারা আয়েশে সচ্ছল জীবন চায়। এ ধারা থেকে বের হয়ে আসতে চাই বিপুল আয়োজন এবং এর ক্ষেত্র প্রধানত হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এ জন্য প্রণোদনা দিতে হবে। মানব সম্পদ ও অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। নারীর ক্ষমতায়নে আমাদের অর্জন প্রশংসিত। তাদের কাজের সুযোগ বাড়ছে বলেই টোটাল ফার্টিলিটি রেট কমছে। এ রেট আরও কমাতে হবে। এখন এ হার ২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং এক ধরনের স্থবিরতা বিরাজ করছে বলে জরিপে তথ্য দিচ্ছে। এ হার কমাতে না পারলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা ২২ কোটি ছাড়িয়ে যেতে পারে। ছোট্ট ভূখণ্ডে এ চাপ আমরা কীভাবে সামলাব? এখন তাই দুটি জরুরি করণীয়- প্রজনন হার কমানো এবং বিদ্যমান জনশক্তির দক্ষতা বাড়ানো। শিক্ষার হার বাড়ছে- এটা ভেবে তুষ্ট থাকলে চলবে না। নারীদের শিক্ষার জন্য যথেষ্ট আয়োজন সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু এদিকেও বাড়তি নজর দিতে হবে। বাল্য বিয়ে রোধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ বাড়ছে। জনসচেতনতাও বাড়ছে। কিন্তু এখনও যে ‘শিশুরাই জন্ম দিচ্ছে শিশু’। এ চিত্র উদ্বেগের।

উদ্বেগের আরও বিষয় রয়েছে। মাদকদ্রব্যের ব্যবহার উদ্বেগজনক। ফেনসিডিল নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল বহু বছর। এখন যুক্ত হয়েছে ইয়াবা এবং এ ধরনের আরও ভয়ঙ্কর কিছু মাদক। এর উৎস দেশের বাইরে। কিন্তু বাংলাদেশের ভেতরে এ পণ্যের রমরমা ব্যবসা করছে বাংলাদেশেরই লোকেরা। প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী এ সমস্যা অবগত। কিন্তু কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, সেটা অজ্ঞাত। নারী নির্যাতনের অনেক খবর মিলছে সংবাদপত্রে। জঙ্গিবাদ সমাজে ভিত করে নিচ্ছে। শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশও তাতে শামিল হচ্ছে। এক সময় মনে হতো, মাদ্রাসার মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতি নজর রাখলেই চলবে। কিন্তু এখন সচ্ছল পরিবারের সন্তানেরা যেসব প্রতিষ্ঠানে বিপুল অর্থ খরচ করে পড়াশোনা করছে, সেখানেও নজর বাড়ানোর প্রবল তাগিদ তৈরি হয়েছে।

তারুণ্য শক্তি- এটা কেবল কথার কথা নয়। মুক্তিযুদ্ধ করেছে তারা। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য তারাই দিনের পর দিন রাজপথে থেকেছে। উন্নত বাংলাদেশের সংগ্রামেও তারাই প্রধান শক্তি। এ জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে কোনো কার্পণ্য করলে চলবে না।

অধ্যাপক ড. এ কে এম নূর-উন-নবী
অধ্যাপক ড. এ কে এম নূর-উন-নবী

জনসংখ্যা বিশেষজ্ঞ; অধ্যাপক ড. এ কে এম নূর-উন-নবী, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়