আজ প্রকাশিত হবে একাদশতম নির্বাচনের রোডম্যাপ

সব দলকে নির্বাচনে আনা ও সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নিয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত কাজের পথনকশা (রোডম্যাপ) আজ রোববার প্রকাশ করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। তবে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মতভিন্নতা দূর হয়নি। উক্ত এই ইস্যুতে সমঝোতার কোনো উদ্যোগও দেখছেন না রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।

রাজনৈতিক এই মতবিরোধের মধ্যেই পথনকশা অনুযায়ী জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কাজ আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের পথনকশায় নির্বাচনে সব দলের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি, অর্থ ও পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধে আইন সংশোধন, নির্বাচনী আইন ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ আইন যুগোপযোগী করার প্রস্তাব থাকছে। কমিশন আশা করছে, তাদের ওপর আস্থা রেখেই সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে।

পথনকশার শুরুতেই থাকছে সংলাপ। ৩১ জুলাই থেকে পরবর্তী তিন মাস অংশীজনদের সঙ্গে সংলাপ হবে। রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ, নারীনেত্রী, গণমাধ্যমকর্মী, নির্বাচন পর্যবেক্ষক, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে আলোচনা হবে। নির্বাচনী আইনের কিছু ধারা সংশোধন, জনসংখ্যার পাশাপাশি ভোটার অনুপাত ও আয়তনের ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ, নির্বাচনে সেনা মোতায়েনের প্রক্রিয়া এবং ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করা না-করা নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে মত পার্থক্য স্পষ্ট। আওয়ামী লীগ চায় ভোট গ্রহণে ইভিএম ব্যবহৃত হোক। আর বিএনপি এর বিপক্ষে। অন্যদিকে বিএনপি ২০০৮ সালের আগের অবস্থায় সংসদীয় আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ ও ভোটের দিন নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো করে সেনা মোতায়েন চায়। এ দুটি ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ বর্তমান ব্যবস্থার পক্ষে। অবশ্য কমিশন মনে করছে, দলগুলোর মধ্যে যে বিষয়গুলোতে মতভিন্নতা আছে, সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে গ্রহণ ও বর্জন করলে সমস্যার সমাধান হবে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদা গত জুন মাসে বলেছেন, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন করতে চায় না কমিশন। পথনকশায়ও বলা হয়েছে, মানুষ একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের অপেক্ষায় রয়েছেন।

অবশ্য সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সভাপতি বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, প্রধান দলগুলোর মধ্যে মূলত নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে, যার সমাধান ইসির হাতে নেই। তবে এখানে তাদেরও একটা ভূমিকা আছে। সংস্থাটি নির্বাচন পরিচালনা করবে। তাই নির্বাচনকালীন কোন ধরনের সরকার ক্ষমতায় থাকলে তাদের পক্ষে সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন পরিচালনা করা সম্ভব, সে বিষয়টি তুলতে হবে। প্রয়োজনে সে ধরনের সরকারের সুপারিশ করতে হবে। তাহলে তাদের প্রতি সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থা বাড়বে।

অগ্রাধিকার প্রাপ্ত সাতটি কাজ

প্রায় দেড় বছর মেয়াদি এই পথনকশায় সাতটি কাজকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এগুলো হলো বিদ্যমান নির্বাচনী আইনকানুন ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ-সংক্রান্ত আইন পর্যালোচনা ও সংস্কার, নির্বাচনী প্রক্রিয়া সহজ ও যুগোপযোগী করা, সংসদীয় এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ, ভোটার তালিকা প্রণয়ন, ভোটকেন্দ্র স্থাপন, নতুন রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নিরীক্ষা করা এবং নির্বাচনের জন্য নির্বাচনী কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সক্ষমতা বাড়াতে প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা।

এর মধ্যে ভোটার তালিকা হালনাগাদের কাজ শুরু হবে ২৫ জুলাই থেকে। ময়মনসিংহ থেকে এই কাজ শুরু হবে। বিদ্যমান ভোটার তালিকার সমস্যা দূর করা এবং নির্ভুল একটি ভোটার তালিকা করা কমিশনের অন্যতম লক্ষ্য। তা ছাড়া বিদ্যমান তালিকায় নারী ভোটারের সংখ্যা পুরুষ ভোটারের তুলনায় প্রায় ৬ শতাংশ কম। নারী ভোটারের সংখ্যা বাড়ানো এই কাজের আরেকটি লক্ষ্য।

আইন সংস্কার ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। আপাতত কমিশন দুটি পেশাদার প্রতিষ্ঠানকে এ নিয়ে পর্যালোচনা ও করণীয় সুপারিশ করার কাজ দিয়েছে। তবে সংলাপে আসা সুপারিশের ভিত্তিতে এ দুটি কাজ আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে চূড়ান্ত করা হবে।

নতুন রাজনৈতিক দল নিবন্ধনের জন্য আবেদন চাওয়া হবে চলতি বছরের অক্টোবরে। আগামী বছরের মার্চের মধ্যে নতুন নিবন্ধন কার্যক্রম শেষ হবে। বর্তমানে ৪০টি রাজনৈতিক দল নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন নিয়েছে। এই দলগুলোর কার্যক্রমও এখন থেকে পর্যায়ক্রমে পর্যবেক্ষণ ও নিরীক্ষণের কাজ করবে কমিশন। এ জন্য ইতিমধ্যে নিবন্ধন যাচাই কমিটি নামে একটি কমিটিও করা হয়েছে।

পথনকশায় আগামী সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় ২০১৮ সালের ডিসেম্বর ধরা হয়েছে। যদিও ভোট অনুষ্ঠানের জন্য কমিশন ২০১৯ সালের ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় পাচ্ছে। এ ছাড়া পথনকশায় চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে আগামী বছরের জুনের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথাও থাকছে।

নির্বাচন কমিশন সচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত কাজের পরিকল্পনায় কমিশন অনুমোদন দিয়েছে। রোববার সিইসি পথনকশা নিয়ে করা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করবেন। তিনি বলেন, এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন কী করবে, কীভাবে করবে, তা সাধারণ মানুষ এবং রাজনৈতিক দল ও অংশীজনের কাছে তুলে ধরা হবে। এরপর সবার মতামত নিয়ে সবার অংশগ্রহণে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন নিশ্চিত করা হবে।

যেসকল সংস্কার চায় ইসি

পথনকশায় বলা হয়েছ, নির্বাচন পরিচালনায় বিদ্যমান আইন-বিধির আমূল সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে ইসি মনে করে না। তবে পরিবেশ-পরিস্থিতি পরিবর্তন ও বাস্তবতার কারণে আইন যুগোপযোগী করার সুযোগ আছে। এর উদ্দেশ্য হলো ভোটের প্রক্রিয়া সহজ ও অর্থবহ করা। নির্বাচনে অবৈধ অর্থ ও পেশি শক্তির ব্যবহার বন্ধেও আইনি সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। এ জন্য ইতিমধ্যেই নির্বাচন কমিশনারদের নিয়ে কমিটি গঠিত হয়েছে।

নির্বাচনী আইনে কিছু সংশোধনও আনতে চায় কমিশন। এর মধ্যে নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ব্যক্তিদের গেজেট প্রকাশের সময় নির্দিষ্ট করে দেওয়ার কথা ভাবছে কমিশন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৩ জন বিনা ভোটে নির্বাচিত হন। ফলে বিশাল সংখ্যক জনপ্রতিনিধি বিনা ভোটে জিতে যাওয়ায় বিষয়টি সামনে এসেছে। বিনা ভোটে যাঁরা নির্বাচনে জয়ী হবেন, তাঁদের নামের গেজেট আর ভোটে নির্বাচিত ব্যক্তিদের নামের গেজেট একই সঙ্গে প্রকাশিত হবে কি না, তা সুনির্দিষ্ট করতে চায় ইসি।

বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার একটা সহজ প্রক্রিয়া বের করার কথা বলা হয়েছে। কেননা, আরপিও ও নির্বাচন পরিচালনা বিধিতে উল্লিখিত পোস্টাল ব্যালট প্রক্রিয়াটি জটিল।

তা ছাড়া আরপিও এবং সীমানা পুনর্নির্ধারণ আইন বাংলা ভাষায় করার বিষয়টিও থাকছে পথনকশায়। অবশ্য ২০০৮ সালে তৎকালীন শামসুল হুদা কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) বাংলায় করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের আপত্তির কারণে সেটি বাতিল করা হয়। অবশ্য বর্তমান নির্বাচন কমিশনের যুক্তি হলো এ দুটি আইন বাংলায় রূপান্তর করা গেলে ভোটার, প্রার্থী ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্টদের কাছে এটি সহজবোধ্য হবে।

এ ছাড়া সীমানা পুনর্নির্ধারণ আইনে পরিবর্তনের কথাও ভাবছে ইসি। রাজধানীর মতো বড় শহরের আসন সীমিত করে নির্দিষ্ট করে দেওয়া, সীমানা পুনর্বিন্যাসে নতুন প্রশাসনিক এলাকা ও বিলুপ্ত ছিটমহলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং বিদ্যমান জনসংখ্যার ভিত্তিতে সীমানা পুনর্নির্ধারণ বিধির পাশাপাশি ভোটার সংখ্যা ও আয়তনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত।

ইসির যুক্তি হলো জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় আসন নির্ধারিত হলে শহর ও গ্রামাঞ্চলের সংসদীয় আসন সংখ্যা নিয়ে বৈষম্য হবে। বড় শহরের জনসংখ্যা বাড়লেও অনেকে ভোটার হন গ্রামে। তাই আইন সংস্কার করে শুধু জনসংখ্যাকে বিবেচনা না করে জনসংখ্যা, ভোটার সংখ্যা ও আয়তনকে বিবেচনায় আনার প্রস্তাব রেখেছে ইসি। এ ছাড়া রাজধানীর মতো বড় শহরের আসনসংখ্যা নির্দিষ্ট করার বিষয়টি আনা হয়েছে এবার।